পর্ব- ২
রাষ্ট্রের নিরাপত্তা ও আইনের শাসন কার্যকর করতে পুলিশের ভূমিকা মৌলিক। অথচ বাংলাদেশে পুলিশ বাহিনীর শীর্ষ নেতৃত্বের কাঠামো, মর্যাদা, ও আর্থিক ক্ষমতা এখনো ঔপিনিবেশিক প্রশাসনিক ধাঁচে আবদ্ধ। পরিবর্তিত নিরাপত্তা ব্যস্তবতা, আন্তবাহিনী সমন্বয় এবং আধুনিক পুলিশিংয়ের চাহিদার আলোকে এই কাঠামোর পুনর্গঠন এখন আর বিলাসিতা নয় বরং একটি রাষ্ট্রীয় প্রয়োজন।
পুলিশ প্রধানের মর্যাদা পুনর্নির্ধারণ: ৪- স্টার জেনারেল সমমান
বর্তমানে বাংলাদেশ পুলিশের পুলিশ মহাপরিদর্শক (IGP) প্রশাসনিকভাবে সরকারের গ্রেড-১ কর্মকর্তা হলেও বাস্তবে তার কমান্ড অথরিটি ও প্রটোকল অবস্থান সেনাবাহিনী ও অন্যান্য বাহিনীর শীর্ষ নেতৃত্বের সঙ্গে পুরোপুরি সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। আন্তর্জাতিকভাবে আধুনিক পুলিশ ব্যবস্থায় পুলিশ প্রধানকে কার্যত একটি চার-তারকা বিশিষ্ট কমান্ড কর্তৃপক্ষ (Four-Star Command Authority) হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে IGP পদকে ৪ স্টার জেনারেল সমমর্যাদা ও পূর্ণ গ্রেড-১ স্ট্যাটাস দেওয়া হলে- ২০৭৫ সালের লক্ষমাত্রা অর্জনে
এই উদ্যোগ যেসব সুফল বয়ে আনবে সেগুলো হলো-
বাহিনীর ভেতরে কমান্ড ও শৃঙ্খলা আরও সুসংহত হবে
সেনা ও আধা-সামারিক বাহিনীর সঙ্গে যৌথ অপারেশনে প্রটোকল জটিলতা দূর হবে
পুলিশ নেতৃত্বে রাজনৈতিক ও ডিপ্লোমেটিক চাপের ঊর্ধ্বে উঠে পেশাদার সিদ্ধান্ত নিতে পারবে
এটি কোনো ব্যক্তিকেন্দ্রিক দাবি নয়: বরং বাংলাদেশ পুলিশ এর প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বৃদ্ধির প্রশ্ন।
আর্থিক সক্ষমতা ও বিবেচনামূলক তহবিল (Discretionary Fund): প্রশাসনিক সংস্কারের বাস্তব চাবিকাঠি
নেতৃত্বের মর্যদা বাড়ালেই সংস্কার সম্ভব নয়: তার সঙ্গে প্রয়োজন আর্থিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা। বর্তমানে পুলিশের অবকাঠামো উন্নয়ন, প্রযুক্তি ক্রয় বা জরুরি অপারেশনাল ব্যয়ের ক্ষেত্রে দীর্ঘ আমলাতান্ত্রিক প্রক্রিয়া বড় বাধা। এই প্রেক্ষপটে পুলিশ প্রধানকে বছরে ১০০ কোটি টাকা পর্যন্ত বিবেচনামূলক তহবিল ব্যবহারের প্রশানিক ক্ষমতা প্রদান করা যেতে পারে, যা
জরুরী অবকাঠামো উন্নয়ন
প্রযুক্তিনির্ভর অপরাধ মোকাবিলা
প্রশিক্ষণ ও অপারেশনাল সক্ষমতা বৃদ্ধিতে তাৎক্ষনিকভাবে ব্যবহার করা যাবে।
এটি রাষ্ট্রীয় অর্থব্যবস্থার জন্য কোনো ব্যতিক্রমী ধারণা নয়; বরং সুশাসিত দেশগুলোতে নিরাপত্তা প্রধানের জন্য এমন নিয়ন্ত্রিত অথচ কার্যকর তহবিল বিদ্যামান।
এই আর্থিক ক্ষমতা বর্তমান আর্থিক বিধিমালার বাংলাদেশের আর্থিক বিধিমালাতে যুক্তিগতভাবে সংশোধন যেতে পারে। প্রস্তাবিত পরিবর্তন হতে পারে-
১. আর্থিক বিধিমালা-এ নতুন বিশেষ ধারা সংযোজন
জাতীয় নিরাপত্তা ও আইন প্রয়োগকারীর বিবেচনামূলক ব্যয় "National Security & Law Enforcement Discretionary Expenditure"
২. ব্যয়-পরবর্তী নিরীক্ষা প্রক্রিয়া (Expenditure-post Audit Mechanism)
ব্যয়ের আগে অনুমোদনের পরিবর্তে নিদিষ্ট সময় মহাহিসাব নিরীক্ষক কর্তৃক নিরীক্ষা বাধ্যতামূলক করা।
৩. সংসদীয় স্থায়ী কমিটির তত্ত্বাবধান (Parliamentary Standing Committee Oversight) সংসদীয় স্থায়ী কমিটির কাছে বার্ষিক গোপনীয় কিন্তু জবাবদিহিমূলক প্রতিবেদন দাখিল।
৪. সুনির্দিষ্ট ব্যয়ের খাত (Clear Spending Heads)
প্রযুক্তি, প্রশিক্ষণ, অবকাঠামো ও জরুরী অপারেশনের জন্য নির্দিষ্ট খাত নির্ধারণ। এই কাঠামোর মাধ্যমে আর্থিক শৃঙ্খলা ও দ্রুত সিদ্ধান্ত দুটোই একসঙ্গে নিশ্চিত করা সম্ভব।
বাংলাদেশ পুলিলের সংস্কার মানে কেবল ইউনিফর্ম বা শ্লোগান পরিবর্তন নয়; এর হলো নেতৃত্ব, মর্যাদা ও সক্ষমতার কাঠামোগত রূপান্তর। পুলিশ প্রধানকে ৪-স্টার জেনারেল সমমর্যাদা ও সীমিত কিন্তু কার্যকর আর্থিক ক্ষমতা প্রদান করলে বাহিনী রাজনৈতিক প্রভাব থেকে ধীরে ধীরে বেরিয়ে এসে একটি সত্যিকারের পেশাদার ও জনগণমুখী প্রতিষ্ঠানে রূপ নিতে পারবে।
লেখক-
ড. আশরাফুর রহমান,
ডিআইজি, বাংলাদেশ পুলিশ
আপনার মতামত লিখুন :