আবু হুরায়রা (রা.) বলেন, আমি রাসুল (সা.)-কে বলতে শুনেছি, ঈসা ইবনে মরিয়ম এবং জুরাইজ সংশ্লিষ্ট শিশু ব্যতীত আর কোন মানব-সন্তান ভূমিষ্ঠ হওয়ামাত্র দোলনায় কথা বলেনি। জিজ্ঞাসা করা হলো, ইয়া রাসুলাল্লাহ! জুরাইজ কে? তিনি বলেন, জুরাইজ ছিলেন একজন উপাসনালয়বাসী সংসারত্যাগী দরবেশ। তার উপাসনালয়ের প্রান্তেই এক রাখাল বাস করতো। গ্রাম্য এক নারী সেই রাখালের কাছে যাতায়াত করতো।
একদিন জুরাইজের মা তার নিকট এসে বলেন, হে জুরাইজ! তিনি তখন নামাজরত ছিলেন। তিনি নামাজরত অবস্থায় মনে মনে বলেন, আমার মা এবং আমার নামাজ। তিনি তার নামাজকে অগ্রাধিকার দিলেন। দ্বিতীয়বার তার মা জোরে ডাক দিলে তিনি মনে মনে বলেন, আমার মা ও আমার নামাজ।
তিনি মায়ের উপর নামাজকে অগ্রাধিকার দিলেন। তৃতীয়বার চীৎকার দিয়ে তার মা তাকে ডাকলে তিনি বলেন, আমার মা ও আমার নামাজ। তিনি নামাজকে অগ্রাধিকার দেয়াই সমীচীন ভাবলেন।
জুরাইজ তার ডাকে সাড়া না দিলে তিনি তাকে অভিশাপ দিলেন, ‘তোকে পতিতা নারীদের মুখ না দেখিয়ে যেন আল্লাহ তোর মৃত্যু না ঘটান’।
তারপর তার মা চলে গেলেন। ঘটনাক্রমে সদ্য ভূমিষ্ঠ শিশু সন্তানসহ সেই নারীকে রাজ-দরবারে উপস্থিত করা হলো। রাজা জিজ্ঞাসা করলেন, কার ঔরসে এ শিশুর জন্ম? সে বললো, জুরাইজের ঔরসে। রাজা আবার জিজ্ঞাসা করলেন, উপাসনালয়বাসী জুরাইজ? সে বললো, হাঁ। রাজা নির্দেশ দিলেন, উপাসনালয়টি ভেঙ্গে দাও এবং তাকে আমার নিকট হাযির করো।
তারা কুঠারাঘাতে তার উপাসনালয়টি ভূপাতিত করলো এবং তার দুই হাত রশি দিয়ে তার ঘাড়ের সাথে বেঁধে তাকে নিয়ে রাজ-দরবারে চললো। পথে পতিতা নারীরা সামনে পড়লো, তিনি তাদের দেখে মৃদু হাসলেন। তারাও তাকে লোকজন পরিবেষ্টিত অবস্থায় দেখলো।
রাজা তাকে বলেন, সে কি ধারণা করে? জুরাইজ বলেন, সে কী ধারণা করে? রাজা বলেন, তার দাবি এই যে, এ শিশু আপনার ঔরসজাত। জুরাইজ পতিতাকে বলেন, সত্যিই কি তোমার এই ধারণা? সে বললো, হাঁ। তিনি বলেন, কোথায় সেই শিশু? তারা বললো, এই যে তার মায়ের কোলে। তিনি তার সামনে গেলেন এবং বললেন, কে তোমার পিতা? শিশুটি বললো, গরুর রাখাল।
এবার রাজা বলেন, আমরা কি আপনার খানকাহ সোনা দ্বারা নির্মাণ করে দিবো? তিনি বলেন, না। রাজা পুনর্বার বলেন, তবে রূপা দ্বারা? তিনি বলেন, না। রাজা বলেন, তবে আমরা সেটিকে কি করবো? তিনি বলেন, তা পূর্বাবস্থায় ফিরিয়ে দিন। রাজা জিজ্ঞেস করলেন, তবে আপনার মৃদু হাসির কারণ কি? তিনি বলেন, মৃদু হাসির পেছনে একটা ঘটনা আছে যা আমার জানা ছিল। আমার মায়ের অভিশাপই আমাকে স্পর্শ করেছে। অতঃপর তিনি সকল ঘটনা তাদেরকে অবহিত করেন। (সহিহ বুখারি, হাদিস নং : ৩৪৩৬, সহিহ মুসলিম, হাদিস নং - ২৫৫০)
শিক্ষা ও বিধান
১. পিতা-মাতার মর্যাদা অত্যন্ত উচ্চ, তাই
নফল ইবাদতের চেয়ে তাদের ডাকে সাড়া দেওয়া এবং তাদের হক আদায় করা অধিক গুরুত্বপূর্ণ।
২. মায়ের দোয়া ও বদদোয়া কবুল হয়, তাই সবসময় পিতা-মাতার মন রক্ষা করা জরুরি।
৩. নফল ইবাদতের চেয়ে মানুষের হক ও জরুরি মানবিক দায়িত্ব আগে, তারপর নফল ইবাদত।
৪. সত্য একদিন প্রকাশিত হবেই, মিথ্যা অপবাদ দীর্ঘস্থায়ী হয় না। তাই শিশুর মুখ দিয়ে আল্লাহ সত্য প্রকাশ করে জুরাইজ-কে নির্দোষ প্রমাণ করেন।
আপনার মতামত লিখুন :