বাংলাদেশের ক্রীড়াঙ্গনে ফুটবল আর ক্রিকেটের উন্মাদনার বাইরে যে কয়েকটি ইনডোর গেমসের বিপুল সম্ভাবনা ছিল, তার মধ্যে বাস্কেটবল অন্যতম। তরুণ প্রজন্মের কাছে এই খেলার জনপ্রিয়তা আকাশচুম্বী হলেও, মাঠের বাস্তব চিত্র ভিন্ন। দীর্ঘদিনের প্রশাসনিক ব্যর্থতা, অদূরদর্শিতা এবং বিগত ফ্যাসিবাদের দোসরদের কুপ্রভাবে দেশের বাস্কেটবল আজ খাদের কিনারায় এসে দাঁড়িয়েছে।
ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থান-পরবর্তী বাংলাদেশে যখন প্রতিটি সেক্টরকে ফ্যাসিবাদের প্রভাবমুক্ত করে সংস্কারের হাওয়া বইছে, তখন বাস্কেটবল ফেডারেশনের বর্তমান অ্যাডহক কমিটির ভূমিকা নিয়েও নানা প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে। বাস্কেটবল সংশ্লিষ্ট, ক্লাব কর্মকর্তা ও খেলোয়াড়দের পক্ষ থেকে ফেডারেশনের দিকে ছুড়ে দেওয়া হয়েছে একগুচ্ছ তীক্ষ্ণ প্রশ্ন, যা দেশের বাস্কেটবল প্রশাসনের ভেতরের কঙ্কালসার রূপটিকে উন্মোচিত করে।
১. ঘরোয়া বাস্কেটবলে শূন্যতা: লীগ ও ক্লাবের নির্বাসন একটি ফেডারেশনের মূল চালিকাশক্তি হলো তার নিয়মিত ঘরোয়া আসর এবং ক্লাবগুলোর সক্রিয় অংশগ্রহণ। কিন্তু বাস্কেটবলে চিত্রটি উল্টো। দেশের সর্বোচ্চ আসর 'প্রিমিয়ার বাস্কেটবল লীগ' দীর্ঘ সময় ধরে বন্ধ বা অনিয়মিত। ঐতিহ্যবাহী ও সক্রিয় ক্লাবগুলো কেন ফেডারেশনের প্রতিযোগিতায় অংশ নিচ্ছে না-তার কোনো সদুত্তর নেই প্রশাসনের কাছে।
সম্প্রতি প্রথম বিভাগ লীগ আয়োজন করা হলেও সেখানে অংশ নিয়েছে মাত্র ৪টি দল! বাকি ক্লাবগুলোকে লীগে ফেরাতে বা উদ্বুদ্ধ করতে ফেডারেশন কোনো দৃশ্যমান বা লিখিত পদক্ষেপ নেয়নি। প্রশ্ন উঠেছে, ক্লাবগুলোর এই নিষ্ক্রিয়তা কি প্রশাসনেরই ব্যর্থতা নয়? নিয়মিত লীগ ও দীর্ঘমেয়াদি প্রতিযোগিতার আয়োজন বাদ দিয়ে কেবল কয়েকটি "দায়সারা" আনুষ্ঠানিক টুর্নামেন্ট করে ফেডারেশন কি তার মূল সাংগঠনিক দায়িত্ব এড়িয়ে যাচ্ছে না?
২. জাতীয় দল ও র্যাংকিং বিপর্যয়: প্রাক-বাছাইয়ে অংশ না নেওয়ার দায় কার? সবচেয়ে বড় ধাক্কাটি এসেছে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে। ২০২৩ সালেও বাংলাদেশ জাতীয় বাস্কেটবল দল আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়েছিল। অথচ বর্তমান অ্যাডহক কমিটি দায়িত্ব নেওয়ার পর প্রথম সংবাদ সম্মেলনেই দাবি করে-"বাংলাদেশে কোনো বাস্কেটবল জাতীয় দল নেই"। আশ্চর্যের বিষয়, দায়িত্ব গ্রহণের এত দিন পরেও তারা কোনো সিনিয়ির জাতীয় দল গঠন করতে পারেনি।
সবচেয়ে আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত ছিল এশিয়া কাপের প্রাক-বাছাই পর্বে বাংলাদেশের অংশ না নেওয়া। এর ফলে দেশের বাস্কেটবল দীর্ঘ সময়ের জন্য আন্তর্জাতিক অঙ্গন থেকে নির্বাসনে গেল। এই চরম ব্যর্থতার দায়ভার বর্তমান প্রশাসন কীভাবে এড়াতে পারে? একই চিত্র থ্রি-অন-থ্রি ($3\times 3$) বাস্কেটবলেও। এক সময় এশিয়ান বিচ গেমসের সেমিফাইনালে খেলা বাংলাদেশ দল র্যাংকিংয়ে পিছিয়ে পড়ার কারণে সর্বশেষ আসরে অংশই নিতে পারেনি। গত দেড় বছরে র্যাংকিং উন্নয়নের জন্য ফেডারেশন কোনো কার্যকর উদ্যোগ নেয়নি বললেই চলে।
৩. 'কম্পিটিশন' ছাড়া জাতীয় যুব দল: অলৌকিক সিলেকশন! বর্তমান অ্যাডহক কমিটির আমলে কোনো জাতীয় যুব চ্যাম্পিয়নশিপ অনুষ্ঠিত হয়নি। অথচ আশ্চর্যজনকভাবে যুব দল গঠন করে আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় পাঠানো হয়েছে! বাস্কেটবল অঙ্গনের প্রশ্ন-ঘরোয়া কোনো প্রতিযোগিতা ছাড়া, খেলোয়াড়দের পারফরম্যান্সের মূল্যায়ন না করে কীভাবে এই দল সিলেকশন করা হলো? প্রতিযোগিতামূলক ম্যাচ খেলার অভিজ্ঞতা ছাড়াই তরুণ খেলোয়াড়দের আন্তর্জাতিক মঞ্চে ঠেলে দেওয়া কি এক ধরনের অবিবেচক সিদ্ধান্ত নয়?
দায়িত্ব নেওয়ার সময় ফেডারেশন বলেছিল তারা আর্থিক বিষয় নিয়ে চিন্তিত নয়। তবে আন্তর্জাতিক টুর্নামেন্টে যাওয়ার আগে যুব দলের ক্যাম্প কেন মাত্র এক মাসের হলো? কেন আরও দীর্ঘমেয়াদি ও উন্নত প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা গেল না? বাস্কেটবল অঙ্গনের মূল প্রশ্নসমূহ: ১. প্রিমিয়ার লীগ কেন বন্ধ এবং প্রথম বিভাগে মাত্র ৪ দল কেন? ২. এশিয়া কাপের প্রাক-বাছাইয়ে অংশ না নিয়ে নির্বাসন কেন? ৩. ঘরোয়া যুব চ্যাম্পিয়নশিপ ছাড়া যুব দল গঠন হলো কীভাবে? ৪. কোচ ও টেকনিক্যাল স্টাফ নিয়োগের স্বচ্ছতা কোথায়? ৫. অনুদান ও ফান্ডের অর্থ গ্রাসরুট উন্নয়নে ব্যবহার হয় না কেন?
৪. কোচ নিয়োগে অস্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার অভাব: জাতীয় দল ও বয়সভিত্তিক দলের কোচ এবং টেকনিক্যাল স্টাফ নিয়োগের ক্ষেত্রে যোগ্যতা, অভিজ্ঞতা ও নির্বাচন প্রক্রিয়ার কোনো স্বচ্ছতা নেই বলে অভিযোগ উঠেছে। কোন নীতি বা যোগ্যতার ভিত্তিতে নির্দিষ্ট কিছু ব্যক্তিকে বারবার টেকনিক্যাল স্টাফ হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হচ্ছে, তা অন্ধকারেই রয়ে গেছে।
পাশাপাশি, ফেডারেশনের উন্নয়ন তহবিল, বিভিন্ন অনুদান এবং আন্তর্জাতিক বাস্কেটবল সংস্থা (FIBA) থেকে প্রাপ্ত সহায়তার অর্থ কোথায় ব্যয় হচ্ছে, তার কোনো দৃশ্যমান প্রমাণ নেই। দেশের জেলা ও বিভাগীয় পর্যায়ে বাস্কেটবল উন্নয়নের জন্য বরাদ্দকৃত অর্থ এবং প্রকল্পগুলোর বাস্তব ফলাফল শূন্য। স্মরণকালের মধ্যে সর্বশেষ জাতীয় চ্যাম্পিয়নশিপে সবচেয়ে কম সংখ্যক জেলা অংশ নিয়েছে, যা গ্রাসরুট পর্যায়ে বাস্কেটবলের চরম প্রচারহীনতা ও প্রসারের ব্যর্থতাকেই প্রমাণ করে।
৫. স্পন্সরশিপের খরা ও মিডিয়া বিমুখতা: বাস্কেটবলের মতো একটি আধুনিক ও গতিশীল খেলা কেন দেশের বড় বড় কর্পোরেট স্পন্সরদের আকর্ষণ করতে পারছে না, সেই ব্যর্থতার দায় প্রশাসনকে নিতেই হবে। বর্তমান যুগে যেকোনো খেলার প্রসারে মিডিয়া ও ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম সবচেয়ে বড় ভূমিকা রাখে। অথচ ফেডারেশনের কোনো আধুনিক marketing বা মিডিয়া পরিকল্পনা নেই। ফলে দেশের সংবাদমাধ্যম ও টেলিভিশন চ্যানেলগুলোতে বাস্কেটবলের কাভারেজ এখন প্রায় শূন্যের কোঠায়।
সময়ের দাবি: ফ্যাসিবাদমুক্ত ও আন্তর্জাতিক মানের বাস্কেটবল প্রশাসন
ফেডারেশনের সভাপতি দায়িত্ব নেওয়ার সময় বলেছিলেন, "বাংলাদেশের বাস্কেটবল এখন নার্সারি পর্যায়ে আছে।" কিন্তু প্রশ্ন হলো, দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে তারা এই নার্সারিকে কতটুকু সতেজ করেছেন, নাকি অবহেলায় তা আরও শুকিয়ে মরে যাচ্ছে? ক্রীড়ামোদীদের মতে, বিগত ফ্যাসিবাদের অবশিষ্টাংশ এবং অযোগ্য ব্যক্তিদের দিয়ে গঠিত বর্তমান অ্যাডহক কমিটি দিয়ে দেশের বাস্কেটবলের উন্নয়ন অসম্ভব। "দায়সারা" টুর্নামেন্ট আর লবিং-নির্ভর দল গঠনের সংস্কৃতি ভেঙে বাস্কেটবলকে বাঁচাতে হলে এখনই প্রয়োজন আমূল সংস্কার।
ক্রীড়া বিশ্লেষকদের অভিমত: বর্তমান অ্যাডহক কমিটির উচিত অনতিবিলম্বে তাদের আর্থিক ব্যয়, স্পন্সরশিপ চুক্তি, কোচ নিয়োগ, এবং লীগ পরিচালনার পূর্ণাঙ্গ তথ্য (White Paper) সদস্য, ক্লাব ও গণমাধ্যমের সামনে প্রকাশ করা। ফ্যাসিবাদের দোসর ও অযোগ্যদের বাদ দিয়ে বাস্কেটবল ফেডারেশনকে সম্পূর্ণ রাজনীতিমুক্ত, পেশাদার এবং আন্তর্জাতিক মানের সংগঠক দিয়ে পুনর্গঠন করা এখন সময়ের দাবি। অন্যথায়, দেশের সম্ভাবনাময় এই খেলাটি চিরতরে হারিয়ে যাবে ক্রীড়া মানচিত্র থেকে। অন্তর্বর্তীকালীন সরকার ও জাতীয় ক্রীড়া পরিষদ (NSC) কি এই অচলাবস্থা ভাঙতে দ্রুত পদক্ষেপ নেবে? উত্তর খোঁজার অপেক্ষায় দেশের বাস্কেটবল অঙ্গন।
আপনার মতামত লিখুন :