মানিকগঞ্জের দৌলতপুর উপজেলার ধামশ্বর ইউনিয়ন পরিষদে পবিত্র ঈদুল আজহা উপলক্ষে বরাদ্দকৃত ভিজিএফ এবং দুস্থ নারীদের জন্য ভিডব্লিউবি (সাবেক ভিজিডি) কর্মসূচির চাল আত্মসাতের চাঞ্চল্যকর অভিযোগ উঠেছে। সরকারি নিয়ম নীতি তোয়াক্কা না করে, কোনো ট্যাগ অফিসার ছাড়াই ওজনে কম দিয়ে উদ্বৃত্ত রাখা ৫০ বস্তা চাল ধামশ্বর এলাকার এক বাড়ি থেকে জব্দ করেছে উপজেলা প্রশাসন। এ ঘটনায় জড়িতদের বিরুদ্ধে নিয়মিত মামলা দায়েরের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
অনুসন্ধানে জানা যায়, গত বৃহস্পতিবার (২১ মে) ধামশ্বর ইউনিয়নে ১,৭৮৮ জন ভিজিএফ কার্ডধারীর মাঝে চাল বিতরণ করা হয়। সরকারি বিধি অনুযায়ী চাল বিতরণের সময় দায়িত্বপ্রাপ্ত ট্যাগ অফিসারের উপস্থিতি বাধ্যতামূলক হলেও ওই দিন কোনো কর্মকর্তা উপস্থিত ছিলেন না। এমনকি ওজনে কারচুপি করতে কোনো পরিমাপক যন্ত্র ব্যবহার না করে ৫ জন কার্ডধারীকে এক বস্তা (৫০ কেজি) করে চাল ভাগ করে দেওয়া হয়। এভাবে ওজনে কম দিয়ে কৌশলে প্রায় ৫০ বস্তা ভিজিএফ এবং আনুমানিক ১৫ বস্তা ভিডব্লিউবি মাসিক একাদিক কার্ডধারীদের চাল না দিয়ে তাদের স্বাক্ষর জাল করে চাল উদ্বৃত্ত রাখা হয়।
অনুসন্ধানে আরও জানা যায়, টিপসই নিয়ে অনেক ভিডব্লিউবি কার্ডধারীকে চাল না দিয়ে তা আত্মসাৎ করা হয়েছে। গত শনিবার (২৩ মে) কার্ডধারীরা চাল নিয়ে গেছেন বলে নথিপত্র দেখালেও পরিষদের ভেতরে ৩০ কেজির পাটের বস্তার চালের উপস্থিতি নিয়ে সচেতন মহলে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে।
এবিষয়ে ৭ নং ওয়ার্ডের তুলন্ড গ্রামের ভুক্তভোগী আন্না বলেন, আমি বিডব্লিউবি ৩০ কেজি চালের কার্ড ও চাল কোন পায়নি। শুধু বৃহস্পতিবার ভিজিএফ কার্ডের আওতায় শুধু ১০ কেজি চাল পেয়েছি। এখন শুনতে পাইছি আমার নাম ও টিপসই জাল স্বাক্ষর ব্যবহার করে মাসিক ৩০ কেজি চাল উত্তোলন করে ইউনিয়ন পরিষদ চুরি করে খাচ্ছে। এই নেপথ্যে ইউনিয়ন পরিষদ ও সংশিষ্টের জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হোক।
শনিবার রাতে কারচুপি দিয়ে বাঁচানো ওই ৫০ বস্তা ভিজিএফ চাল ধামশ্বর এলাকার জাহিদের স্ত্রী জাহানারার বাড়িতে জোরপূর্বক লুকিয়ে রাখার চেষ্টা করা হয়। বিষয়টি টের পেয়ে স্থানীয় জনতা উপজেলা প্রশাসনকে অবহিত করলে রাতেই প্রশাসন অভিযান চালিয়ে চালগুলো উদ্ধার করে।
বাড়ির মালিক জাহানারা বেগম স্থানীয় বাসিন্দা ও প্রশাসনের সামনে অভিযোগ করে বলেন, "গত বৃহস্পতিবার বিকেলের দিকে ৪ নং ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য মানিয়ার, ৬ নং ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য মোঃ আয়নাল হক, ধামশ্বর ইউনিয়ন যুবলীগের সাধারণ সম্পাদক রাজিব এবং একজন অজ্ঞাতনামা চাল ব্যবসায়ী জোর করে আমাদের ঘরে এই ৫০ বস্তা চাল রাখতে বাধ্য করে। আমি এই ঘটনার সাথে জড়িতদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দাবি করছি।"
বিতরণ প্রক্রিয়ায় অনিয়মের কথা সরাসরি স্বীকার করেছেন ধামশ্বর ইউনিয়ন পরিষদের প্রশাসনিক কর্মকর্তা মোহাম্মদ আজম শিকদার। তিনি বলেন, "চাল বিতরণের সময় কোনো ট্যাগ অফিসার উপস্থিত ছিলেন না।" একই কথা নিশ্চিত করেছেন পরিষদের দফাদার রফিল খা-ও।
এদিকে চাল বিতরণ ও কার্ড বণ্টন নিয়ে ইউপি সদস্যদের মধ্যেও চরম কাদাছোড়াছুড়ি চলছে। সংরক্ষিত ৪, ৫ ও ৬ নং ওয়ার্ডের নারী সদস্য লাভলী আক্তার ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, "আমার ওয়ার্ডের অসহায় মানুষের জন্য ৫০টি কার্ড পেয়েছিলাম। কিন্তু ইউপি সদস্য মানিয়ার ও তার সহযোগীরা কার্ডে কারচুপি করেছে। আমার অসহায় মানুষের ৫০টি কার্ডের মধ্যে ৪টি কার্ড যুবলীগের ৪ নং ওয়ার্ডের রাজিব জোরপূর্বক কেড়ে নিয়ে ছিঁড়ে ফেলেছে।"
অন্যদিকে, ২ নম্বর ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য আতোয়ার রহমান দাবি করেন, বিকেল ৩টার মধ্যেই চাল বিতরণ শেষ হয়ে গিয়েছিল। ৭, ৮ ও ৯ নং ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য শিউলি বেগম তার অংশের ৫০টি কার্ড পাওয়ার কথা জানালেও পুরো প্রক্রিয়াটি নিয়ে ধোঁয়াশা রয়ে গেছে। পুরো ঘটনার সাথে প্রাথমিক সহকারী শিক্ষা অফিসার মারুফ জাহাঙ্গীর ও সংশ্লিষ্টদের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
সার্বিক বিষয়ে বক্তব্য জানতে ধামশ্বর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান অ্যাডভোকেট মোঃ ইদ্রিস আলীর মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি।
এবিষয়ে নিযুক্ত অনুস্পতিত থাকা ট্যাক অফিসার প্রাথমিক সহকারী শিক্ষা অফিসার মারুফ জাহাঙ্গীর ফোন নাম্বার না থাকায় তার বক্তব্য জানা সম্ভব হয়নি।
এবিষয়ে দৌলতপুর থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) স্বপন কুমার বলেন, অভিযুক্ত দুইজন কে জেলে পাঠানো হয়েছে।
চাল আত্মসাতের এই চাঞ্চল্যকর চেষ্টার বিষয়ে দৌলতপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) জানান, ৫০ বস্তা চাল জব্দের বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে দেখা হচ্ছে। উদ্ধারকৃত চালের বিষয়ে থানা পুলিশকে নিয়মিত মামলা দায়ের করার জন্য স্পষ্ট নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। ঘটনার নেপথ্যে জড়িতদের দ্রুত চিহ্নিত করে আইনের আওতায় আনা হবে। এলাকায় এ নিয়ে চরম উত্তেজনা বিরাজ করছে।
আপনার মতামত লিখুন :