ঢাকা-আরিচা মহাসড়ক দেশের অন্যতম ব্যস্ত ও গুরুত্বপূর্ণ একটি সড়ক । প্রতিদিন হাজার হাজার মানুষ ও পণ্যবাহী যানবাহন এই সড়ক দিয়ে যাতায়াত করে। রাজধানী ঢাকার সাথে দক্ষিণ ও পশ্চিমাঞ্চলের যোগাযোগের এই প্রধান সড়কটি যাত্রীসাধারণের কাছে এক আতঙ্কের নাম হয়ে দাঁড়িয়েছে। আর এই ভীতি ও আতঙ্কের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে ‘সেলফি পরিবহন’ নামের একটি নির্দিষ্ট বাস সার্ভিস। বেপরোয়া গতি, অদক্ষ ও লাইসেন্সবিহীন চালক, ফিটনেসবিহীন গাড়ি এবং রাস্তায় একে অপরের সাথে বিপজ্জনক ওভারটেকিংয়ের প্রতিযোগিতার কারণে এই পরিবহনের বাসগুলো প্রতিনিয়ত ঝরিয়ে চলেছে তাজা প্রাণ। সাধারণ মানুষের মনে এখন একটাই প্রশ্ন: দেশের আইন-কানুন ও প্রশাসনের নাকের ডগায় দাঁড়িয়ে এই সেলফি বাসের এত দাপট ও ক্ষমতার উৎস কোথায়? কেন বন্ধ হচ্ছে না সড়কে এই মৃত্যুর মিছিল?
ঢাকা-আরিচা মহাসড়কের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অংশ আমিনবাজার থেকে পাটুরিয়া ঘাট পর্যন্ত সড়কপথের নিরাপত্তা ও শৃঙ্খলা বজায় রাখার জন্য সাভার হাইওয়ে থানা, গোলড়া হাইওয়ে থানা এবং বরংগাইল হাইওয়ে পুলিশ ফাঁড়ি রয়েছে । অবাক করা বিষয় হলো, মহাসড়কের এই গুরুত্বপূর্ণ অংশজুড়ে থানা ও ফাঁড়ির সার্বক্ষণিক নজরদারি থাকার পরেও, তাদের চোখের সামনেই প্রতিদিন শত শত ট্রাফিক আইন লঙ্ঘন করে চলেছে সেলফি পরিবহন। মহাসড়কে এই বাসের নৈরাজ্য এখন এক 'ওপেন সিক্রেট'। নিয়ম-নীতির তোয়াক্কা না করে মাঝরাস্তায় হুটহাট ব্রেক করা, অন্য গাড়িকে সাইড না দিয়ে বিপজ্জনকভাবে পথ আগলে রাখা এবং যাত্রী তোলার প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হওয়া এদের নিত্যদিনের চিত্র।
একটি বাস সার্ভিস কীভাবে নিয়মের তোয়াক্কা না করে বছরের পর বছর মহাসড়কে একক আধিপত্য ও নৈরাজ্য চালিয়ে যেতে পারে, তা গভীর উদ্বেগের বিষয়। ভুক্তভোগী এবং সাধারণ মানুষের সাথে আলাপচারিতায় এই অদৃশ্য ক্ষমতার পেছনে মূলত তিনটি প্রধান কারণ উঠে আসে:
* সেলফি পরিবহনের পেছনে রয়েছে পরিবহন খাতের প্রভাবশালী ব্যবসায়ী ও শ্রমিক নেতাদের একটি শক্তিশালী ও অসাধু সিন্ডিকেট। রাজনৈতিক প্রভাব এবং সংগঠনের শক্তির জোরে তারা প্রশাসনকে তোয়াক্কা না করার দুঃসাহস পায়।
* মহাসড়কে শৃঙ্খলা রক্ষার দায়িত্বে থাকা হাইওয়ে পুলিশ ও বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআরটিএ)-র একাংশের ভূমিকা এখানে চরমভাবে প্রশ্নবিদ্ধ। অভিযোগ রয়েছে, নিয়মিত মাসোহারা বা অনৈতিক আর্থিক লেনদেনের বিনিময়ে এই বাসগুলোর দৈনন্দিন আইনভঙ্গকে স্রেফ এড়িয়ে যাওয়া হয়।
* দুর্ঘটনার পর লোকদেখানো মামলা হলেও তা আলোর মুখ দেখে না বললেই চলে। চালক বা মালিকদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি না হওয়ায়, তারা এক ধরনের অলিখিত ছাড় পেয়ে গেছে বলে মনে করে। যার ফলে চালকেরা দিন দিন আরও বেপরোয়া হয়ে উঠছে।
অভিযোগ রয়েছে, এই পরিবহনের অনেক বাসের চালকেরই ভারী যানবাহন চালানোর কোনো বৈধ লাইসেন্স নেই। এমনকি হালকা যানের লাইসেন্স দিয়ে বা সম্পূর্ণ অনভিজ্ঞ হেলপার দিয়েও দূরপাল্লার এই বাসগুলো চালানো হচ্ছে। শুধু তাই নয়, মহাসড়কে চলাচলের ন্যূনতম যোগ্যতা বা ফিটনেস সার্টিফিকেট নেই—এমন বহু গাড়ি দেদারসে সেলফি পরিবহনের ব্যানারে চলছে। গত কয়েক বছরে এই রুটে সংঘটিত সড়ক দুর্ঘটনার এক বড় অংশ এই সেলফি বাসের । কিন্তু প্রতিটি দুর্ঘটনার পরই চালক ও সহকারীরা পার পেয়ে যাচ্ছে, যা সড়কে অপরাধপ্রবণতা আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে।
একটি স্বাধীন ও সভ্য দেশে কোনো নির্দিষ্ট পরিবহন সিন্ডিকেটের কাছে সাধারণ মানুষের জীবন জিম্মি হতে পারে না। এই নৈরাজ্য ও রক্তের হোলিখেলা বন্ধে অবিলম্বে সরকারের কঠোর ও দৃশ্যমান পদক্ষেপ নেওয়া জরুরী প্রয়োজন।
সড়ক কোনো যুদ্ধক্ষেত্র নয় যে, প্রতিদিন সেখানে মানুষকে অবহেলা আর অব্যবস্থাপনার শিকার হয়ে প্রাণ দিতে হবে। ঢাকা-আরিচা মহাসড়কে সেলফি বাসের এই স্বেচ্ছাচারিতা কেবল সড়ক নিরাপত্তা আইনকেই বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখাচ্ছে না, বরং রাষ্ট্র ও প্রশাসনের কার্যকারিতাকেও সাধারণ মানুষের কাঠগড়ায় দাঁড় করাচ্ছে। সাধারণ যাত্রীদের নিরাপদ যাতায়াত নিশ্চিত করতে এবং এই মৃত্যুর মিছিল থামাতে এখনই প্রশাসনকে তার সর্বোচ্চ আইনি ক্ষমতা প্রদর্শন জরুরি প্রয়োজন । ক্ষমতার দাপট চূর্ণ করে সড়কে আইনের শাসন ও শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা করাই এখন সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি।

আপনার মতামত লিখুন :