একটি স্বাতন্ত্র্যসূচক ও প্রাণবন্ত গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার অন্যতম প্রাণশক্তি হলো সংবাদপত্রের স্বাধীনতা। বাক্স্বাধীনতা ও তথ্যের অবাধ প্রবাহ কোনো রাষ্ট্রের উপহার নয়, বরং তা নাগরিকদের সাংবিধানিক মৌলিক অধিকার। গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধানের ৩৯(২) অনুচ্ছেদে স্পষ্ট অক্ষরে নাগরিকের চিন্তা, বিবেক ও বাক-স্বাধীনতার পাশাপাশি সংবাদপত্রের স্বাধীনতার পূর্ণ নিশ্চয়তা দেওয়া হয়েছে। আইনগত কাঠামোর দিক থেকে প্রেস কাউন্সিল আইন, ১৯৭৪-এর মাধ্যমে সংবাদমাধ্যমের পেশাগত নৈতিকতা রক্ষা এবং জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার একটি প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তিও বিদ্যমান। অথচ বাস্তবতার প্রেক্ষাপটে প্রতিনিয়ত ফুটে উঠছে এক বিপরীত চিত্র, যা আমাদের ভাবিয়ে তোলে—সংবাদপত্রের এই স্বাধীনতা কি তবে শুধুই আইনি দলিলের পাতায় বন্দি?
বিশ্বের যেকোনো পরিপক্ক ও প্রাতিষ্ঠানিক গণতন্ত্রে প্রকাশিত কোনো সংবাদের সত্যতা বা বস্তুনিষ্ঠতা নিয়ে বিতর্ক উঠলে তা সমাধানের প্রধান পথ হয় স্বনিয়ন্ত্রক সংস্থা কিংবা প্রেস কাউন্সিলের মাধ্যমে ব্যাখ্যা চাওয়া, আইনি নোটিশ প্রদান বা নীতিগত উপায়ে বিরোধ নিষ্পত্তির চেষ্টা করা। কিন্তু আমাদের সমাজে প্রায়শই দেখা যায়, কোনো দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তা, ক্ষমতাধর ব্যক্তি বা স্বার্থান্বেষী মহলের অনিয়ম নিয়ে সংবাদ প্রকাশ হওয়া মাত্রই প্রেস কাউন্সিলের মতো সুনির্দিষ্ট আইনি পথকে পাশ কাটিয়ে সরাসরি ফৌজদারি মামলা ও গ্রেফতারের পথ বেছে নেওয়া হয়।
একটি প্রচলিত সত্য বাক্য এখানে স্মরণীয়—সংবাদপত্র হলো সমাজের আয়না। আয়নায় নিজের চেহারা দেখে কেউ অসন্তুষ্ট হয়ে সেই আয়নাটি ভেঙে ফেললে মুখের দাগ মুছে যায় না; বরং সত্যকে গোপন করার বিকল চেষ্টাই উন্মোচিত হয়।
একজন পেশাদার সাংবাদিকের মূল ব্রত জনগণের কাছে সত্য তুলে ধরা। কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর প্রতি ব্যক্তিগত বিদ্বেষ থেকে নয়, বরং জনস্বার্থ রক্ষা ও ক্ষমতার অপব্যবহার রোধ করতেই অনুসন্ধানী সাংবাদিকরা ঝুঁকি নেন। কিন্তু সত্য প্রকাশের অপরাধে যখন একজন সংবাদকর্মীকে হাতকড়া পরতে হয়, তখন তা শুধু একজন ব্যক্তির স্বাধীনতা হরণ করে না; বরং পুরো সংবাদমাধ্যমের ওপর একটি মনস্তাত্ত্বিক চাপ সৃষ্টি করে।
সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে এ ধরনের হয়রানির ফলে সমাজ ও রাষ্ট্রে বহুমুখী নেতিবাচক প্রভাব পড়ে:
* রাষ্ট্র ও সমাজের প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতির বিরুদ্ধে মূল নজরদারি ব্যবস্থাটি চরমভাবে দুর্বল হয়ে পড়ে।
* আইনি ও শারীরিক হয়রানির ভয়ে সাংবাদিকরা স্বাধীনভাবে সত্য তুলে ধরার সাহস হারিয়ে ফেলেন এবং অনিচ্ছাকৃত আত্মসংযমে বাধ্য হন।
* সংবাদমাধ্যম ব্যাকফুটে চলে গেলে প্রভাবশালী দুর্নীতিবাজ চক্র আরও বেপরোয়া হয়ে ওঠে, যা রাষ্ট্রের সুশাসনকে ধ্বংস করে।
অবশ্যই এটি অস্বীকার করার উপায় নেই যে, সংবাদ যদি উদ্দেশ্যপ্রণোদিত, মিথ্যা বা ভিত্তিহীন হয়, তবে তার অবশ্যই সুষ্ঠু ও আইনি প্রতিকার থাকতে হবে। কিন্তু সেই প্রতিকারের পদ্ধতি কখনো প্রতিশোধমূলক গ্রেফতার কিংবা নির্যাতন হতে পারে না। প্রথমত, যেকোনো অভিযোগের ক্ষেত্রে প্রেস কাউন্সিলকে অধিক কার্যকর ও স্বায়ত্তশাসিত ভূমিকা পালন করতে দিতে হবে। দ্বিতীয়ত, সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে ঢালাওভাবে ফৌজদারি মামলা এবং তথ্যপ্রযুক্তি/সাইবার সংক্রান্ত আইনের অপব্যবহার রোধে স্পষ্ট নীতিমালা ও সুরক্ষাকবচ তৈরি করতে হবে। অনুসন্ধানী সাংবাদিকদের আইনি ও সামাজিক সুরক্ষা দেওয়ার দায়িত্ব কাদের ।
ইতিহাস আমাদের শিক্ষা দেয়, সত্যকে সাময়িকভাবে রুদ্ধ করা গেলেও চিরতরে শৃঙ্খলিত করে রাখা অসম্ভব। গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার সুসংহত বিকাশ এবং দুর্নীতিমুক্ত সমাজ গঠনের স্বার্থে সাংবাদিকদের কলমকে মুক্ত রাখা জরুরি। সাংবাদিককে রাষ্ট্র বা প্রশাসনের প্রতিপক্ষ না ভেবে, সুস্থ সমাজ গড়ার অন্যতম কারিগর ও সহযোগী হিসেবে বিবেচনা করাই একটি দায়িত্বশীল রাষ্ট্রব্যবস্থার প্রকৃত রূপ।

আপনার মতামত লিখুন :