একসময় যে কলাগাছ কৃষকের কাছে ফল সংগ্রহের পর নিছক বর্জ্য হিসেবে গণ্য হতো, এখন সেই পরিত্যক্ত কলাগাছই হয়ে উঠছে আয়ের নতুন উৎস। ফেলে দেওয়া কলাগাছের কাণ্ড ও আঁশ বিশেষ প্রক্রিয়ায় প্রক্রিয়াজাত করে তৈরি হচ্ছে উন্নতমানের ফাইবার। একই সঙ্গে উৎপাদন প্রক্রিয়ার উপজাত থেকে তৈরি হচ্ছে জৈব সার। রংপুরের পীরগঞ্জের ওসমানপুর গ্রামের এই উদ্যোগ পরিবেশ সুরক্ষা, কর্মসংস্থান ও রপ্তানি সম্ভাবনার নতুন দুয়ার খুলে দিয়েছে। উপজেলার ওসমানপুর গ্রামে ‘ব্যানানা ফাইবার মেশিন’-এর মাধ্যমে কলাগাছ থেকে ফাইবার উৎপাদনের এই উদ্যোগ নিয়েছেন স্থানীয় উদ্যোক্তা হাসু মিয়া। মাঠে-ঘাটে পড়ে থাকা পরিত্যক্ত কলাগাছ সংগ্রহ করে মেশিনের সাহায্যে এর কাণ্ড থেকে আঁশ আলাদা করা হয়। পরে বিশেষ প্রক্রিয়ায় সেই আঁশকে ব্যবহার উপযোগী ফাইবারে রূপ দেওয়া হচ্ছে।
উদ্যোক্তা হাসু মিয়া জানান, বিদেশ থেকে প্রশিক্ষণ নিয়ে দেশে ফিরে অল্প পুঁজি দিয়ে তিনি এই উদ্যোগ গ্রহণ করেন। বর্তমানে ছোট পরিসরে পরিচালিত এই কারখানায় প্রতিদিন ৫ থেকে ৭ জন শ্রমিক কাজ করছেন। শ্রমিকদের পারিশ্রমিক ও অন্যান্য ব্যয় মেটানোর পরও এ উদ্যোগ থেকে লাভের মুখ দেখছেন তিনি। হাসু মিয়া বলেন, “উৎপাদিত ফাইবার কুরিয়ারযোগে ঢাকায় পাঠানো হয়। সেখান থেকে এসব ফাইবার বিদেশে রপ্তানি করা হচ্ছে।” ভবিষ্যতে উৎপাদন বাড়িয়ে কাজটি আরও বড় পরিসরে নেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে তার। পাশাপাশি অন্য কেউ এ ধরনের উদ্যোগ নিতে চাইলে তাকে প্রয়োজনীয় পরামর্শ ও সহযোগিতা দেওয়ারও আগ্রহ প্রকাশ করেন তিনি।
পীরগঞ্জের এই উদ্যোগের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো—কৃষকের কাছে মূল্যহীন পরিত্যক্ত কলাগাছকে বাণিজ্যিকভাবে ব্যবহারযোগ্য সম্পদে পরিণত করা। সাধারণত কলা সংগ্রহের পর গাছের কাণ্ড জমি বা আশপাশে পড়ে থাকে, যা অনেক ক্ষেত্রে পরিবেশের জন্য সমস্যা তৈরি করে। সেগুলো সংগ্রহ করে ফাইবার উৎপাদনের কাঁচামাল হিসেবে ব্যবহার করায় একদিকে বর্জ্যের পরিমাণ কমছে, অন্যদিকে তৈরি হচ্ছে নতুন অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড। ফাইবার উৎপাদনের পাশাপাশি প্রক্রিয়াজাতকরণের পর অবশিষ্ট অংশ থেকে জৈব সার তৈরির উদ্যোগও রয়েছে। ফলে একটি পরিত্যক্ত কলাগাছের বিভিন্ন অংশ কাজে লাগিয়ে একাধিক পণ্য উৎপাদনের সুযোগ তৈরি হচ্ছে।
সংশ্লিষ্টদের মতে, প্রাকৃতিক উৎস থেকে ফাইবার উৎপাদনের এই উদ্যোগ পরিবেশের জন্য ইতিবাচক। কলাগাছের আঁশ ব্যবহার করে বিভিন্ন পণ্য তৈরির সুযোগ বাড়লে কৃত্রিম তন্তু ও প্লাস্টিকজাত পণ্যের ওপর নির্ভরতা কমানোর সম্ভাবনা রয়েছে। বিশেষ করে পরিবেশবান্ধব বিকল্প পণ্যের চাহিদা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে কলাগাছের ফাইবারের বাজারও সম্প্রসারিত হতে পারে। এ ছাড়া কলাগাছের অবশিষ্টাংশ থেকে জৈব সার উৎপাদন করা গেলে কৃষিতে জৈব উপাদানের ব্যবহার বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হবে।
স্থানীয় বাসিন্দারা বলছেন, অল্প পরিসরে শুরু হওয়া এই উদ্যোগটি বড় করা গেলে এলাকায় আরও কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে। বিশেষ করে কৃষিপ্রধান পীরগঞ্জের মতো উপজেলায় স্থানীয়ভাবে পাওয়া কাঁচামাল ব্যবহার করে শিল্প গড়ে উঠলে কৃষির পাশাপাশি ক্ষুদ্র ও কুটিরশিল্পের বিকাশ ঘটতে পারে। স্থানীয়দের মতে, উদ্যোগটির সঙ্গে সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে প্রযুক্তিগত সহায়তা, প্রশিক্ষণ, সহজ শর্তে অর্থায়ন ও বাজারজাতকরণ সুবিধা যুক্ত করা গেলে এর পরিধি আরও বাড়ানো সম্ভব। উদ্যোক্তা হাসু মিয়ার এই উদ্যোগ পরিত্যক্ত কৃষিজ উপকরণকে মূল্যবান সম্পদে রূপান্তরের একটি সম্ভাবনাময় উদাহরণ। সঠিক পৃষ্ঠপোষকতা ও বাজার সুবিধা পেলে পীরগঞ্জের এই উদ্যোগ ভবিষ্যতে স্থানীয় চাহিদা মিটিয়ে আন্তর্জাতিক বাজারেও আরও বড় পরিসরে জায়গা করে নিতে পারে।

আপনার মতামত লিখুন :