মঙ্গলবার, ০৩ মার্চ ২০২৬, ১২:৪০ পূর্বাহ্ন
আনিসুর রহমান আকাশ : ময়মনসিংহে চাঞ্চল্যকর দুর্নীতি ও অবৈধ সম্পদ অর্জনের দুদকের করা মামলায় কারাগারে আছেন সাবেক ওসি গোলাম সারোয়ার। নাশকতার মামলায় বিএনপি নেতা নয়ন ও বিএনপি নেতা তেতুমীর ,অস্ত্র মামলার জুয়েলসহ ১২ থেকে ১৫ জন বিএনপি নেতা কর্মীকে পুলিশ গ্রেপ্তার করে কারাগারে পাঠিয়েছেন। তারা এখন ময়মনসিংহ কেন্দ্রীয় কারাগারে হাসপাতালে রাজার হালে আছেন।
কারা হাসপাতালে অসুস্থ হাজতি- কয়েদীদের চিকিৎসা করানো হয় । আছে ৩৫ টি বেড, নিয়মিত ৭ থেকে ১০ জন হাজতি- কয়েদী প্রাথমিক চিকিৎসা নেন। গুরুত্ব অসুস্থ হলে ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে প্রেরণ করা হয়। সেখানে কারা রক্ষীরা দিনরাত পরিশ্রম করে কারাবন্দিদের চিকিৎসা করিয়ে সুস্থ করে নিয়ে আসে। বিএনপির নেতা ও দুর্নীতির মামলা সাজাপ্রাপ্ত আসামি সাবেক ওসি গোলাম সারোয়ারকে বিশেষ সুবিধা দিয়ে কারা হাসপাতালে নিজের বাড়ির মত থাকার ব্যবস্থা করে দিয়েছে কারা ডা. প্রবীর পাল। তাদের বিশেষ সুবিধা দিয়ে তাদের কাছ থেকে সপ্তাহে ১২ হাজার টাকা করে ঘুষ নেওয়ার অভিযোগ আছে ডা. প্রবীর পাল বিরুদ্ধে। ডা. প্রবীর পালের বিরুদ্ধে আইজি প্রিজনের কাছে জামিনে মুক্ত হয়ে এক হাজতি এমন অভিযোগ করেছেন।
অভিযোগে বলা হয়েছে মাস শেষে টাকা ভাগ বাটোয়ারা হয় কারা কর্তৃপক্ষের মাঝেও। কারাবিধি অনুযায়ী কয়েদির পোশাক পরিয়ে তাদের (কয়েদি) জন্য নির্ধারিত ভবনে রাখার কথা। কিন্তু বিধি ভেঙে দুর্নীতির মামলার সাজা প্রাপ্ত আসামি সাবেক ওসি গোলাম সারোয়ার ও বিএনপির নেতাকর্মীদের বিশেষ সুযোগ-সুবিধা দিয়ে রাখা হয়েছে কারা হাসপাতালে ‘ভিআইপি বেডে। বিনোদনের জন্য রুমের দেওয়ালে টানিয়ে দেওয়া হয়েছে ৩২ ইঞ্চি স্মার্ট টেলিভিশন। বেডে আছে নরম বিছানা। আছে টেবিল ক্লথে মোড়ানো টেবিল। রুম শীতল করতে চলে টেবিল ফ্যান। পানি গরমের জন্য আছে ওয়াটার হিটার।
চা, কফি, হরলিক্স বানাতে দেওয়া হয়েছে ইলেকট্রিক কেটলি। জীবনযাপনের আধুনিক সব সরঞ্জাম নিয়ে কারাগারে আছে অস্ত্র মামলার আসামি জুয়েল। এই দুই বন্দিসহ কয়েকজন বিএনপির নেতা রীতিমতো ‘রাজার হালে’ থেকে নিয়মিত ফোনে বাসা ও নেতাকর্মীদের সাথে যোগাযোগ করছেন। যেখানে আইনশৃংখলা বাহিনী দিনরাত পরিশ্্রম করে তাদের আটক করে কারাগারে প্রেরণ করেন। সেখানে ডা. প্রবীর পালের মত দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তা নিজে লাভবান হওয়ার জন্য তাদের বিশেষ সুযোগ-সুবিধা করে দিচ্ছে। ময়মনসিংহ কেন্দ্রীয় কারাগারে বিএনপির নেতাকর্মীরা আদালতে হাজিরা দেওয়ার সময় দামি পোশাকের ওপর চাপায় ব্লেজার। এই পোশাক রাখার জন্য হাসপাতালে বেডে আছে ওয়াল হ্যাঙ্গারের ব্যবস্থা। তারা নিজের ইচ্ছামতো টেলিফোনে নিয়মিত বাসায় কথা বলেন। যখন ইচ্ছা তখনই কথা বলতে পারেন, এমন সুবিধা তাদের জন্য করে দেন ডা. প্রবীর পাল ও কারা কর্মকর্তা।
বিএনপি নেতাকর্মীরা বাইরের খবররা খবর নিতেও বেশিক্ষণ সময় লাগে না। অনুসন্ধানে আরও জানা গেছে, ময়মনসিংহ কেন্দ্রীয় কারাগারের হাসপাতালে রুম সাজিয়ে আরামে বিলাসী জীবনযাপন করছে বিএনপি নেতা ও দাগি বন্দি। তাদের জন্য সার্বক্ষণিক মোবাইল ফোনের সুবিধা নিয়ে কারাগারে বসেই বাইরের নিজ নিজ জগৎ চালাচ্ছে তারা। এদের মধ্যে আছেন ময়মনসিংহ কোতোয়ালী মডেল থানার সাবেক ওসি গোলাম সারোয়ার, শীর্ষ সন্ত্রাসী জুয়েল , খুনি, ব্যবসায়ী ও আওয়ামী লীগ এবং বিএনপি- জামাতের কয়েক নেতা। কারাভ্যন্তরে তারা ‘ভিভিআইপি’ ও ‘ভিআইপি’ বন্দি হিসাবে পরিচিত। কারাবিধি লঙ্ঘন করে এই বন্দিদের আয়েশি জীবনের নিশ্চয়তা দিয়ে মাসে লাখ লাখ টাকার বাণিজ্য করছেন কারাগারে কর্মরত ডাক্তার প্রবীর পাল।
সম্প্রতি কারামুক্ত একজন তার ৬ বছরের বন্দি জীবনের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে প্রতিদিনের কাগজকে বলেন, টাকা খরচ করতে পারলে ময়মনসিংহ কারাগারে সন্ত্রাসী, অপরাধীদের জন্য সবচেয়ে নিরাপদ স্থান কারা হাসপাতাল । বাইরে প্রতিপক্ষ ও পুলিশ-র্যাব’র ভয় থাকলেও কারাগারে নেই। প্রযুক্তির ব্যবহার করে কারাগারে বসেই সব নিয়ন্ত্রণের সুযোগ আছে। গোয়েন্দা সংস্থা যদি তাদের কথাবার্তা এবং অডিও সংগ্রহ করে তাহলেই অজানা অনেক ঘটনা তথ্য পাওয়া যাবে। সংশ্লিষ্ট কারাগারের দুর্নীতিবাজ ডা. প্রবীর পালের নৈতিকস্খলন এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, টাকা দিলে কারা হাসপাতালে বন্দিরা যা চায় তাই পায়। অভিযোগ আছে, ডাক্তার প্রবীর পাল দীর্ঘদিন ধরে হাসপাতালে সুস্থ বিএনপি নেতা ও দুর্নীতি মামলার বন্দিদের বিশেষ সুবিধা দিয়ে মাসে লাখ লাখ টাকা কামিয়ে নিচ্ছেন।
কারাগার থেকে সদ্য মুক্তিপ্রাপ্ত একজন বন্দি জানান, যার টাকা আছে তার জন্য জেলখানা নয়,তার কাছে বাড়ি মনে হয়। আমি দুই মাস ছিলাম দেখলাম নিজ চোখে ওসি সারোয়ার স্যার আর বিএনপির নেতারা হাসপাতালে বেডে আরামে কিভাবে থাকেন। তিনি আরও বলেন, আমি ১৫ দিন পর ৩ মিনিট কথা বলেছি। এটাই নাকি নিয়ম। কিন্তু বিএনপির নেতারা দিনে যখন খুশি তখন ফোনে কথা কেমনে বলে? আর কিছু বলতে চাই না,আপনেরা জেনে আসুন।
ডাঃ প্রবীর পাল অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, ‘আমি কারাগারে চিকিৎসক হিসেবে আছি। আমি বন্দিদের সুবিধা দেব কিভাবে? ৭ জন বন্দি ভর্তি আছে। সাবেক ওসি দিনে থাকে না,রাতে থাকেন। পরে আর কেও নেই বলে ফোন কেটে দেন। জানা গেছে, কারাবিধি ভেঙে ‘ভিআইপি’ সুবিধা যারা ভোগ করছেন তাদের মধ্যে অন্যতম হচ্ছে দুর্নীতির মামলার সাজাপ্রাপ্ত আসামী সাবেক ওসি গোলাম সারোয়ার ও কয়েকজন বিএনপির নেতাকর্মী। ময়মনসিংহ কেন্দ্রীয় কারাগারের সিনিয়র জেল সুপার জাহানারা বেগম এর সরকারী মোবাইল নাম্বারে বার বার বক্তব্য নিতে চাইলে তিনি রিসিভ করেননি।