রবিবার, ১৯ এপ্রিল ২০২৬, ০৮:২৭ পূর্বাহ্ন

সংবাদপত্র ও সাংবাদিকতা

সংবাদপত্র ও সাংবাদিকতা

সাংবাদিকতা একটি মহান পেশা। এই পেশার প্রতি আন্তরিকতা ও যথেষ্ট দুর্বলতা রয়েছে অধিকাংশ সচেতন মানুষের। সাংবাদিকতা পেশায় রয়েছে ঝুঁকি। পাশাপাশি রয়েছে সীমাহীন সম্মান ও অভূতপূর্ব রোমাঞ্চ। জনসেবা ও আত্মতৃপ্তি পাওয়ার জন্য সাংবাদিকতা একটি মহান ও স্বাধীন পেশা। এই জন্যই সংবাদপত্রকে সমাজের দর্পণ আর সাংবাদিকদের জাতির বিবেক বলা হয় । এছাড়া সংবাদপত্র রাষ্ট্রের চতুর্থ স্তম্ভ হিসেবেও স্বীকৃত। একজন সৎ, নির্ভীক ও নিরপেক্ষ সাংবাদিক সমাজ ও রাষ্ট্রের কাছে যেমন সমাদৃত, তেমনি দুর্নীতিবাজ, সন্ত্রাসী, চোরাকারবারি, সমাজ বিরোধী, মাদক কারবারি ও অসৎ রাজনীতিবিদদের কাছে এক মূর্তিমান আতংক।

সাংবাদিক হওয়ার যোগ্যতা:
সাংবাদিক হওয়ার জন্য শিক্ষার কোন উল্লেখযোগ্য মাপকাঠি নেই। তবে শব্দচয়ন, বাক্য গঠন, সংবাদ বুনন, ভাষা ও বানান সম্পর্কে সর্বোচ্চ সতর্ক জ্ঞান থাকা আবশ্যক। এছাড়া যিনি সাংবাদিকতার মতো ঝুঁকিপূর্ণ পেশায় নিয়োজিত হতে চান তার থাকতে হবে মানসিকভাবে অদম্য সাহস ও শারীরিক যোগ্যতা। একজন সাংবাদিককে হতে হবে মেধাবী, স্মার্ট ও চটপটে। থাকতে হবে যেকোনো পরিস্থিতি মোকাবেলা করার মতো ধৈর্য্য, সাহস ও মানসিকতা। ভদ্রোচিত ব্যবহার সাংবাদিকের একটি বিশেষ গুণ। সাংবাদিকদের নিরপেক্ষ হওয়া বাধ্যতামুলক। এছাড়া সংবাদ সরবরাহকারীদের (সোর্স) কাছে হতে হবে একজন প্রকৃত বন্ধুর মতো বিশ্বস্ত। কোন পরিস্থিতিতেই সংবাদের সোর্সের নাম-পরিচয় প্রকাশ করা যাবেনা। পরিচ্ছন্ন ও মার্জিত পোষাকও একজন সাংবাদিককে গ্রহণযোগ্য করে তোলে।

সংবাদ সংগ্রহ কোথা থেকেঃ
সংবাদ সংগ্রহের জন্য রয়েছে অনেক উৎস। তা হলো: (১) পুলিশ স্টেশন বা থানা / ডিএসবি/ সিআইডি (২) হাসপাতাল (৩) ফায়ার সার্ভিস (৪) বিমান বন্দর (৫) নদী বন্দর (৬) রেলওয়ে স্টেশন (৭) কাস্টমস অফিস (৮) মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অফিসসহ সরকারি ও বেসরকারি সকল প্রতিষ্ঠান (৯) ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী (১০) প্রেসনোট (১১) প্রেস রিলিজ (১২) হ্যান্ড আউট (১৩) সামাজিক সংগঠন (১৪) জেলা প্রশাসন (১৫) উপজেলা প্রশাসন (১৬) ইউনিয়ন পরিষদ (১৭) বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান (১৮) বিজিবি (১৯) স্থল বন্দর (২০) এনজিওসহ সমাজের ক্ষতিগ্রস্থ ব্যক্তি হতে পারে সংবাদের সোর্স ও উৎস।

সংবাদ সংগ্রহে প্রয়োজনঃ
সংবাদ সংগ্রহের জন্য একজন সাংবাদিকের থাকতে হবে Nose for News. অর্থাৎ সংবাদের গন্ধ শুঁকার মতো একটা নাক বা সহজাত প্রবৃত্তি। এর সাথে থাকতে হবে নোটবুক, ক্যামেরা , ভিডিও ক্যামেরা, ফোন, মোবাইল, ল্যাপটপ, কম্পিউটার, ই-মেইল, বাইসাইকেল, মোটরসাইকেল বা অন্য কোন প্রাইভেট বাহন। একজন পেশাদার সাংবাদিকের কাছে আর কিছু থাক আর না থাক, অন্ততঃ একটি কলম থাকা বাধ্যতামুলক। কলম থাকলে জরুরি কোনো সংবাদের তথ্য বাম হাতের তালুতেও লিখে রাখা যায়।

সংবাদ লিখার বিষয়:
আমাদের চারপাশে আমরা যা প্রত্যক্ষ করি তার অধিকংশই সংবাদের বিষয় হতে পারে। এরপরও নির্দিষ্ট কিছু বিষয়ের উপর সংবাদ লিখলে তা হতে পারে পাঠকের কাছে বিশেষ গ্রহণযোগ্য। যেমনঃ খুন, ধর্ষন, দুর্নীতি, নারী নির্যাতন, চুরি, ডাকাতি, ছিনতাই, দুর্ঘটনা , অপহরণ, মাদক ব্যবসা, চোরাচালান , সন্ত্রাস, অগ্নিকান্ড, যৌতুক, আইন-শৃঙ্খলা, সমস্যা ও সংকট, পরিবহন, রাস্তা, কালভার্ট , শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, শিল্পপ্রতিষ্ঠান , রোগ-ব্যাধি, চিকিৎসা, আদালত সংক্রান্ত, ব্যাংক বীমা, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি, নদ-নদী, কৃষি, মৎস্য ও গবাদি পশু, সংস্কৃতি, ক্রিড়া, বিদুৎ, রাজনৈতিক ইত্যাদি বিষয়ের উপর সংবাদ লেখা যেতে পারে। এছাড়া ব্যক্তিগত, সামাজিক নানাবিধ সমস্যা ও তার উত্তরণের উপর সংবাদ লেখা যেতে পারে। সংবাদ সংগ্রহের জন্য অনেক আগে থেকেই সাংবাদিকরা একটি সহজ পদ্ধতি ব্যবহার করে থাকেন। পদ্ধতিকে ইংরেজিতে বলা হয় ‘ফাইভ ডাব্লুউ ওয়ান এইচ’ ফরমুলা। বাংলায় বলা হয় ‘ষড় ক’ ফরমূলা। যেমনঃ (১) কে (২) কবে (৩) কখন (৪) কোথায় (৫) কীভাবে (৬) কেন। উদাহরণ স্বরূপ বলা যায়ঃ সোর্স জানালেন, এক ব্যক্তি খুন হয়েছে। ‘ষড় ক’ ফরমূলায় একজন সাংবাদিক সোর্সের কাছে প্রশ্ন করবেন এইভাবেঃ (ক) কে খুন হয়েছে (খ) কবে খুন হয়েছে (গ) কখন খুন হয়েছে (ঘ) কোথায় খুন হয়েছে (ঙ) কীভাবে খুন হলো (চ) কে খুন করলো। প্রশ্নগুলোর উত্তর সঠিক নিয়মে সাবলীল ভাষায় লিখলেই একটি পূর্ণ সংবাদ হয়ে যাবে।

সোর্স নিয়োগে সতর্কতাঃ
তিনিই হবেন একজন জনপ্রিয় সাংবাদিক যার রয়েছে সর্বস্তরে সোর্স। তবে সোর্স নিয়োগের ক্ষেত্রে অবলম্বন করতে হবে বিশেষ সতকর্তা। সোর্স নিয়োগের পূর্বে সংশ্লিষ্ট বিষয়ে তার জ্ঞান কতটুকু এবং তিনি ওই সংবাদের ব্যাপারে কতটা নিরপেক্ষ তা যাচাই করে নিতে হবে। নইলে ভুল তথ্যের জন্য আপনার কষ্ট করে লেখা সংবাদটি গ্রহণযোগ্যতা হারাতে পারে। আবার আপনার সম্পর্কে মানুষের মাঝে জন্মাতে পারে ভ্রান্ত ধারণা।

কীভাবে সংবাদ লিখবেনঃ
আধুনিক ইলেকট্রনিক্স যুগে সংবাদপত্রের পুরাতন ধ্যান ধারণা অনেকটা পাল্টিয়েছে। সংবাদ লেখার অনেকটা নিয়ম কানুনেরও ব্যাপক পরিবর্তন সাধিত হয়েছে । তবে সংবাদ লেখার প্রথমেই ঠিক করে নিতে হবে ‘‘সংবাদ শিরোনাম’ সংক্ষিপ্তাকারে চমকপ্রদ বাক্যে লিখতে হবে শিরোনাম । যাতে পাঠকের সংবাদ পড়ার আগ্রহ সৃষ্টি হয়। এরপর লিখতে হবে ‘‘সূচনা সংবাদ’’। ইংরেজিতে যাকে ‘ইনট্রো’ বলে। সূচনা সংবাদ হলো পুরো সংবাদের সংক্ষিপ্ত সার।

জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক আশিকুর রহমান অপুর ভাষায় সাংবাদিকতায় এখনকার ৯ শ্রেণির লোক কাজ করছেন।
(১) ৩০ শতাংশ জামায়াত কর্মী। এরা নিজেদের রাজনৈতিক সিদ্ধির জন্য সাংবাদিকতাকে হাতিয়ার হিসেবে বেছে নিয়েছে। গত ১৫ বছরে এই সংখ্যা লাফিয়ে লাফিয়ে বেড়েই যাচ্ছে।
(২) ৫ শতাংশ বাম ধারার লোক। এদের বেশিরভাগই একসময় বিপ্লবের স্বপ্ন দেখতেন এখন কি করবেন না করবেন জানেন না।
(৩) ১০ শতাংশ সমাজ সুন্দর করার জন্য স্বপ্ন দেখেন এমন মানুষ। কোনো রাজনৈতিক দলের প্রতি অনুগত না। কাজ কাম কি করা যায়, এই চিন্তা আর নিজের আদর্শ মিলিয়ে এনারা সাংবাদিক।
(৪) ১৫ শতাংশ মধ্য ধারার রাজনৈতিক কর্মী বা কট্টর সমর্থক। এরা পাকে পড়ে বা ঘটনাচক্রে সাংবাদিক। এই ১৫ শতাংশের বেশিরভাগ আওয়ামী লীগের অনুগত। তুলনামূলক বিএনপির লোক একটু কম।। ছিটেফোঁটা জাতীয় পার্টি মার্কাও কিছু আছেন।
(৫) ৫ শতাংশ বাপ-চাচা বা পরিবার বা কাছের বড় ভাই সূত্রে সাংবাদিক। এদের ৯০% ই নিজেকে বিশাল সাংবাদিক ভাবেন৷ বেশিরভাগ হাউজে এনারা হাসাহাসির পাত্র। কারণ পরিবার সূত্রের দাপটে সাংবাদিক হিসেবে তাঁদের বেশিরভাগেরই শিক্ষণ প্রক্রিয়া হবার আগেই পদ বা সুবিধা পেয়ে আর ঠিকমতো শেখেন নাই। বাকি ১০% খুবই সুনাম অর্জন করেছেন।
(৬) ৫ শতাংশ জেনে বুঝে সাংবাদিকতাকে পেশা হিসেবে নিয়েছে। এর রিস্ক ফ্যাক্টর বুঝেই এরা পেশাটাকে এগিয়ে নিতে চায়। এরা বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই নিজ নিজ কর্ম ক্ষেত্রে তুলনামূলক বেশি প্রভাবশালী।
(৭) ৫ শতাংশ অন্য পেশা না পেয়ে সাংবাদিক হয়ে গেছে। এই সংখ্য বেশি থাকে, এরা পেশা ছেড়ে চলে যায়। তাও ৫% রয়ে যায়।
(৮) ৫ শতাংশ ভবিষ্যতে অন্য কিছু করবে, রাজনৈতিক হবেন বা লেখক হবেন বা ফিল্ম বানানোর ইচ্ছে, আপাতত এই পেশায় আছেন এরাও তুলনামূলক ভাল করছেন।
(৯) ২০ শতাংশ এরা গ্ল্যামার বা বিখ্যাত হবার লোভে টেলিভিশন, রেডিও বা পত্রিকায় আসেন। এদের বেসিক কোনো এথিকস থাকে না। এরা কোনো রকম যোগ্যতা ছাড়াই বস লেভেলে তেলবাজি করে দ্রুত ওপরে ওঠেন। ধরেন রিপোর্টিং বা সাব এডিটিং করার বেসিক যোগ্যতায় পিছিয়ে থেকেও এরা সবচেয়ে প্রভাবশালী হয়ে যান।

একটি দৈনিক সংবাদপত্রে সম্পাদক থেকে শুরু করে সংবাদদাতা পর্যন্ত বিভিন্ন পদ রয়েছে। এগুলোর মধ্যে প্রধান পদগুলো হলো:
১. সম্পাদক, ২. নির্বাহী সম্পাদক, ৩. ব্যবস্থাপনা সম্পাদক, ৪. বার্তা সম্পাদক, ৫. সহকারী সম্পাদক, ৬. বিশেষ প্রতিনিধি, ৭. ফিচার সম্পাদক, ৮. নগর সম্পাদক, ৯. উপসম্পাদক, ১০. যুগ্ম বার্তা সম্পাদক, ১১. প্রধান প্রতিবেদক, ১২. প্রধান সহসম্পাদক, ১৩. সিনিয়র সহসম্পাদক, ১৪. সিনিয়র প্রতিবেদক, ১৫. সিনিয়র সংবাদদাতা, ১৬. ব্যুরো প্রধান, ১৭. প্রধান আলোকচিত্র সাংবাদিক, ১৮. সিনিয়র আলোকচিত্র সাংবাদিক, ১৯. সিনিয়র কার্টুনিস্ট, ২০. সিনিয়র আর্টিস্ট, ২১. ক্রিড়া সম্পাদক, ২২. বাণিজ্য সম্পাদক, ২৩. শিফট ইনচার্জ, ২৪. মফস্বল সম্পাদক, ২৫. সম্পাদকীয় সহকারী, ২৬. সহসম্পাদক, ২৭. নিজস্ব প্রতিবেদক, ২৮. নিজস্ব সংবাদদাতা।
এছাড়াও একটি দৈনিক পত্রিকায় উপদেষ্টা সম্পাদক, বিজ্ঞাপন ব্যবস্থাপক, সার্কুলেশন ব্যবস্থাপক, প্রুফরিডার, কম্পিউটার অপারেটর, গ্রাফিকস ডিজাইনার, হিসাবরক্ষক, বিজ্ঞাপন প্রতিনিধিসহ আরো কিছু পদ রয়েছে।

অনুলিখন: তৌহিদ বেলাল
চট্টগ্রাম বিভাগীয় ব্যুরো চিফ, দৈনিক প্রতিদিনের কাগজ এবং করেসপন্ডেন্ট, কলকাতা এক্সপ্রেস।

শেয়ার করুন

Comments are closed.




দৈনিক প্রতিদিনের কাগজ © All rights reserved © 2025 Protidiner Kagoj |