রবিবার, ১৯ এপ্রিল ২০২৬, ০৮:২৭ পূর্বাহ্ন
তৌহিদ বেলাল, চট্টগ্রাম ব্যুরো
রমজানে কক্সবাজার সমুদ্রসৈকতে পর্যটকের আনাগোনা নেই বললেই চলে। তবে আগামী ঈদ মৌসুমকে সামনে রেখে বিভিন্নভাবে প্রস্তুতি চলছে হোটেল-মোটেল, কটেজ ও রেস্টুরেন্টগুলোয়। অনেক হোটেল-রেস্তোরায় আবার বিভিন্ন সংস্কার ও নতুন করে সাজসজ্জার কাজ চলছে। এছাড়া পর্যটকশূণ্যতার অজুহাতে অনেক হোটেল-রেস্তোরায় কর্মচারী ছাঁটাই করা হয়েছে।
পর্যটনশূণ্য সৈকত:
চলতি রমজান মাসের প্রথম থেকেই কক্সবাজারে পর্যটকদের আনাগোনা নেই। কক্সবাজারের হোটেল-মোটেল ও কটেজগুলোতে নেই দেশ-বিদেশের পর্যটকদের পদচারণা। পৃথিবীর দীর্ঘতম নিরবচ্ছিন্ন সমুদ্রসৈকতটিতে দেখা মিলছেনা কোনো ভ্রমণপিপাসুর।
বুকিং নেই হোটেলগুলোতে:
পর্যটন নগরী কক্সবাজারে প্রায় পাঁচশো হোটেল-মোটেল ও কটেজে রয়েছে। রমজান মাসে এসব হোটেলে আগাম কোনো বুকিং নেই। প্রায় সব হোটেল-মোটেল ও কটেজে অনেকটা সুনসান নীরবতা বিরাজ করছে।
কলাতলি এলাকার ওয়ার্ল্ড বিচ রিসোর্টের ম্যানেজার (ব্যবস্থাপক) মুহাম্মদ ছৈয়দ বলেন- ‘রমজান মাসে পর্যটকদের আনাগোনা নেই বললেই চলে। প্রয়োজনের তাগিদে কেউ এলে তারা এক, দু’দিন অবস্থান করে কাজ সেরে ফিরে যাচ্ছেন’।
বন্ধ আছে প্রায় রেস্তোরাঁ:
আবাসিক হোটেল-মোটেল ও কটেজের মতো এখানকার অধিকাংশ খাবার হোটেলগুলো বন্ধ রাখা হয়েছে। অনেক রেস্তোরাঁয় চলছে নতুন করে সাজসজ্জার কাজ। তবে হাতেগোনা কিছু খাবার হোটেল খোলা রাখা হলেও সেগুলোতে বেচা বিক্রি তেমন একটা নেই।
কলাতলি সড়কের হোটেল বিচ বিরামের স্বত্বাধিকারী মুহাম্মদ শরিফ বলেন- ‘রমজান মাস জুড়ে পর্যটকের তেমন দেখা মেলেনা। ফলে বাধ্য হয়েই রমজান মাসে রেস্তোরাঁ বন্ধ রাখতে বাধ্য হয় মালিকেরা। কিছু কিছু খোলা থাকলেও সেগুলোতে ভর্তুকি দিতে হয়’।
কর্মচারী ছাঁটাই:
রমজান মাসে হোটেল-মোটেল, গেস্ট হাউস, কটেজ ও রেস্তোরাঁ বন্ধ রাখার অজুহাতে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক কর্মচারী ছাঁটাই করা হয়েছে। চাকরি হারিয়ে এসব লোকজন পরিবার-পরিজন নিয়ে আর্থিক অনটনে পড়েছেন। ঈদে স্ত্রী-সন্তান ও স্বজনদের মুখে হাসি ফোটানোর পরিবর্তে তারা নিজেরাই আর্থিক দৈন্যদশায় পড়ে হতাশায় দিন পার করছেন।
রেস্তোরাঁ কর্তৃপক্ষ যা বলেন:
হিমছড়ি ট্যুরিজম স্পটের একটি রেস্তোরাঁর ব্যবস্থাপক ফাহিম আসাদ বাবু বলেন- ‘রমজান মাস এলেই অতিরিক্ত কর্মচারী ছাটাই করা হয়। তবে পুরনো ও অভিজ্ঞদের এই একমাসের বেতন দিয়ে ধরে রাখা হয়। নয়তো ঈদের পর তারা অন্য হোটেলে চাকরি নিয়ে নেন’।
কর্মকর্তা-কর্মচারী অ্যাসোসিয়েশন যা বলে:
কক্সবাজার হোটেল-মোটেল কর্মকর্তা-কর্মচারী অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক কলিমউল্লাহ বলেন- ‘রমজান মাসে পর্যটক না থাকার অজুহাতে বহু হোটেল-কটেজ কর্মচারী ছাঁটাই করেছে। এতে পুরো রমজান ও ঈদে পরিবার-পরিজন নিয়ে তাদের কষ্টে থাকতে হবে’।
ফ্ল্যাট ব্যবসায়ীর অভিমত:
কক্সবাজার শহরের কলাতলি সড়কের হোটেল-মোটেল জোনের একাধিক আবাসিক হোটেলের ফ্ল্যাট ব্যবসায়ী মুবিনুল ইসলাম শুভ বলেন- ‘রমজান মাস শুরু হওয়ার পর থেকে কক্সবাজারে পর্যটকের আনাগোনা নেই। গত দশদিনে দু’চারটি কক্ষ ভাড়া হয়েছে। তাও গেস্টরা বিভিন্ন প্রয়োজনের তাগিদে কক্সবাজারে এসেছেন। এই সুযোগে ফ্ল্যাটের বিভিন্ন সংস্কার কাজ করা হচ্ছে। কারণ ঈদুল ফিতরের পর থেকে কক্সবাজারে কাঙ্ক্ষিত পর্যটক আসতে শুরু করবে। রমজান মাসের আর্থিক লোকসান ঈদের মৌসুমে পুষিয়ে নিতে হবে’।
হোটেল ব্যবসায়ী যা বলেন:
কলাতলির হোটেল লজ’র অন্যতম কর্ণধার সিরাজুল হক মুন্না বলেন- ‘পুরো রমজান মাসে পর্যটক আসবেনা কক্সবাজারে। ফলে ঈদের আগ পর্যন্ত কোনো কক্ষ বুকিং হওয়ার তেমন সম্ভাবনা নেই বললেই চলে। এখন হোটেলকে নতুন রূপে সাজানোর উপযুক্ত সময়। তাই হোটেলের কক্ষগুলো পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন করা হচ্ছে। একইসঙ্গে ফ্রন্ট ডেস্ক থেকে শুরু করে বাহ্যিক স্থানগুলোকেও নতুন করে সাজানো হচ্ছে’।
পর্যটকের অভিমত:
চট্টগ্রাম থেকে আসা গৃহবধূ জিনান ফারজানা বলেন- ‘শারীরিক অসুস্থতার কারণে চিকিৎসকের পরামর্শে কক্সবাজার সমুদ্র সৈকতে বেড়াতে এসেছি। এখানে এসে দেখি সবটা ফাঁকা। কোথাও অন্য কোন পর্যটকের দেখা নেই। ফাঁকা সৈকতে তেমন একটা ভালো লাগছে না। অথচ অন্য সময় পুরো সৈকত জুড়ে পর্যটকে গিজগিজ করে’।
স্থানীয়দের ভাবনা:
কক্সবাজারের স্থানীয় কলেজছাত্রী তানজিনা তাবাসসুম মিম বলেন- ‘রোজা রেখে সময় কাটাতে ভাইবোনদের নিয়ে একটু সৈকতে ঘুরতে এসেছি। একপ্রকার ভালোই লাগছে, কোনো কোলাহল নেই’।
হোটেল-মোটেল মালিক সমিতি:
কক্সবাজার হোটেল-মোটেল ও গেস্ট হাউস মালিক সমিতির সভাপতি আলহাজ্ব আবুল কাশেম সিকদার বলেন- ‘স্বাভাবিকভাবেই রমজান মাসে কক্সবাজারে তেমন একটা পর্যটকের আনাগোনা থাকেনা। অন্য বছরগুলোতে রমজান মাসে কিছু কিছু পর্যটকের দেখা মেলে। তবে এবছর পর্যটকশূণ্যতা বেশি। ফলে সব ধরণের হোটেল-মোটেল ও গেস্টহাউস বুকিংশূণ্য রয়েছে’।
বন্ধ অন্যসব ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান:
শুধুই হোটেল-মোটেল, কটেজ, গেস্ট হাউস ও রেস্টুরেন্ট নয়, রমজানের কারণে পর্যটন সংশ্লিষ্ট অন্যান্য ব্যবসাগুলোও বন্ধ রয়েছে। বিশেষ করে কক্সবাজার সমুদ্র সৈকত এলাকার শামুক-ঝিনুক, আচার, ফিস ফ্রাইসহ ভাসমান হকার ও অন্যান্য দোকানগুলোর ৯০ ভাগই বন্ধ রাখা হয়েছে। ফলে এসব ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদেরও দারুণ দুর্দিন যাচ্ছে।
জেলা প্রশাসনের অভিমত:
কক্সবাজারের জেলা প্রশাসক মো: শাহীন ইমরান বলেন- ‘রমজান মাসে কক্সবাজার সমুদ্র সৈকতে ভ্রমণের আগ্রহ তেমন একটা থাকেনা পর্যটকদের। তাই এই মাসটিতে পর্যটকদের খুব একটা দেখা মেলেনা। তবে আবহাওয়া পরিস্থিতি স্বাভাবিক থাকলে ঈদ মৌসুম ও পরের দিনগুলোতে পর্যটকদের উপচেপড়া ভিড় থাকবে’।