মঙ্গলবার, ০৩ মার্চ ২০২৬, ১২:২৭ অপরাহ্ন

বেগম রোকেয়া দিবস-২০২২ পাচঁ জয়ীতার আত্মকাহিনী

বেগম রোকেয়া দিবস-২০২২ পাচঁ জয়ীতার আত্মকাহিনী

মোঃ নাঈমুজ্জামান নাঈম,কুলিয়ারচর

জীবনযুদ্ধে হার না মানা কয়েকজন সংগ্রামী জয়িতাদের আত্মকাহিনী । বাংলাদেশের এগিয়ে যাওয়া নারীদের সাফল্য গাঁথা তুলে ধরতে সরকারের এক ব্যাতিক্রমী উদ্যোগ “জয়িতা অন্বেষণে বাংলাদেশ” । এ কর্মসূচীর আওতায় জীবন যুদ্ধে জয়িতা নারীদের সংবর্ধনা জানানো হয় । এবার কুলিয়ারচর উপজেলার পাঁচজন সম্মান প্রাপ্ত জয়িতাদের মধ্যে সনদ প্রদান করা হয়েছে । উপজেলা মহিলা বিষয়ক কর্মকর্তা মালা বড়াল-এর সহযোগিতায় কুলিয়ারচর উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) সাদিয়া ইসলাম লুনা পাঁচ জয়িতাদের সম্মাননা ক্রেস্ট, সনদ ও উপহার প্রদান করেন । আমাদের মধ্যে ভয় বলে কিছু ছিল না । পেছনের সকল বাধা আর অভাব অনটন সবকিছু ভুলে গিয়ে নিজেদেরকে সামনে এগিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করতে শুরু করেছিলাম, নিজেদের সবর্স্ব নিবেদন করেছি হারিয়েছি আনেক কিছু কিন্তু কোনো আফসোস নেই, আছে সফলতার আনন্দ, সেই উত্তাল গৌরবোজ্জ্বল তারুন্যের স্মৃতি । পেছনের সেই দিনের স্মৃতি চারণ করতে গিয়ে এভাবেই নিজেদের পরিতৃপ্তির অভিব্যক্তি প্রকাশ করলেন পাঁচ জয়িতা নারী জান্নাতুল মিশু, মোছাঃ মাহবুবা আক্তার, পেয়ারা বেগম, লুৎফা বেগম ও ফরিদা আক্তার । তাদের সেই আনন্দ ও শ্রেষ্ঠ জয়িতা প্রাপ্তি তাদের উত্তরসুরীদের কাছে পৌছে দিতে আন্তর্জাতিক নারী নির্যাতন প্রতিরোধ পক্ষ ও বেগম রোকেয়া দিবসে কুলিয়ারচর উপজেলা প্রশাসন ও উপজেলা মহিলা বিষয়ক অধিদপ্তরের আয়োজনে জয়িতাদের সংবর্ধনা অনুষ্ঠান ।

ছয়সুতী ইউনিয়নের উত্তর নন্দরামপুর গ্রামের সমাজ উন্নয়নে অসামান্য অবদান রেখে সাফল্য অর্জনকারী নারী ফরিদা আক্তার জানান, ছোটবেলা থেকেই স্বপ্ন ছিল সমাজের মানুষের সেবা ও উন্নয়নমূলক কাজে নিজেকে নিয়োজিত করব। কারন, সমাজের বিভিন্ন অনিয়ম ও অসঙ্গতি বিশেষ করে সমাজের নারীদের অধস্থন অবস্থান কষ্ট দিত । পরে সমাজের মানুষের কথায় স্বামীর সাপোর্টে ইউপি নির্বাচনে নারী সদস্য পদে বিপুল ভোটে নির্বাচিত হই । তারই সুবাদে সমাজসেবা ও সমাজের উন্নয়নমূলক কাজ করার সুযোগ পাই । সেই থেকে
সবসময় সমাজ উন্নয়নমুলক বিভিন্ন কাজের সাথে নিজেকে সংশ্লিষ্ট রেখে এবং নারী ও শিশুর প্রতি যত ধরনের নির্যাতন হয় তা প্রতিরোধে কাজ করি । অধিকার বঞ্চিত নারী ও কিশোরীদের অধিকার ফিরিয়ে দেয়ার জন্য সর্বদা সহযোগিতা করে । সমাজে বাল্যবিবাহ প্রতিরোধে গুরুত্বপূর্ণ ভুমিকা পালন করে । গ্রামের বেকার নারী-পুরুষদের বেকারত্ব দুরীকরণে উপজেলা যুব উন্নয়ন ও মহিলা বিষয়ক অফিসের সাথে যোগাযোগ করে বিভিন্ন দক্ষতামুলক প্রশিক্ষণ দিয়ে থাকে । অদম্য ইচ্ছাশক্তি একজন মানুষকে বদলে দিতে পারে এবং আত্মনির্ভরশীল হিসেবে গড়ে তোলে ।
উছমানপুর ইউনিয়নের উছমানপুর গ্রামের নির্যাতনের বিভীষিকা মুছে ফেলে নতুন উদ্যোমে জীবন শুরু করেছেন যে নারী লুৎফা বেগম জানান, মাত্র ১২ বছর বয়সেই বিয়ে হয়
আমার বাবার আর্থিক অবস্থা ভালো ছিল না । অভাবী সংসারে লেখাপড়াও ভালো করে হয়ে উঠেনি । আজ থেকে ২৪ বৎসর পূর্বে মোঃ লাল মিয়ার সাথে বিয়ে হয় । একটি ছেলে সন্তানের জননী বিয়ের মাত্র ৪ বছর পরই স্বামী তাকে তালাক দেয় । কারন, স্বামী ২য় বিয়েতে আবদ্ধ হয় । এক মাত্র ছেলেকে নিয়ে বাবার বাড়িতে আশ্রয় নেয় । কিন্তু গরীব বাবার ঘরে বোজা না থেকে নিজেই কৃষি শ্রমিক হিসেবে মাঠে-ঘাঠে ও রাস্তায় মাটি ভরাটের কাজ করে । আরো বেশি আর্থিক উপার্জনের জন্য এলাকায় এক দর্জির কাছ থেকে সেলাই প্রশিক্ষণ গ্রহণ করে । পল্লী সমাজের সভা প্রধানের সহযোগিতায় স্থানীয় এনজিও ব্র্যাক অফিস থেকে ঋণ গ্রহণ করে একটি সেলাই মেশিন ক্রয় করে । সংসারের খরচ ও একমাত্র ছেলের পড়াশুনার খরচ চালানোর জন্য অন্যের পোল্ট্রি ফার্মে কাজ করে । এই কাজের ফাঁকে ফাঁকে কাগজের ঠোঙ্গা বানিয়ে দোকানে দোকানে বিক্রি করে । এভাবেই সংসারের যাবতীয় খরচ চালিয়ে যাচ্ছি । আমি স্বামী বিহীন হলেও ছেলেকে নিয়ে ভাল আছি এবং বিভিন্ন নির্যাতন থেকে বেঁচে আছি ।

গোবরিয়া আব্দুল্লাহপুর ইউনিয়নের পশ্চিম আব্দুল্লাহপুর গ্রামের শিক্ষা ও চাকুরী ক্ষেত্রে সাফল্য অর্জনকারী নারী মাহবুবা আক্তার জানান, প্রাইমারি কিংবা মাধ্যমিকের মাঝামাঝি পর্যন্ত কোনোদিন টের পাইনি “আর্থিক সংকট” বলে একটা শব্দ আছে, যেটা পড়াশোনার শব্দটার সাথে কানেক্টেড । অভাব অনটনের সংসারে আট বোনসহ আমাদের তখন ১১ জনের পরিবার । পড়াশোনা তো দুরের কথা সংসার চালাতেই হিমশিম খাচ্ছে বাবা । কষ্টের মধ্যেই ঢাবি, রাবি, জাবি ঘুরে অবশেষে আমার ঠিকানা হলো, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের “গাহস্থ্য অর্থনীতি ইউনিট” এ । ভর্তি হলাম ‘ক্লথিং এন্ড টেক্সটাই’ সাবজেক্টে । উঠলাম ‘শেখ হাসিনা হল’-এ । সকালে ইউভার্সিটিতে ক্লাস, বিকেলে পাবলিকেশন্সে কাজ, সন্ধ্যায় টিউশন করেও দারিদ্র মিঠছে না । এভাবেই চললো পুরো দুবছর । পরে ‘হিস্ট্রি এন্ড কালচার সার্কেল বাংলাদেশ লিমিটেড’এ ‘মুজিবপিডিয়া’ নামে বিশাল প্রজেক্টে চাকরি হলো । পড়াশোনার পাশাপাশি ভালো বেতনে চাকরিতে সুনামের সহিত চলছে চাকরি জীবন । ইচ্ছাশ্রম থাকলে সবকিছু করা সম্ভব এবং জীবন ও সংসার প্রতিষ্ঠিত করা যায়, বর্তমানে পরিবারের সকলকে নিয়ে ভালো আছি ।
কুলিয়ারচর পৌরসভার মইপুর কাফাইয়াকান্দি মহল্লার সফল জননী নারী পেয়ারা বেগম জানান, অল্প বয়সেই বিয়ে পিঁড়িতে বসতে হলো । স্বামী উপজেলা সদরে বাদাম মিল-এ চাকরি করতো । ৬ মেয়ে ও ৩ ছেলে রেখে স্বামী মারা যান । শুরু হয় কষ্টের জীবন । সারাক্ষণ চিন্তিত থাকে মন । ছেলে-মেয়েদের কিভাবে পড়াশোনা করানো যায় । স্বপ্ন ছিলো ছেলে-মেয়েদের লেখাপড়া করে উপযুক্ত মানুষ হিসেবে গড়ে তোলা । পরে বাবার বাড়ির সহযোগিতায় পড়াশোনা করাতে থাকি । এরই মধ্যে বড় ছেলে পড়াশোনা শেষ করে ঢাকায় ব্যবসা করছেন, ২য় ছেলে পড়াশোনা শেষ করে বাংলাদেশ পুলিশে র‌্যাব-১১ এ উপ-পরিদর্শক পদে আছেন, ৩ য় ছেলে ইনকাম টেক্স এ চাকুরি করছেন, বড় মেয়ে ১টি সরকারি কলেজের প্রভাষক, ২ য় মেয়ে ব্র্যাকের একটি শাখার একাউন্টেন্ট পদে কর্মরত, ৩ য় মেয়ে জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের প্রকৌশলী পদে আছেন, ৪ র্থ মেয়ে জনতা ব্যাংকের সিনিয়র অফিসার পদে কর্মরত, ৫ম মেয়ে বাংলাদেশ পুলিশের পুলিশ সার্জেন্ট পদে আর ছোট মেয়ে ইডেন মহিলা কলেজ থেকে বিএসএস ও এমএসএস শেষ করে চাকুরির অপেক্ষায় আছেন ।
আমার কর্মদক্ষতা দিয়ে ছেলে-মেয়েদের সুশিক্ষিত হিসেবে গড়ে তুলতে অনেক সংগ্রাম করেছি।
ছয়সুতী ইউনিয়নের লোকমানখাঁর কান্দি গ্রামের অর্থনৈতিকভাবে সাফল্য অর্জনকারী নারী জান্নাতুল মিশু জানান, দুই-ভাইবোন নিয়ে মায়ের সাথে নানা বাড়িতে বসবাস । এইচএসসি পাশ করে একটি কেজি স্কুলে শিক্ষকতার চাকরির পাশাপাশি টিউশনি করেছি । আর ডিগ্রিতে ভর্তি হয়ে পড়াশোনাও চালিয়ে যায় । অসুস্থ মা আর ভাই-বোনের দায়িত্ব আমার গাড়ে । কোভিডের কারণে শিক্ষকতার পেশায় মন্দা অবস্থায় কাটতে থাকলে কাছের বন্ধুর কাছ থেকে টাকা ধার নিয়ে একজন নারী উদ্যোক্তা হিসেবে ব্যবসা শুরু করি । এর পাশাপাশি সুবিধাবঞ্চিতদের বিনামুল্যে পড়াশোনা করায় । আমি এফ কমার্সে সবচেয়ে বৃহত্তর গ্রæপ ডব ঞৎঁংঃ প্লাটফর্মে নিজের পরিচিতি বৃদ্ধির মাধ্যমে এবং বিভিন্ন ভলান্টারি সংগঠনের সাথে যুক্ত থাকায় বেশ অল্প দিনের মধ্যেই আস্থা রাখলাম গ্রাহকের । পরে বিভিন্ন শিল্প প্রতিষ্ঠান থেকে প্রশিক্ষন নিয়ে নিজেকে একজন সফল উদ্যোক্তা হিসেবে কাজ করতে থাকি । এরই মধ্যে অর্থনৈতিকভাবেও চাঙ্গা হতে থাকি । আমার অধীনে অনেক কর্মীও কাজ করেন । এর মাধ্যমে নিজেও যেমন অবস্থা উন্নতি করছি এবং অন্যদেরকেও  অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী করে তুলছি ।

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

শেয়ার করুন

Comments are closed.




দৈনিক প্রতিদিনের কাগজ © All rights reserved © 2025 Protidiner Kagoj |