মঙ্গলবার, ০৩ মার্চ ২০২৬, ০৮:২৮ অপরাহ্ন
মোঃ রহমত উল্যাহ : বাংলাদেশ পুলিশের উপ-পুলিশ মহাপরিদর্শক (ডিআইজি) হারুন-অর-রশীদ কিশোরগঞ্জ জেলার মিঠামইন উপজেলার হোসেনপুর গ্রামে সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। বাবা বীরমুক্তিযোদ্ধা আবদুল হাসেম এবং মাতা জহুরা খাতুনের গর্বিত সন্তান। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগ থেকে অনার্স, এমএসএস, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এলএলবি করে শিক্ষাজীবন শেষ করেন।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সমাজ বিজ্ঞানে অনার্স ও মাস্টার্স শেষ করে বিসিএস পুলিশ ক্যাডারে ২০তম ব্যাচে এএসপি হিসেবে পুলিশে যোগ দেন তিনি।
তিনি গাজীপুর, নারায়ণগঞ্জের পুলিশ সুপার ছিলেন। ডিএমপির তেজগাঁও বিভাগের উপ-কমিশনার থাকা অবস্থায় ২০২১ সালের-২মে হারুন-অর-রশীদ অতিরিক্ত ডিআইজি পদে পদোন্নতি পান। এরপর তিনি ঢাকা মহানগর (উত্তর) গোয়েন্দা পুলিশের যুগ্ম কমিশনার ছিলেন। পরবর্তীতে ২০২২ সালের ১২ মে ডিআইজি পদে পদোন্নতি পান। তিনি দুইবার বিপিএম পদক ও দুইবার পিপিএম পদক পেয়েছেন।
নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর বিরোধীদলের হরতাল চলাকালে বিএনপি নেতা জয়নুল আবদিন ফারুককে মারধরের ঘটনায় আলোচিত হয়েছিলেন তিনি।
২০১৬ সালে ইউনিয়ন পরিষদ (ইউপি) নির্বাচনের তৃতীয় দফায় গাজীপুর সদর, শ্রীপুর ও কাপাসিয়ায় ইউপি নির্বাচনকে কেন্দ্র করে নির্বাচন কমিশনের নির্দেশনা অনুযায়ী ওই বছরের ২১ এপ্রিল এসপি হারুন-অর-রশিদকে গাজীপুর থেকে প্রত্যাহার করা হয়েছিল। নির্বাচন সম্পন্ন হওয়ার পর প্রত্যাহারের আদেশ তুলে নিয়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় তাকে ওই বছর ৩ মে গাজীপুরের পুলিশ সুপার পদে পুনর্বহাল করে। ২০১৮ সালের ১ আগস্ট স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জননিরাপত্তা বিভাগের এক প্রজ্ঞাপনে তাকে গাজীপুর থেকে ডিএমপিতে বদলি করা হয়েছিল। গাজীপুরে দায়িত্ব পালনের আগেও ডিএমপিতে দায়িত্বরত ছিলেন তিনি।
২০১৬ সালে অনুষ্ঠিত পুলিশ সপ্তাহে ভাল কাজের স্বীকৃতিস্বরূপ তাকে বিপিএম পদকে ভূষিত করা হয়। এর পূর্বে তিনি দু’বার পিপিএম পদক লাভ করেন।
২০১৮ সালের ২ ডিসেম্বর হারুন-অর-রশীদ নারায়ণগঞ্জের পুলিশ সুপার হিসেবে যোগ দেন। নারায়ণগঞ্জে এসপি হারুন-অর-রশীদ যোগদানের পর থেকেই সন্ত্রাস, চাঁদাবাজী, ভূমিদস্যুতা, ঝুট সন্ত্রাসীসহ সকল অপরাধীর বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেন। একের পর এক সুনাম পাওয়ার মত কর্মকান্ড করে যান। এমনই এক ঘটনা ঘটে সিদ্ধিরগঞ্জ থানাধীন মৌচাক এলাকায়। এসপির কাছে ভূক্তভোগী জমির মালিক ও ভাড়াটিয়া সহযোগীতা চেয়ে হস্তক্ষেপ চাওয়ার সাথে সাথেই সিদ্ধিরগঞ্জ থানার ওসি শাহীন পারভেজকে ব্যবস্থা নিতে বাধ্য করান এসপি হারুন-অর-রশিদ। মামলার পর সুষ্ঠু বিচার পাওয়ায় এসপি হারুন-অর-রশিদকে সাধুবাধ জানায় ভুক্তভোগী জমির মালিক ও ভাড়াটিয়া।
নারায়ণগঞ্জে পুলিশ সুপার থাকা সময়ে বেশ আলোচিত হয়ে উঠেন হারুন-অর-রশিদ যিনি এখন পুলিশের ডিআইজি ও ডিবি প্রধান হিসেবেও নিজেকে আলোচনায় রেখেছেন চাঞ্চল্যকর মামলার উদঘাটনসহ নানা ইস্যুতে। প্রায় তিন বছরের অধিক সময়ের আগে তিনি নারায়ণগঞ্জ থেকে বদলী হলেও এ শহরের মানুষ এখনো তার অভাব অনুভব করছে কয়েকটি ইস্যুতে। বিশেষ করে সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে অভিযান, শহরের ফুটপাত হকারমুক্ত, অবৈধ পরিবহন স্ট্যান্ড, মাদক ব্যবসা বন্ধসহ শহরের শৃঙ্খলা ফেরানো।
এসপি হারুন-অর-রশিদ ২০১৮ সালের ডিসেম্বর ও ১৯ সালের জানুয়ারি-ফেব্রুয়ারি মাসের অপরাধ সভায় পরপর তিনবার ঢাকা রেঞ্জের শ্রেষ্ঠ পুলিশ সুপার নির্বাচিত হয়েছিলেন। মাদক উদ্ধার, মামলার রহস্য উদ্ঘাটন, ওয়ারেন্ট তামিল, হকার উচ্ছেদ, শিল্প এলাকায় শান্তি-শৃঙ্খলা রক্ষাসহ নারায়ণগঞ্জ জেলার সার্বিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি সন্তোষজনক হওয়ায় ধারাবাহিকতা ধরে রেখে ওই বছরের মে, জুন ও জুলাই মাসে একটানা পরপর তিনবারসহ সর্বমোট ষষ্ঠবার ঢাকা রেঞ্জের শ্রেষ্ঠ এসপি নির্বাচিত হন তিনি।
২০১৯ সালে পুলিশ সার্ভিস এসোসিয়েশনের সেক্রেটারী নির্বাচিত হন তিনি। বৃহত্তর ময়মনসিংহ তথা (জামালপুর, শেরপুর, টাঙ্গাইল, কিশোরগঞ্জ, নেত্রকোনা ও ময়মনসিংহ) জেলার সমিতির সদস্যদের সমর্থনে সাধারণ সম্পাদক হিসেবে নির্বাচিত হন।
নারায়ণগঞ্জে পুলিশ সুপার থাকা সময়ে তাঁকে ‘বাংলার সিংহাম` উপাধি দেওয়া হয়েছিল। বর্তমান অরাজক এ নারায়ণগঞ্জ শহরে আবারও মানুষ একজন সিংহামের অভাব অনুভব করছেন। শহরের অলিগলি, পাড়া-মহল্লায় সাটানো হয় পোস্টার, টাঙানো হয় ব্যানার। অবশ্য সিনেমার সিংহামের মতোই বাংলার সিংহাম হারুন-অর-রশিদের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রের কমতি ছিলো না। নারায়ণগঞ্জে মাত্র ১১ মাস কাজ করার এক পর্যায়ে ষড়যন্ত্রের শিকার হয়ে কর্মস্থল বদলি হয় তার। যদিও পরে পুলিশের বিভাগীয় তদন্তে নির্দোষ প্রমাণিত হন হারুন-অর-রশিদ। আর দেশ ও মানুষের সেবার নব-উদ্যমে নিযুক্ত করেন নিজেকে।
নারায়ণগঞ্জের ঘটনায় নির্দোষ প্রমাণিত হওয়ার পর এই মেধাবী ও চৌকস পুলিশ কর্মকর্তাকে পদায়িত করা হয় ডিএমপির তেজগাঁও বিভাগে। এই অঞ্চলে শিল্পাঞ্চল, সংসদ সচিবালয়, প্রধানমন্ত্রীর বাসভবন ও কার্যালয় এবং খোদ স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর নির্বাচনী এলাকা থাকায়, এখানে দায়িত্ব পালনকারী কর্মকর্তাকে সাহসী ও দক্ষ হতে হয়। বলা হয়, সেসময় তেজগাঁও অঞ্চলে পদায়ন করে মূলত এসপি হারুন-অর-রশিদের কর্মদক্ষতা আর সততার স্বীকৃতি দেয় সরকার।
করোনাকালে ঢাকা মেট্রপলিটন পুলিশের তেজগাঁও বিভাগের উপ-কমিশনার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন হারুন-অর-রশিদ। সেসময় জনসাধারণের সেবায় নানামুখী সহায়তা ও সচেতনতামূলক কর্মসূচি পালন করেন তিনি। এছাড়াও মানুষকে ধোঁকা দিয়ে ভুয়া করোনার সনদ বিক্রিতে অভিযুক্ত চিকিৎসক সাবরিনাকে গ্রেপ্তারে শক্ত ভূমিকা পালন করে প্রশংসিত হন তৎকালীন ডিসি হারুন-অর-রশিদ।
২০২১ সালের ২ মে পুলিশ সুপার থেকে অতিরিক্ত উপ-পুলিশ মহাপরিদর্শক বা অতিরিক্ত ডিআইজি হিসেবে পদোন্নতি পান হারুন-অর-রশিদ। এর পরপরই ওই বছরের ১৭ মে ডিএমপি গোয়েন্দা বিভাগ উত্তরের দায়িত্ব পান। তাকে ডিবি উত্তরের যুগ্ম-কমিশনার হিসেবে পদায়ন করা হয়। ওই পদে থাকা অবস্থায় ২০২২ সালের ১২ মে উপ-পুলিশ মহাপরিদর্শক বা ডিআইজি হিসেবে পদোন্নতি পান তিনি।
এরপর ২০২২ সালের ১৩ জুলাই ডিএমপি গোয়েন্দা শাখার প্রধান হিসেবে নিয়োগ পান হারুন-অর-রশীদ। আর ডিবি প্রধান হিসেবে হারুন দায়িত্ব পালনের মাত্র কয়েক মাসেই সাধারণ মানুষের আস্থার সংস্থায় পরিণত হয় ডিবি।