মঙ্গলবার, ০৩ মার্চ ২০২৬, ১০:০১ অপরাহ্ন

প্রশিক্ষণ ভাতার নামে পুকুরচুরি

প্রশিক্ষণ ভাতার নামে পুকুরচুরি

প্রশিক্ষণ ভাতার নামে পুকুরচুরি

মোর্শেদ মারুফ : ন্যাশনাল সার্ভিস কর্মসূচির প্রকল্পে ২৯২ কোটি টাকা পুকুরচুরির ঘটনায় ময়মনসিংহে যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের সাবেক সহকারী পরিচালক ফারজানা পারভিনসহ ৪ জনের নামে দুদকের তদন্ত চলছে। আদালতের নির্দেশে এই তদন্ত শুরু করেছে দুদক। লাগাতার ১৮ বছর ধরে একই স্থানে চাকরি করে আঙুল ফুলে কলাগাছ হওয়া এই কর্মকর্তা তার বিরুদ্ধে দুদকের তদন্ত চলাকালীন আবারও ময়মনসিংহে ফিরে আসার জোর তদবির চালাচ্ছে। এর ফলে বিষয়টির নিরপেক্ষ তদন্ত ও সঠিক তথ্য উদঘাটনে প্রতিবন্ধকতার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

সংশ্লিষ্টসূত্রে জানা গেছে, সকল বিধিমালা উপেক্ষা করে ফারজানা পারভিন দীর্ঘ দেড় যুগ ধরে ময়মনসিংহ যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক হিসেবে কর্মরত ছিলেন। পরে গেলবছর পদোন্নতি পেয়ে কিশোরগঞ্জে উপপরিচালক হিসেবে যোগ দেন। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ফারজানা পারভিন ময়মনসিংহ যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে ন্যাশনাল সার্ভিস কর্মসূচিতে ব্যাপক অনিয়ম, দুর্নীতি ও স্বেচ্ছাচারিতায় জড়িয়ে পড়েন। লুটপাট করেন কর্মসূচির কোটি কোটি টাকা।

তার পুকুরচুরির এই বিষয়টি জানাজানি হলে যুব ও ক্রিড়া মন্ত্রণালয়ের টনক নড়ে। এই ঘটনায় আদালতের নির্দেশে তদন্তে নামে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। ফারজানা পারভিনের অনিয়ম, দুর্নীতি ও স্বেচ্ছাচারিতার অনুসন্ধানে নেমে জানা যায়, সীমাহীন দুর্নীতিবাজ ও বহুল বিতর্কিত এই কর্মকর্তা লাগাতার ১৮ বছর একই স্থানে চাকরির সুবাদে টাকার পাহাড় গড়েন। লুটেপুটে খেয়েছেন সরকারের কোটি কোটি টাকা। অনুসন্ধানে জানা যায়, এই কর্মকর্তা ময়মনসিংহ জেলায় কর্মরত থাকাকালে ফুলবাড়িয়া, ত্রিশাল, গৌরিপুর ও হালুয়াঘাট উপজেলায় ন্যাশনাল সার্ভিস কর্মসূচির প্রশিক্ষণ শুরু হয়। বিগত ২০১৭-২০১৮ সালের ওই কর্মসূচিতে প্রতিদিন ৪ ঘন্টা করে মোট ২১০ দিন কাগজে-কলমে প্রশিক্ষণ অনুষ্ঠিত হয়।

সরেজমিনে জানা যায়, ময়মনসিংহ জেলা সদর থেকে ত্রিশাল, গৌরিপুর, হালুয়াঘাট ও ফুলবাড়িয়া উপজেলার দূরত্ব প্রায় ৫০ থেকে ৭০ কিলোমিটার। কর্মসূচি চলাকালে ফারজানা পারভিন একই সময়ে ওই চার উপজেলায় ২১০ দিন প্রশিক্ষণ দিয়েছেন বলে উল্লেখ রয়েছে। এই সময়টাতে তিনি ক্লাস নিয়েছেন মোট ২০০০ টি। অথচ, ওই পরিমাণ ক্লাস নিতে হলে তাকে প্রতিদিন ১০ টি করে ক্লাস নিতে হয়েছে। জানা যায়, ওই সময়টাতে প্রতি উপজেলায় ১০ টি করে ১০০ জনের একসাথে ১০ টি ব্যাচের প্রশিক্ষণ হয়েছিল। প্রতি ব্যাচ প্রশিক্ষণ সিডিউল এবং তিনি কী বিষয়ে প্রশিক্ষণ দিয়েছেন তা জেলা যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের মুভমেন্ট রেজিস্টার এবং উপজেলায় প্রতিদিনকার সম্মানিভাতা গ্রহণের রেজিস্টার এবং উপজেলার সাথে সদরের দূরত্বের কোনো সামঞ্জস্য নেই।

একইভাবে সহকারী পরিচালক, উপজেলা যুব উন্নয়ন কর্মকর্তা ও অন্যান্য সরকারী কর্মকর্তাদের নামে প্রশিক্ষণের সম্মানিভাতা তুলে ফারজানা পারভিনের নেতৃত্বে প্রশিক্ষণ না করিয়ে আত্মসাৎ করা হয়েছে। এছাড়া ভূয়া এনআইডি ব্যবহার করে প্রশিক্ষণার্থী ভর্তি, ভূয়া সংযুক্তির মাধ্যমে প্রশিক্ষণার্থীর নিকট থেকে অর্থ আদায়ও করা হয়েছে। তাছাড়া বাজেট বরাদ্দের অতিরিক্ত বা আইবাস প্লাস প্লাস অতিরিক্ত বাজেট গ্রহণ করেও অর্থ আত্মসাৎ করেছেন। এসবের মধ্যে রয়েছে, অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক আবুল বাশারের নামে ২২০টি ক্লাশ, দীর্ঘদিন ধরে প্যারালাইজ আক্রান্ত ময়মনসিংহ জেলা মৎস্য অধিদপ্তরের প্রশিক্ষক বদরুজ্জামান ফকিরের নামে প্রায় ১০০০টি ক্লাশ দেখিয়ে বিশাল অংকের টাকা আত্মসাৎ করা হয়েছে।

এছাড়া সহকারী পরিচালক মোঃ নূরুজ্জামান চৌধুরী ও মোঃ জোয়াহের আলী মিয়া ২০০০টি করে ৪০০০ ক্লাশের সম্মানিভাতা গ্রহণ করেছেন। এমনকি উপজেলা যুব উন্নয়ন কর্মকর্তারাও একেকজন ১০০০-১৩০০টি ক্লাশের সম্মানিভাতা গ্রহণ করেছেন। এভাবেই ফারজানা পারভিনের নেতৃত্বে ন্যাশনাল সার্ভিস প্রশিক্ষণ ভাতার কোটি কোটি টাকা আত্মসাৎ করা হয়েছে।

সূত্রে জানা যায়, ত্রিশাল উপজেলা নির্বাহী অফিসার তার তদন্তে ২৫২ জন প্রশিক্ষণার্থী ভূয়া থাকায় তাদের নামে বিল পরিশোধ না করে ত্রিশাল উপজেলা যুব উন্নয়ন কর্মকর্তাকে সরকারী কোষাগারে ৫২ লক্ষ টাকা জমা করার নির্দেশ দিয়েছেন। এছাড়াও হালুয়াঘাট উপজেলা যুব উন্নয়ন কর্মকর্তা মোঃ আবু জুলহাসের বিরুদ্ধে ৫৩ জন প্রশিক্ষণার্থীর নামে ভূয়া জন্ম নিবন্ধন কার্ড দিয়ে ব্যাংক হিসাব খুলে ১৩ লক্ষ ৩০ হাজার টাকা উত্তোলণের অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় তাকে পদ-অবনতি ও আত্তসাতকৃত টাকা বেতন থেকে সরকারী কোষাগারে জমা দেয়ার নির্দেশ দেন যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মোঃ আজহারুল ইসলাম খান।

তবে, তদন্ত চলাকালীন আবারও ময়মনসিংহে ফিরে আসার জোর তদবির চালানোর ফলে বিষয়টির নিরপেক্ষ তদন্ত ও সঠিক তথ্য উদঘাটনে তৈরি হয়েছে প্রতিবন্ধকতার আশঙ্কা।

শেয়ার করুন

Comments are closed.




দৈনিক প্রতিদিনের কাগজ © All rights reserved © 2025 Protidiner Kagoj |