মঙ্গলবার, ০৩ মার্চ ২০২৬, ১০:০২ অপরাহ্ন
মোঃ রহমত উল্যাহ : বিমানবন্দর নাকি সোনার খনি? তবে দেখে বিমানবন্দর মনে হলেও শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরকে এখন সোনার খনিই বলা চলে। বিমানের সিট, টয়লেট কিংবা ডাস্টবিন, যাত্রীর পকেট-শরীর, এমন কোনো জায়গা নেই যেখান থেকে সোনার চোরাচালান জব্দ হয় নি। কিছুদিন পরপর বিমানবন্দর বা সীমান্তে ধরা পড়ছে সোনার অবৈধ চালান।
বিমানবন্দরের শুল্ক গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তর। তাদের কাছ থেকে পাওয়া তথ্যে জানা গেছে, ২০১৩ থেকে ২০২২ সাল পর্যন্ত দশ বছরে সারা দেশে শুল্ক গোয়েন্দা, কাস্টম হাউস, বিজিবি ও এয়ারপোর্ট এপিবিএন অভিযান চালিয়ে ২ হাজার ৫৮৩ কেজি সোনা জব্দ করা হয়েছে। সর্বশেষ গত ২০ আগস্ট রাত ১০টার দিকে বিমানের এয়ারক্রাফট মেকানিক শফিকুল ইসলামকে বিমানবন্দরের হ্যাংগারের সামনে থেকে তার কোমরে লুকানো অবস্থায় ৬৮টি গোল্ডবারসহ আটক করা হয়। যার ওজন ৭ কেজি ৮৮৮ গ্রাম।
বাংলাদেশে ডায়মন্ড ওয়ার্ল্ডসহ হাতেগোনা কয়েকটি প্রতিষ্ঠান অল্পকিছু সোনা বৈধভাবে আমদানি করে। তারা স্বর্ণের বারগুলো দেশে পাঠানোর জন্য প্রবাসী শ্রমিকদের বাহক হিসেবে ব্যবহার করে। যেসব বাংলাদেশি স্বর্ণ বহন করেন দুবাই থেকেই তাদের ও তাদের একজন স্বজনের ফোন নম্বর, পাসপোর্টের কপি, বর্তমান ও স্থায়ী ঠিকানা, এনআইডির ফটোকপি রেখে দেওয়া হয়। প্রবাসীরা প্লেন থেকে নেমে কাস্টম কাউন্টারে ট্যাক্স দিয়ে রসিদ নেন।
পরে বাংলাদেশি ডিলারের প্রতিনিধি বিমানবন্দরের আশপাশের এলাকা থেকে রশিদসহ স্বর্ণ বুঝে নেন।
বাংলাদেশ কাস্টম হাউসের ব্যাগেজ রুল (সংশোধিত ২০২৩-২৪) অনুযায়ী, একজন ব্যক্তি বিদেশ থেকে সর্বোচ্চ ১১৭ গ্রাম পর্যন্ত স্বর্ণের বার আনতে পারবেন। সাধারণত একটি স্বর্ণের বার ১০০ গ্রাম কিংবা একটু বেশি হয়ে থাকে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৯-এর শুরু থেকে ২০২২ সাল পর্যন্ত দেশে সোনা আমদানি হয়েছে মাত্র ১৪৮ কেজির মতো। অথচ বাংলাদেশ জুয়েলারি সমিতির (বাজুস) হিসাব অনুযায়ী, দেশে বছরে সোনার চাহিদা প্রায় ২০ থেকে ৩০ টন।
এদিকে বাংলাদেশি ব্যবসায়ীদের বেশিরভাগ বৈধ উপায়ে সোনা আমদানিতে অনাগ্রহী। ব্যবসায়ীদের মন্তব্য, একজন ব্যবসায়ীকে বৈধভাবে সোনা আনতে হলে এলসি খুলতে হয়। এরপর সোনার ক্রয়মূল্য, আমদানি শুল্ক, ইন্স্যুরেন্স ফি, ফ্রেইট চার্জ, এলসির কমিশনসহ সবমিলিয়ে একটি বার (১০০ গ্রাম ওজন) আনলে ৫০ হাজার টাকার মতো খরচ হয়। কিন্তু ব্যাগেজ রুলসের আওতায় প্রতি ভরি সোনা আনার খরচ ৪ হাজার টাকা। পাশাপাশি ১০০ গ্রাম ওজনের স্বর্ণালংকার আনতে কোনো শুল্ক লাগে না।
এ কারণে ব্যাগেজ রুলে স্বর্ণ আনতে আগ্রহী ব্যবসায়ীরা।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা বলছে, দেশে যারা বৈধভাবে কর দিয়ে সোনা আমদানি করে তারাই আবার লুকিয়ে অতিরিক্ত বার নিয়ে আসে। পরিস্থিতি অনুকূলে না থাকলে বা ধরা পড়ার আশঙ্কা থাকলে তারা বিমানবন্দরে সোনা ফেলে রেখে চলে যায়।
বিমানবন্দর থানার সাবেক এসআই খোরশেদ আলম সাগর বলেন, অধিকাংশ মামলায় চোরাচালানের মূলহোতাকে পাওয়া যায় না। কিছু আসামি পেয়েছি যারা চোরাচালানের সঙ্গে নিয়মিতভাবে জড়িত ছিল। তারা জানিয়েছে, ব্যবসায়ীরা সোনার বার আনার জন্য প্রতি ফ্লাইটে কমপক্ষে ১৫-২০ জন প্রবাসীকে টার্গেট করে সোনার বার দিতো। যে ফ্লাইটে ১৫ জনকে টার্গেট করে সোনা দেওয়া হতো, সেখানে ১২ জনকে ২টি করে বার (যখন দুটি বার আনা বৈধ ছিল) এবং করের টাকা দেওয়া হতো।
বাকি কয়েকজনের একেকজনের কাছে ৮-১০টি বা ১২টি করে বার দেওয়া হয়। ওইসব যাত্রী দেশে নেমে কাস্টম কাউন্টারে গিয়ে ট্যাক্স জমা দিয়ে ২টি বার বৈধ করায়। বাকিগুলো শরীরে বা মালপত্রের সঙ্গে গোপন করে নিয়ে যায়। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই ট্যাক্স দেওয়ার পর তাদের আর তল্লাশি করা হয় না। তারা সাধারণ যাত্রীদের মতো গ্রিন চ্যানেল হয়ে বেরিয়ে যায় এবং এজেন্টের কাছে সোনা পৌঁছে দেয়।
অবৈধভাবে আসা এই সোনার অর্ধেক স্বর্ণ ব্যবসায়ীদের কাছ যায়। বাকি অর্ধেক চলে যায় ভারতে। বিশ্বে স্বর্ণের দ্বিতীয় বৃহত্তম ভোক্তা দেশ ভারত। দেশটি প্রতি বছর বৈধ পথেই প্রায় ৭০০ টন সোনা আমদানি করে। দুবাই থেকে আনতে ভারতের যে খরচ তার চেয়ে অনেক কমে বাংলাদেশ থেকে স্বর্ণ কিনতে পারে তারা। দুবাই থেকে ভারতে সোনা আমদানি করতে শুল্ক, ইনস্যুরেন্স, ভাড়া ও করসহ প্রতি ভরিতে খরচ হয় প্রায় ৭ হাজার টাকা।
বাংলাদেশে ব্যাগেজ রুলের আওতায় সোনা আনলে ভরিপ্রতি কর মাত্র ৪ হাজার টাকা এবং আনুষঙ্গিক খরচ ভরিতে সর্বোচ্চ ৮০০ থেকে এক হাজার টাকা। এ কারণে বাংলাদেশি যাত্রী ও ব্যবসায়ীদের ব্যবহার করে স্বর্ণ কিনতে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করে ভারতীয়রা।
বিজিবির হিসাব অনুযায়ী, সীমান্তে গত চার বছরে প্রায় ৪০০ কেজি সোনা উদ্ধার করা হয়েছে। এসব ঘটনায় ১৯০ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। বিজিবির পরিচালক (অপারেশন) লে. কর্নেল এ এম জাহিদ পারভেজ বলেন, কোনো আসামি গ্রেপ্তার হলে চক্রের অন্য সদস্যরা গা ঢাকা দেয়। কিছুদিন পর নতুন কৌশলে আবারও একই কাজ শুরু করে তারা।
সীমান্ত ও বিমানবন্দর দিয়ে চোরাচালান বন্ধে বাংলাদেশের সক্ষমতা কতটুকু জানতে চাইলে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের নির্বাহী পরিচালক গ্রুপ ক্যাপ্টেন কামরুল ইসলাম বলেন, ‘বিমানবন্দরে চোরাচালান বন্ধে কাস্টম হাউস, কাস্টম ইন্টেলিজেন্স, সরকারি গোয়েন্দা সংস্থা, এভিয়েশন সিকিউরিটি (এভসেক), এপিবিএনসহ ২৪টি সরকারি সংস্থা একসঙ্গে কাজ করছে। যাত্রীদের স্ক্রিনিংয়ের জন্য মেটাল ডিটেক্টর, হ্যান্ড-হেল্ড মেটাল ডিটেক্টর, আর্চওয়ে, বডি স্ক্যানার মেশিন রয়েছে। সোনা উদ্ধারের ফলে একদিকে যেমন চোরাচালান কমছে, অন্যদিকে সরকারের রাজস্ব বৃদ্ধিতেও ইতিবাচক প্রভাব পড়ছে।’
সীমান্তের সক্ষমতা নিয়ে বিজিবির পরিচালক (অপারেশন) লে. কর্নেল এ এম জাহিদ পারভেজ বলেন, একটি আধুনিক বাহিনী হিসেবে বিজিবি হেলিকপ্টার, স্পিডবোট, টহলের জন্য অত্যাধুনিক বাহন, ডগ স্কোয়াড, সার্ভেইলেন্স সরঞ্জামসহ অন্যান্য অনেক অত্যাধুনিক সরঞ্জামাদি ব্যবহার করে। গোয়েন্দা কার্যক্রম ও আধুনিক সরঞ্জামাদি ব্যবহারের মাধ্যমে স্বর্ণ চোরাচালান প্রতিরোধে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে বিজিবি।