বুধবার, ০৪ মার্চ ২০২৬, ০১:৩০ পূর্বাহ্ন
বিশেষ প্রতিনিধি : সারাদেশে ২০৭ টি উপজেলায় যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের ন্যাশনাল সার্ভিস কর্মসূচি প্রকল্পের আওতায় বেকার যুবকদের প্রশিক্ষণ হয়েছে। এরমধ্যে শুধু ময়মনসিংহের ১০ উপজেলাতেই ২৯২ কোটি টাকা হরিলুট হয়েছে, যা নিয়ে দুদকের অনুসন্ধান চলছে। প্রতিদিনের কাগজ অনুসন্ধানে জানতে পারে, ময়মনসিংহের মত সারাদেশে এমন হরিলুট হয়েছে। এর মধ্যে সিলেটে প্রকল্প না থাকলেও ১৪ কোটি টাকা উত্তোলন করা হয়েছে, যা দুদকের অনুসন্ধানে প্রমাণিত হয়েছে। জামালপুরে এক উপজেলার লোক আরেক উপজেলায় প্রশিক্ষণ করিয়ে ৮০ কোটি টাকা লোপাট করেছে। প্রকল্পের কর্মকর্তারা দুর্নীতির টাকায় দেশে-বিদেশে, যেমন-যুক্তরাষ্ট্র, কানাডার মত উন্নত দেশে নিজের এবং আত্মীয়-স্বজনের নামে সম্পদের পাহাড় গড়ে তুলেছে।
এই দুর্নীতি ও হরিলুটের পিছনে যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের উপসচিব কৃষিবিদ ডাঃ জহিরুল ইসলাম ও যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের পরিচালক মফিজুল ইসলামের হাত রয়েছে বলে জানা গেছে। অধিদপ্তরের কোনো দুর্নীতির তদন্ত করার দায়িত্ব দিলে পরিচালক মফিজুল ইসলাম সঠিকভাবে তদন্ত না করে দুর্নীতিগ্রস্তদের পক্ষে প্রতিবেদন দেন। যেখানে এই প্রকল্প শুরু হয়, সেখানেই এই দুই কর্মকর্তা তাদের পছন্দের ব্যক্তিদের পদায়নে সহায়তা করে। ইতিমধ্যে তার বিষয়ে বিভিন্ন গণমাধ্যমে সংবাদ প্রকাশ হয়েছে। এছাড়াও এ বিষয়ে অভিযোগের ভিত্তিতে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) এর উপসহকারী পরিচালক আফিয়া খাতুনকে প্রধান করে অভিযোগের অনুসন্ধান করতে একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। পরে গত ৭ সেপ্টেম্বর ২০২৩ই তারিখে দুর্নীতি দমন কমিশনের উপসহকারী পরিচালক আফিয়া খাতুন অভিযোগের তদন্তের জন্য প্রয়োজনীয় নথিপত্র তলব করে যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের মহাপরিচালক বরাবর এক পত্র পাঠায়।

ময়মনসিংহয়ে এই প্রকল্পের আওতায় বেকার যুবকদের প্রশিক্ষণের নামে কোটি কোটি টাকা আত্মসাৎ এবং সরকারকে প্রায় কোটি টাকা রেভিনিউ স্টাম্প ফাঁকি দেওয়ার মামলায় দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক), ময়মনসিংহ তদন্ত করছে। দুর্নীতি দমন কমিশনের চাহিদা অনুযায়ী তথ্য সরবরাহ করায় ময়মনসিংহ কার্যালয়ের অভিযুক্ত কর্মকর্তারা বাঁচার জন্য অভিযুক্ত প্রধান আসামী ফারজানা পারভীনকে (উপপরিচালক, যুব উন্নয়ন অধিদপ্তর, কিশোরগঞ্জ) ময়মনসিংহ জেলায় পদায়নের চেষ্টা করে এবং তার স্বামী কৃষিবিদ সহকারি লাইব্রেরিয়ান, ময়মনসিংহ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় এবং তাদের ভালুকা ময়মনসিংহ এলাকার উপসচিব কৃষিবিদ ডাঃ জহিরুল ইসলামের সহযোগিতায় ৫০ লক্ষ টাকার বিনিময়ে ফারজানা পারভীনসহ অন্যান্য অভিযুক্ত আসামীদের রক্ষা করার চুক্তি করেন, যা অনুসন্ধানে উঠে আসে।
পরবর্তীতে জামাতপন্থী পরিচালক মফিজুল ইসলাম যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরে বিভিন্ন কর্মকর্তাদের বিভিন্ন পদে পদোন্নতি করিয়ে দেওয়ার জন্য তাদের কাছ থেকে লক্ষ লক্ষ টাকা ঘুষ নেন বলেও অভিযোগ আছে।
উপসচিব ডাঃ জহিরুল ইসলামের পরামর্শক্রমে ময়মনসিংহের যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের তৎকালীন উপপরিচালক ফারজানা পারভীনসহ দুদকে অনুসন্ধান চলছে এমন ৭ কর্মকর্তাকে অভিযোগ থেকে রক্ষা করতে বিভিন্ন কুটকৌশল অবলম্বন করতে থাকেন জামাতপন্থী পরিচালক মফিজুল ইসলাম। কিন্তু বিজ্ঞ আদালতের নির্দেশে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) ফারজানা পারভীন গংদের বিরুদ্ধে অনুসন্ধানে নামে এবং ময়মনসিংহের উপপরিচালক রোকন উদ্দিন ভূইয়া দুদকের চাহিদা অনুযায়ী তথ্য প্রেরণ করায় রোকন উদ্দিন ভূইয়াকে ফারজানা পারভিন সিন্ডিকেট বদলী করান জামালপুরে।

ভবিষ্যতে দুদকে সঠিক তথ্য সরবরাহ না করার চুক্তিতে উপসচিব ডাঃ জহিরুল ইসলাম হারুন অর রশীদকে ময়মনসিংহে পদায়ন করান এবং জোরপূর্বক ময়মনসিংহ অফিসে সন্ত্রাসীদের সহযোগীতায় তালা দেন এবং দুদকের অভিযুক্ত কর্মকর্তাদের গুরুত্বপূর্ণ কাগজপত্র গায়েব করে দেন, যা পত্রপত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে। এই পর্যায়ে হারুন অর রশীদের বর্তমান কর্মস্থলে যোগদান ও পূর্ববর্তী কর্মস্থল হতে ছাড়পত্র ব্যতীতই কাজ করার চেষ্টা করছেন এবং উপসচিব ডাঃ জহিরুল ইসলামের পরামর্শে রোকন উদ্দীনকে প্রশাসনিকভাবে হয়রানী করার জন্য হারুন অর রশীদের মাধ্যমে কেন বদলীকৃত কর্মস্থলে যোগদান করছেন না এবং কেন সহকারী উপজেলা যুব উন্নয়ন কর্মকর্তাকে বদলী করেছেন এ বিষয়ে অভিযোগ দিয়ে তদন্ত কমিটি গঠন করেন। সেই কমিটির তদন্ত কর্মকর্তা হিসেবে নিয়োগ দেন দুদকে অভিযুক্ত কর্মকর্তা মফিজুল ইসলামকে। তদন্ত কর্মকর্তা মফিজুল ইসলাম গতকাল ১৪ সেপ্টেম্বর ময়মনসিংহে তদন্তে যান। কিন্তু কাগজপত্রে অন্য কর্মকর্তাদের নাম না থাকলেও তদন্ত শেষে ময়মনসিংহের ২৯২ কোটি টাকার দুর্নীতির অভিযোগে অভিযুক্তদের নিয়ে ডিডি অফিসে গোপন বৈঠক করেন।
অভিযোগ রয়েছে, উপসচিব ডাঃ জহিরুল ইসলাম ময়মনসিংহ এলাকায় যুব প্রশিক্ষণ কেন্দ্রের প্রতিটি পিসি, ডিপিসি, সিনিয়র প্রশিক্ষক, উপজেলা যুব উন্নয়ন কর্মকর্তাগণের বদলী/সংযুক্ত করার জন্য লক্ষ লক্ষ টাকা ঘুষ গ্রহণ করছেন। ভুক্তভোগীদের পরিবারের সদস্যদের (স্বামী/স্ত্রীদের) সাথে কথা বলে এসব তথ্য নিশ্চিত হওয়া গেছে। এভাবে উপসচিব ডাঃ জহিরুল ইসলাম কর্তৃপক্ষের নাম করে সারাদেশে এককভাবে বদলী বাণিজ্য চালিয়ে যাচ্ছেন|
এ বিষয়ে খায়রুল আলম রফিক নামের এক ব্যক্তি জানান, সরকারের শত শত কোটি টাকা দুর্নীতি করে বিদেশে টাকা পাচার করেছে। আমি ৭ জনকে অভিযুক্ত করে ময়মনসিংহের বিজ্ঞ জেলা ও দায়রা জজ আদালতে একটি মামলা দায়ের করি। মামলাটি দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) ময়মনসিংহ জেলা শাখা তদন্ত করছে। ৭ কর্মকর্তাসহ পরিচালক মফিজুল ইসলাম ও উপসচিব ডাঃ জহিরুল ইসলামের নাম উল্লেখ করে আরো ৫ জনের নামে দুদকের চেয়ারম্যান বরাবর আরেকটি অভিযোগ দায়ের করি এবং উচ্চ আদালতে একটি রিট পিটিশন দাখিল করার প্রস্তুতি নিচ্ছি।
এ বিষয়ে যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের পরিচালক মফিজুল ইসলামের কাছে জানতে চাইলে তিনি এ বিষয়ে কোনো কথা বলতে রাজি হননি।
যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের উপসচিব কৃষিবিদ ডাঃ জহিরুল ইসলামের কাছে এ বিষয়ে জানতে তাকে একাধিকবার ফোন করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি।
আগামী পর্বে চোখ রাখুন।