বুধবার, ০৪ মার্চ ২০২৬, ০৩:২২ পূর্বাহ্ন

যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের প্রকল্পে ৪৩ কোটি টাকা আত্মসাৎ

যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের প্রকল্পে ৪৩ কোটি টাকা আত্মসাৎ

উন্নয়ন

জাহাঙ্গীর আলম তপু: যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের অধীনে ন্যাশনাল সার্ভিস কর্মসূচির কার্যক্রম নেই এবং সরকারিভাবে অর্থ বরাদ্দও হয়নি এমন একটি উপজেলা কার্যালয়ের নামে ২০২১-২২ অর্থবছরে ২ কোটি ৪৩ লাখ ৯০ হাজার টাকা বরাদ্দ দেখিয়ে সেই অর্থের পুরোটাই সংশ্লিষ্ট একটি চক্র ভাগ-বাটোয়ারা করে নিয়ে খেয়ে ফেলেছে। যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের সিলেটের জকিগঞ্জ উপজেলা কার্যালয়ে এমনটি ঘটেছে। এর সঙ্গে জড়িত রয়েছেন একজন উপজেলা কর্মকর্তাসহ উপরের মহলের সংশ্লিষ্ট একটি প্রভাবশালী চক্র।

গত বছরের সেপ্টেম্বরের দিকে পুকুরচুরির এই ঘটনা ফাঁস হয়। এর পরপরই যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয় এ ব্যাপারে একটি তদন্ত কমিটি গঠন করে। যদিও তদন্ত কমিটিকে প্রতিবেদন জমা দেয়ার জন্য মাত্র ৭ কর্মদিবস সময় দেয়া হয়েছিল। কিন্তু কমিটির সদস্যরা কাগজপত্র এবং সরেজমিনে খতিয়ে দেখতে গিয়ে একই উপজেলায় আরো বড় রকমের অর্থ আত্মসাতের খোঁজ পান। ওই উপজেলায় মোট আত্মসাতকৃত অর্থের পরিমাণ ১৬ কোটি ১৬ লাখ টাকা।

কিন্তু এখানেই শেষ নয়, সেই তদন্ত কমিটি তাদের তদন্ত প্রতিবেদনে ন্যাশনাল সার্ভিস প্রকল্পে আরো বড় অনিয়ম-দুর্নীতি ও অর্থ আত্মসাতের আশংকা করে। এ ব্যাপারে আরো বৃহত্তর তদন্তের সুপারিশ করে ওই তদন্ত কমিটি। যার পরিপ্রেক্ষিতে যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের একজন অতিরিক্ত সচিবের নেতৃত্বে নতুন করে তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। অতিরিক্ত সচিব মো. মোস্তফা কামাল মজুমদারের নেতৃত্ব গঠিত এই কমিটিকে ন্যাশনাল সাভির্স প্রকল্পের সকল অনিয়ম তদন্তের দায়িত্ব দেয়া হয়।

আরও পড়ুন: প্রকৌশলী হারুনুর রশীদ মোল্লাহ্ নেতৃত্বে এগিয়ে যাচ্ছে তিতাস

নির্ভরযোগ্য সূত্রে জানা গেছে, ইতিমধ্যে আরো দুটি উপজলায় ন্যাশনাল সার্ভিস প্রকল্পের যথাক্রমে ২২ কোটি ১৪ লাখ টাকা এবং ৫ কোটি টাকা আত্মসাতের ঘটনা উদঘাটিত হয়েছে। অর্থাৎ তিনটি উপজেলায় সব মিলিয়ে অর্থ আত্মসাতের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় সাড়ে ৪৩ কোটি টাকা। সংশ্লিষ্টরা বলছে, যথাযথভাবে তদন্ত করা হলে অর্থ আত্মসাতের পরিমাণ একশ’ কোটি টাকা ছাড়িয়ে যাবে।

সূত্র জানায়, রংপুর জেলার গঙ্গাচড়া উপজেলায় যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের ন্যাশনাল সার্ভিস কর্মসূচীর আওতায় উপকার ভোগীর সংখ্যা ৩০৪৭ জন। প্রত্যেক উপকারভোগী প্রতি মাসে ৬০০০/- টাকা করে ২৪ মাসে কর্মভাতা পাবে ১,৪৪,০০০/ টাকা। ৩০৪৭ জন ২৪ মাসে বা ২ বছরে সর্বমোট ৪৩,৪৭,৮০,০০০/- (তেতাল্লিশ কোটি সাতাশি লাখ আশি হাজার) টাকা। কিন্তু উত্তোলন করা হয়েছে ৬৬,০১,৮১,৬০০/- (ছেষট্রি কোটি এক লাখ একাশি হাজার ছয় শত) টাকা। এক্ষেত্রে আত্মসাৎ করেছে ২২,১৪,১৩,৮০০/- (বাইশ কোটি চৌদ্দ লাখ তের হাজার আট শত) টাকা।

প্রধান কার্যালয়ের সাবেক উপপরিচালক (বর্তমানে বরগুনায় পদায়নকৃত) আলী আশরাফ গুলশান ইউনিট থানার উপজেলা যুব উন্নয়ন কর্মকর্তা আবুল কালাম আজাদ হার্ডকপি এবং আইবাসে এ বরাদ্দ দিয়েছেন এবং গঙ্গাচড়া উপজেলার সাবেক উপজেলা যুব উন্নয়ন কর্মকর্তা এনামুল হকের মাধ্যমে টাকা উত্তোলন করে তিন জনে এই ২২ কোটি টাকা ভাগাভাগি করে আত্মসাৎ করেন। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, উপপরিচালক আলী আশরাফ ও আবুল কালাম আজাদ এবং তাদের একাধিক স্ত্রীদের নামে-বেনামে ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ, কুমিল্লায় বাড়ি, ফ্ল্যাট, গাড়ির শো-রুমসহ অগাধ সম্পদের মালিক হয়েছেন।

ইতিমধ্যে জকিগঞ্জ উপজেলার আত্মসাতের জন্য দুদকে তদন্ত চলছে। কিন্ত চক্রটি এতটা ক্ষমতাধর, কাউকেই তোয়াক্কা না করে বহাল তবিয়তে আছেন। যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের সাধারণ কর্মকর্তা-কর্মচারীরা এসব দুর্নীতিবাজের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি করেছেন। জানা পেছে, জকিগঞ্জে অর্থ আত্মসাতের ঘটনা তদন্তে প্রমাণিত হওয়ার পর উপপরিচালক আলী আশরাফসহ অন্যদের ঢাকার বাইরে শাস্তিমূলক বদলি করা হয়েছিল। কিন্তু দীর্ঘদিনেও আলী আশরাফ তার বদলীকৃত স্থান বরগুনায় যাননি। তিনি সেখানে যোগদানপত্র জমা দিয়ে মন্ত্রণালয় এবং অধিদপ্তরে ঘোরাঘুরি করছেন। সিলেটের জকিগঞ্জে ন্যাশনাল সার্ভিস কর্মসূচির নামে যে আর্থ আত্মসাত হয়েছে এরসঙ্গে জড়িত রয়েছেন আবুল কালাম আজাদ, যিনি বর্তমানে যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের গুলশান ইউনিটে উপজেলা যুব উন্নয়ন কর্মকর্তা পদে কর্মরত আছেন।

অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মো. আজহারুল ইসলাম খানের স্বাক্ষরে গত ২ এপ্রিল তার বিরুদ্ধে এ বিষয়ে বিভাগীয় মামলা চালু করা হয়। বিভাগীয় মামলায় আনীত অভিযোগনামার শেষ প্যারায় বলা হয়, “সেহেতু, এক্ষণে আপনার উপরোক্ত আচরণ ও কার্যকলাপের জন্য আপনাকে সরকারি কর্মচারী (শৃঙ্খলা ও আপিল বিধিমালা ২০১৮ এর ৩(খ) ও ৩(ঘ)) বিধি অনুযায়ী অসদাচরণ ও দুর্নীতির দায়ে অভিযুক্ত করে একই বিধিমালার ৪(৩)(ঘ) বিধি অনুযায়ী আপনাকে কেন চাকরি থেকে বরখাস্ত (উরংসরংংধষ ভৎড়স ঝবৎারপব) করা হবে না অথবা উক্ত বিধিমালার বিধানমতে অন্য কোনো উপযুক্ত শাস্তি বা দণ্ড প্রদান করা হবে না তা এ বিধিমালার ৭(খ) মোতাবেক ১০ কার্যদিবসের মধ্যে নিম্নস্বাক্ষরকারীর নিকট লিখিতভাবে জানানোর জন্য নির্দেশ প্রদান করা হলো।”

অবাক ব্যাপার হলো, আবুল কালাম আজাদকে ২ এপ্রিল ২০২৩ চাকরিচ্যুতির নোটিশ করা হলেও এর পরদিন ৩ এপ্রিল ২০২৩ তারিখে আবার ১০ম গ্রেড থেকে ৯ম গ্রেডে পদোন্নতিও দেয়া হয়। এই পদোন্নতির আদেশ জারি করে মন্ত্রণালয়। যা নিয়ে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনা চলছে। কিন্ত অধিদপ্তর বা মন্ত্রণালয় তার বিরুদ্ধে আর নতুন কোনো পদক্ষপ নেয়নি। এমনকি আবুল কালাম আজাদ এখন পর্যন্ত রাজধানীতে প্রাইজ পোস্টিংয়েই বহাল-তবিয়তে রয়েছেন।

এদিকে ময়মনসিংহ যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের ২৯২ কোটি টাকার তদন্তে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) ময়মনসিংহ জেলা শাখা তদন্ত করছে। অভিযোগ রয়েছে ময়মনসিংহ যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের সাবেক ডিডি ফারজানা পারভিন সহ ১০ কর্মকর্তা উক্ত টাকা আত্মসাতের ঘটনার সাথে জড়িত।

 

প্রতিদিনের কাগজ

শেয়ার করুন

Comments are closed.




দৈনিক প্রতিদিনের কাগজ © All rights reserved © 2025 Protidiner Kagoj |