মঙ্গলবার, ০৩ মার্চ ২০২৬, ০২:৩১ অপরাহ্ন
মোস্তাফা কামাল, চবি : চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের (চবি) উপাচার্যের বাসভবন ও পরিবহন দপ্তরের গাড়ি ভাঙচুরের ঘটনায় হাটহাজারী থানায় দুটি মামলা করা হয়েছে। মামলায় সাতজন করে ১৪ জনের নাম উল্লেখসহ অজ্ঞাতপরিচয় আরও ১ হাজার জনকে আসামি করা হয়েছে। আসামিরা সবাই বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রলীগের বিভিন্ন গ্রুপের সক্রিয় সদস্য। তবে অধিকাংশই সিক্সটি নাইন গ্রুপের অনুসারী এবং কিছু সিএফসি গ্রুপের অনুসারী। মামলা দুটির এজাহার বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, ১৪ জন আসামির অন্তত ১২ জন শাখা ছাত্রলীগের বিভিন্ন উপগ্রুপের নেতা–কর্মী।
তাঁদের মধ্যে সিএফসি গ্রুপের ৫ জন, সিক্সটি নাইন গ্রুপের ৬ জন ও বিজয় গ্রুপের ১ জন অনুসারী রয়েছেন বলে ছাত্রলীগ সূত্রে নিশ্চিত হওয়া গেছে। এ ছাড়া মামলার এজাহারে চাঁদা দাবি করে না পেয়ে এমন ঘটনা ঘটানো হয়েছে বলে অভিযোগ করা হয়েছে।এর আগে গত শনিবার রাতে উপাচার্যের বাসভবনে ভাঙচুরের ঘটনায় বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান নিরাপত্তা কর্মকর্তা (ভারপ্রাপ্ত) শেখ মো. আব্দুর রাজ্জাক বাদী হয়ে একটি মামলা ও পরিবহন দপ্তরে ভাঙচুরের ঘটনায় বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রার (ভারপ্রাপ্ত) কেএমনুর আহমদ বাদী হয়ে আরেকটি মামলা করেন।
মামলার বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন চট্টগ্রামের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার আবু তৈয়ব মো. আরিফ হেসেন। মামলার এজাহার অনুযায়ী উপাচার্যের বাসভবনে ভাঙচুরের মামলার আসামিরা হলেন ব্যাংকিং অ্যান্ড ইন্সুইরেন্স বিভাগের ২০১৯-২০ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী শাকিল হোসেন আইমুন, সংস্কৃত বিভাগের ২০১৮-১৯ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী দীপন বণিক দীপ্ত, শিক্ষা ও গবেষণা বিভাগের ২০১৯-২০ শিক্ষাবর্ষের রিয়াদ হাসান রাব্বি, ইংরেজি বিভাগের ২০২০-২১ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী নুর মোহাম্মদ মান্না, ইতিহাস বিভাগের ২০১৮-১৯ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী সৌরভ ভূইয়া, পালি বিভাগের ২০১৮-১৯ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী আমিনুল ইসলাম ও পদার্থবিদ্যা বিভাগের ২০১৫-১৬ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী শফিকুল ইসলাম।
পরিবহন দপ্তরে ভাঙচুর মামলার আসামিরা হলেন দর্শন বিভাগের ২০১৫-১৬ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী সাজ্জাদ হোসেন, পরিসংখ্যান বিভাগের ২০১৭-১৮ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী মো. ইমরান নাজির ইমন, ফারসি ভাষা ও সাহিত্যের ২০১৮-১৯ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী আনিসুর রহমান, ইতিহাস বিভাগের ২০১৮-১৯ বিভাগের শিক্ষার্থী নাসির উদ্দিন মো. সিফাত উল্লাহ, সংস্কৃত বিভাগের ২০১৮-১৯ বিভাগের অনিক দাশ, বাংলা বিভাগের ২০১৮-১৯ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী অনিরুদ্ধ বিশ্বাস এবং একই বিভাগ ও শিক্ষাবর্ষের আজিমুজ্জামান।
অতিরিক্ত পুলিশ সুপার আবু তৈয়ব মোহাম্মদ আরিফ হোসেন বলেন, চবির ঘটনায় বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের পক্ষে হাটহাজারী থানায় অদ্য দুটি এজাহার দায়ের করেছেন। চাঁদা দাবি ও ভাঙচুরের ঘটনায় মামলাগুলি দায়ের করা হয়েছে। দুটি মামলা হয়েছে, প্রতিটিতে সাতজন করে নাম উল্লেখ করে অজ্ঞাত ৪০০ থেকে ৫০০ আসামি করা হয়েছে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে শাখা ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক ও সিক্সটি নাইন গ্রুপের নেতা ইকবাল হোসেন টিপু বলেন, ‘আমাকে অনেকে জানিয়েছে, তারা আন্দোলনে ছিল, আন্দোলন থামিয়েছে, তাদেরও আসামি করা হয়েছে। আবার অনেকে অপরাধ করেছে, কিন্তু তাদের আসামি করা হয় নাই। এটা প্রশাসনের একটা গ্যাম্বলিংয়ের (পাশা খেলা) অংশ। অনেকে মাস্ক পরে হামলা করেছে। তাদের খুঁজে বের করা হয়নি।
এটা অন্য মতাদর্শের কাউকে ছাড় দেওয়ার জন্য করা হয়েছে কি না তাও খতিয়ে দেখা হচ্ছে। শাখা ছাত্রলীগের সভাপতি রেজাউল হক রুবেল বলেন, ‘যারা ভাঙচুর করেছে, ভিডিও ফুটেজ দেখে তাদের বিরুদ্ধে মামলা হবে। উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে নিরপরাধ কাউকে ভিকটিম করা হলে শিক্ষার্থীরা মেনে নিবে না। মামলার বিষয়ে জানতে চাইলে হাটহাজারী মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. মনিরুজ্জামান বলেন, ‘এখনো পর্যন্ত কোনো আসামি গ্রেপ্তার হয়নি। মামলার অন্যান্য কার্যক্রম চলছে।’
এদিকে প্রক্টর ড.নূরুল আজিম সিকদার বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের বাসভবন, পরিবহন দপ্তর ও শিক্ষক ক্লাবে যারা হামলা করেছে আমি মনে তারা কোনো সাধারণ শিক্ষার্থী নয়। নিশ্চয়ই তারা কোনো না কোনো ইন্ধনে এগুলো করেছে। আমি মনে করি দেশকে অস্থিতিশীল করা, বিশ্ববিদ্যালয়কে অস্থিতিশীল করা, জাতীয় নির্বাচনকে ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করা এ ঘটনার পেছনের মূল কারণ।
এর আগে গত বৃহস্পতিবার রাতে শহর থেকে বিশ্ববিদ্যালয়গামী রাত সাড়ে ৮টার শাটল ট্রেনের ছাদে হেলে পড়া গাছের সঙ্গে ধাক্কায় ২০ জন শিক্ষার্থী আহত হন। শিক্ষার্থীদের আহত হওয়ার খবর ছড়িয়ে পড়লে রাত সাড়ে ১০টার দিকে শাটল ট্রেন ক্যাম্পাসে পৌঁছানোর পর শিক্ষার্থীরা ফটক আটকে বিক্ষোভ শুরু করেন।
এ সময় শিক্ষার্থীদের বেশ কিছু চেয়ার ও পুলিশ বক্সে ভাঙচুর চালাতে দেখা যায়। পরে একজনের মৃত্যুর গুজব ছড়িয়ে পড়লে শিক্ষার্থীরা মিছিল নিয়ে উপাচার্যের বাসভবনের দিকে যান। একপর্যায়ে উপাচার্যের তিনতলা বাসভবনে ভাঙচুর শুরু করেন। ফুলের টব থেকে শুরু করে বিভিন্ন আসবাব, কক্ষ, জানালা ভেঙে ফেলেন বিক্ষুব্ধ শিক্ষার্থীরা। আসবাব বের করে উঠানে জ্বালিয়ে দেওয়ার ঘটনাও ঘটে।
উপাচার্যের বাসভবন ভাঙচুর করার পরপরই বিক্ষুব্ধ শিক্ষার্থীরা পরিবহন দপ্তরে মিছিল নিয়ে যান। সেখানে শিক্ষক, কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের যাতায়াতের জন্য রাখা অন্তত ৭০টি বাস ভাঙচুর করেন। পরে শিক্ষার্থীরা শিক্ষক ক্লাবের কয়েকটি কক্ষ ভাঙচুর করেন।