বুধবার, ০৪ মার্চ ২০২৬, ০৬:৫৯ পূর্বাহ্ন
খায়রুল আলম রফিক :ময়মনসিংহ নগরীর পুরোহিত পাড়া । গতকাল মঙ্গলবার দুপুরে রাস্তার পাশের একটি গলির মুখে আধা ঘণ্টা দাঁড়িয়ে থাকার পর মধ্যবয়সী এক নারী পাশে এসে দাঁড়ান। ক্ষীণ স্বরে বলেন, ‘বাবা’ লাগবে? সবুজ গোলাপি লাল সব আছে। ময়মনসিংহে এখন সব ধরনের বাবা পাবেন। তবে আমার কাছে কম পাবেন।
মাত্র ৩০০ টাকা লাগবে। অন্য জায়গায় কিনলে ৩৫০ টাকা লাগবে। নিলে তারাতারি করতে হবে, বেশিক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকতে পারবেন না জানিয়ে দেন ওই নারী। সাংবাদিক পরিচয় দেওয়ার পর তিনি বলেন, এখানে দাঁড়িয়ে কাজ কী, ময়মনসিংহ শহরে ৮২টি স্থানে তো ‘বাবা’র ছড়াছড়ি।
সেখানে যান। আপনার মত অনেক সাংবাদিক প্রতিদিন ২০০ টাকা নিয়ে যায়। চাইলে আপনিও নিতে পারেন। আর যদি নিউজ করেন তাহলে এক টাকাও পাবেন না। আমাদের সব জায়গায় মাসোয়ারা আছে। অভিযান করার সময় আগেই আমরা তথ্য পেয়ে যাই। এ কারণে বললাম আপনি চলে যান নিউজ করার প্রয়োজন নাই। নাম্বার দিয়ে যান বিকাশে টাকা দিয়ে দিবো। এভাবেই প্রতিবেদক (সাংবাদিক) কে বললেন এই নারী মাদক ব্যবসায়ী।
ঝামেলা এড়াতে মাদক ব্যবসায়ীরা ইয়াবা বড়িকে এখন ময়মনসিংহ শহরে ‘বাবা’ নামে বিক্রি করেন। শহরের অন্তত ৮২ টি স্থানে প্রকাশ্যেই বিক্রি হচ্ছে ইয়াবা, ফেনসিডিল ও হেরোইন। সঙ্গে নেশা-জাতীয় বড়ি মিশিয়ে তৈরি করা হয় ভয়ঙ্কর মাদকদ্রব্য । এই প্রতিবেদক গতকাল মঙ্গলবার বেলা সোয়া দুইটা থেকে বিকেল সাড়ে পাঁচটা পর্যন্ত মাদকের সংবাদের জন্য পরিচিত শহরের তিনটি এলাকায় সোয়া তিন ঘণ্টা অবস্থান করেন। তারপর পাওয়া যায় ভয়াবহ তথ্য।
মহানগরীর কৃষ্টপুর রেল লাইনে মাদক কেনার প্রস্তাব পাওয়ার পর সেখান থেকে ৩০০ গজ দূরে মসজিদের সামনে যান এই প্রতিবেদক। রাস্তায় ২০ মিনিট দাঁড়িয়ে থাকার পর এক ব্যক্তি পাশে দাঁড়িয়ে জানতে চান কারও জন্য অপেক্ষা করছি কি না। তিনি বলেন, স্থানীয় দুজন মাদক ব্যবসায়ী আপনার (প্রতিবেদক) পরিচয় জানেন এবং আপনাকে ভাল করে চেনেন।
কেউ মাদক কেনার জন্য প্রস্তাব নিয়ে আসবে না। তিনি বলেন, এই গলিতে সব সময় ইয়াবা বিক্রি চলে। এখানে রাস্তার পাশের কয়েকটি টং দোকানে (চায়ের দোকান) গাঁজা-হেরোইনও বিক্রি হয়। ইয়াবায় আসক্ত ওই তরুণদের অনেকে শহরের অলিগলিতে চুরি-ছিনতাইয়েও জড়িত।
রেলওয়ে কোয়ার্টার ঘণ্টাখানেক কাটিয়ে বিকেল চারটার দিকে হেঁটে ৩০০ গজ দূরে রেলওয়ে পরিত্যক্ত কোয়াটার একটি গলির মুখে গিয়েই এক ব্যক্তিকে ঘিরে তিন-চারজন যুবকের জটলা দেখা গেল। পরে দেখা গেল ঘটনাটি মাদক বেচাকেনার নয়। চারজনই একসঙ্গে চলে গেল।
ধরা পড়ার ভয়ে সাধারণত মাদকের ক্রেতা-বিক্রেতা একসঙ্গে যান না। সেখানে বসা এমন একজন পরিচিত যুবককে খুঁজে বের করে তার কাছে মাদক বিক্রেতাদের তথ্য জানতে চান প্রতিবেদক। ওই যুবক দেখিয়ে দিলেন লুঙ্গি ও শার্ট পরা এক ব্যক্তিকে। পরে জানা যায় তার নাম আনোয়ার । কথা হয় তার সঙ্গে। তিনি বলেন, থানা ‘ম্যানেজ (ব্যবস্থা) করেই এসব চলে।
শহরে মাদক বিক্রির জন্য পরিচিত তিনটি এলাকা ঘুরে এবং ক্রেতা-বিক্রেতাদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়,
অপরিচিত মুখ ১৬-১৭ বছরের কিশোর থেকে শুরু করে ৩৫-৩৭ বছরের তরুণদের কাছেই মূলত ইয়াবা ও হিরোইন পুরিয়া বিক্রি করা হয়। বিক্রেতারা বলেন, অপরিচিত কোনো ব্যক্তি নির্দিষ্ট গলিতে এলে তিনি মাদকসেবী কি না, তা সহজেই ধরতে পারেন তারা।
এলাকায় ওই ব্যক্তির অবস্থান ও আচরণ বুঝেই মাদক কেনার প্রস্তাব দেন তারা। বেশির ভাগ সময়েই তাদের (মাদক বিক্রেতা) ধারণা ঠিক হয়। নিয়মিত মাদক না নিলেও ময়মনসিংহ বেড়াতে এসে শখ করে বা কৌতূহলবশত অনেকে ইয়াবা কিনতে আসেন। তাদের কাছ থেকে দাম বেশি রাখা হয়।
ময়মনসিংহ জেলা মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর ও গোয়েন্দা পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, শহরের পুরোহিত পাড়া, কৃষ্টপুর, রেলওয়ে কলোনি, বলাশপুর কলোনি,নদীর পাড়, বালুর মাঠ, কেওয়াটখালী, মাসকান্দা জব্বারের মোড়,পাট গুদাম ব্রিজ মোড়, ব্রিজের নিচে বালুর মাঠ, চামড়া গুদাম, সিনেমা হল, নওমহর মোড়, বাইপাস কানার বাড়ি,কাচিঝুলি,জেল রোড কাশর, জেলখানা রোড, জেলখানা নদীর পাড়, খাগডহর বালুর মাঠ, টাউন হল মোর, গাঙ্গিনাপার, পতিতাপল্লীর গেইট, যৌন পল্লীর ভিতরে, চরপাড়া, মাসকান্দা,আর কে মিশন রোড, সদর উপজেলার পিছনে, রেল স্টেশন, শম্ভুগঞ্জ রেলস্টেশন, রেললাইন দক্ষিণ – উত্তর,গনসার মোড়,
পলিটেকনিকেল মোড়, আলিয়া মাদ্রাসা, কালিবাড়ির পিছনে বালির মাঠ, থানাঘাট বালির মাঠ, জয়নাল আবেদিন পার্ক ৩ স্পট, নদীর পাড়, পরানগঞ্জ বাজার, চোরখাই বাজার, নদীর পাড়, বগামারি হাসপাতালে পেছনে,মচিমহা হাসপাতাল গলি, মেডিকেল কলেজের পেছনে,শম্ভুগঞ্জ চামড়া বাজারসহ ত্রিশাল ০৭ নম্বর ওয়ার্ড সহ জেলায় ২২০০ শতাধিক ব্যক্তি এসব এলাকায় খুচরা পর্যায়ে মাদক বিক্রি করেন। তাদের মধ্যে অন্তত ১৭০ জন নারী।
বিভিন্ন সময় নামে মাত্র অভিযান করা হয়। চুনোপুটি আটক হলেও রাঘবোয়ালেরা থেকে যায় আড়ালে। ময়মনসিংহ কোতোয়ালি মডেল থানা ও জেলা গোয়েন্দা সংস্থায় প্রায় এক যুগ ধরে অনেক পুলিশ অফিসার কর্মরত আছেন। নামে মাত্র বদলি হন। কিছুদিন পর আবারো চলে আসেন পুরনো পছন্দের মধুখানায় । তাদের সাথে মাদকের রাঘবোয়ালরা শ্যালক- দুলাভাই সম্পর্ক। অনেক পুলিশ অফিসার মাদক ব্যবসায়ীর সাথে জমিও কিনেছেন।
জানা গেছে, ময়মনসিংহ জেলায় মাদক ও অন্যান্য মামলার প্রায় ১২ হাজার গ্রেফতারী পরোয়ানা রয়েছে। এর মধ্যে মাদকের সাজা প্রায় ৩০০ মত।
ময়মনসিংহ জজ কোর্টের আইনজীবী এড. আতিকুল বারী বলেন,একটি জেলায় যদি ১২ হাজারের মতো ওয়ারেন্ট ভুক্ত আসামি থাকে তাহলে তো অপরাধ কর্মকান্ড ঘটবেই। ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ নজর দেওয়ার প্রয়োজন।
চরপাড়ার বাসিন্দা, হাজী ইকবাল হোসেন বলেন,আমার বিল্ডিং এর পাশে নিয়মিত দাঁড়িয়ে ইয়াবা বিক্রি করে। অনেক সময় সাদা পোশাকে কারা জানি এসে দেখা করে চলে যায়। অনেক সময় ধরে নিয়ে গেলেও, ঘন্টাখানেক পরে আবার চলে আসে। যে লাউ সেই কদু।
কৃষ্টপুরের বাসিন্দা আছিয়া খাতুন বলেন,আমার এলাকায় ফেনসিডিল প্রকাশ্যে বিক্রি হয়, আমার একটি আদরের সন্তান সঙ্গত সে তার জীবনটাও শেষ। আমি আজ পথের ফকির। বহুবার পুলিশকে বলেছি অভিযান করেন। অভিযান করলেও আমার নাম বলে দিয়ে আরো মহা বিপদে ফেলে দিয়েছে। আমি এখন বাসায়ও থাকতে পারিনা। আল্লাহ যেন তাদের বিচার করে।
মাসকান্দা নয়াপাড়ার বাসিন্দা, নৌবাহিনী অব: কর্মকর্তা আনিসুর রহমান বাবুল বলেন, আমি প্রথমে অনেক পুলিশকে তথ্য দিয়েছি, এখন আর তথ্য দেই না। কারণ তারা টাকা খেয়ে আমার নাম বলে দিয়েছে । এখন পুলিশের কাছে বলে আর বিপদ টেনে আনতে চাই না । আমার দুটি মেয়ে বিয়ে দিয়েছি, এখন শুধু দেখি, আর জীবনের কথা চিন্তা করি। আমি একটা শৃঙ্খলের মধ্যে চাকরি করেছি। সারা জীবন সৎ পথে ছিলাম , তাদের অসৎ এবং কর্মকাণ্ড দেখে আবার ঘৃণা হয়। এখন আর কোনো প্রতিবাদ করতে চাই না।
মহানগরীর চামড়া গুদামের বাসিন্দা শিক্ষিকা নাসরিন বলেন, সাংবাদিক ভাই আপনি আমার সাথে কথা বলবেন না? এটা যদি মাদক ব্যবসায়ীরা শোনে, তাহলে এখানে আমি আর থাকতে পারবো না। কিছুদিন আগে আমি বিশ্বাস করে ডিবি পুলিশকে তথ্য দিয়েছিলাম, পরে তারা একদিন অভিযান করেছিল। আটক করে নিয়ে যায় ৬ জনকে।
পরের দিন দেখি চারজন ঘুরছে। দুইজনকে চালান করেছিল। ১৫ দিন পর দেখি জেল থেকে চলে আসছে। তারা আমাকে সন্দেহ করে রাস্তায় খুব ডিস্টার্ব করেছিল। আমি আমার মত ম্যানেজ করে নিয়েছি। পরে তারা আমার স্বামীকেও মাদক দিয়ে ফাঁসাতে চেয়েছিল। থানা পুলিশের এক দারোগা ভাইকে বলেছিলাম। কিছুদিন পরে দেখি তিনিও তাদের সাথে বসে চা খায়। তাই আর কিছু বলতে চাই না, বিপদেও পড়তে চাই না।