গাজীপুর সিটি করপোরেশন এলাকায় প্রধান সড়ক ও ফ্লাইওভারে অটোরিকশার অনিয়ন্ত্রিত চলাচল এখন নিত্যদিনের চিত্র। ট্রাফিক আইন অমান্য, দ্রুতগতিতে লেন পরিবর্তন, হঠাৎ ঘুরে দাঁড়ানো এবং হাইওয়েতে উঠে আসার কারণে সাধারণ চালকেরা চরম বিড়ম্বনায় পড়ছেন, একইসঙ্গে বাড়ছে দুর্ঘটনার ঝুঁকি। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম থেকে শুরু করে চায়ের দোকানের আড্ডা—সবখানেই অটোরিকশার ‘বিশেষ সুবিধা’ নিয়ে তীব্র আলোচনা-সমালোচনা চলছে। যাত্রীরা প্রশ্ন তুলছেন, প্রধান সড়কে কেন অটো?
নগরবাসীর অভিযোগ, অটোরিকশার স্থান মহল্লা ও সেকেন্ডারি রোড, কিন্তু তারা নির্বিচারে শহরের প্রধান সড়ক, এমনকি ফ্লাইওভারেও উঠে আসছে। বাস, প্রাইভেট কার বা মোটরসাইকেলকে ধীরগতিতে চলতে বাধ্য করে এসব অটোরিকশা, যেখানে সামান্য অসতর্কতায় বড় দুর্ঘটনা ঘটতে পারে। একজন গাড়িচালক ক্ষোভ জানিয়ে বলেন, “একদম হাইওয়েতে চলে আসে। কোনো নিয়ম নেই, কোনো ভয় নেই। রাগ দেখালে বলে, ‘মাফ করেন, গরিব মানুষ’।” আরেকজন বলেন, “আমার ব্যক্তিগত গাড়ির ফুলবডি নষ্ট করেছে অটোচালকেরা। রং করাতে এক মাস ধরে গাড়ি ঢাকায় পড়ে আছে।”
অনেকেই অবশ্য মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে অটোরিকশাকে দেখছেন। একজন স্থানীয় বাসিন্দা বলেন, “নেতারা-প্রশাসন যদি চাকরির ব্যবস্থা করত, এত লোক অটো চালাতে আসত না। অনেক পরিবারের দু’বেলা খাবারের চাকা এই অটো চালিয়েই চলে। অটোর বিরুদ্ধে যাওয়া উচিত নয়, নিয়মের মধ্যে আনতে হবে।”
স্থানীয় কয়েকজন অটোচালকের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, মহল্লার ভাড়ায় সংসার চলে না। গ্যাস, ব্যাটারি, কিস্তি—সব মিলিয়ে প্রধান সড়কে না নামলে আয় হয় না। প্রধান রুটে ঢুকতে না দিলে সিটি করপোরেশন আগে তাদের রুট ঠিক করে দিক, এমন দাবিও জানান তারা।
ভুক্তভোগী বাস-প্রাইভেটকার চালকদের দাবি: অটোরিকশার জন্য আলাদা অফিসিয়াল রেজিস্ট্রেশন বাধ্যতামূলক করতে হবে; চালকদের ড্রাইভিং লাইসেন্স বা অন্তত ট্রাফিক অনুমতিপত্র দিতে হবে; নিয়ম না মানলে রুট পারমিট বাতিল ও জরিমানা করতে হবে; এবং ফ্লাইওভার ও প্রধান সড়কে অটোরিকশা চলাচল সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করতে হবে।
জিএমপি ট্রাফিকের ডিসি আশরাফুল আলম বলেন, “নিয়ম না মানলে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। অটোরিকশা মহল্লা ও লেনভিত্তিক সড়কে চলার জন্য। প্রধান সড়ক বা ফ্লাইওভারগুলোতে উঠলে দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়ে। আমরা অভিযান চালাচ্ছি, আরও কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।” তিনি আরও বলেন, “শিগগিরই অটোরিকশার রেজিস্ট্রেশন, চালকদের পরিচয়পত্র, ট্রাফিক ট্রেনিং—এসব বাধ্যতামূলক করার প্রস্তাব দেওয়া হচ্ছে।”
সার্জেন্ট ও টিআইদের বক্তব্য, ‘আইন মানাতে গিয়ে প্রতিদিন ঝামেলা’ পোহাতে হয়। গাজীপুর মেট্রোপলিটন পুলিশের এক সার্জেন্ট বলেন, “হাইওয়ে বা ফ্লাইওভারের মুখে দাঁড়ালেই দেখা যায়, অটোরিকশা উল্টো পথে আসে। থামালে অনেকে তর্ক করে। কিন্তু জনগণের নিরাপত্তার জন্য নিয়ম মানা ছাড়া বিকল্প নেই।” এক ট্রাফিক ইন্সপেক্টর (টিআই) বলেন, “দিন-রাত ৪-৫ বার করে ব্যবস্থা নিতে হয়। অনেক অটোর রেজিস্ট্রেশন নেই, চালকদের লাইসেন্স নেই। দ্রুত এ সমস্যা সমাধান জরুরি।”
পরিবহন বিশেষজ্ঞদের মতে, অটোরিকশা মহল্লা/সেকেন্ডারি রোডে সীমাবদ্ধ করা, প্রতিটি অটোরিকশার সিটি করপোরেশন অনুমোদিত রেজিস্ট্রেশন, চালকদের আবশ্যিক ট্রাফিক ট্রেনিং, নির্দিষ্ট অটোস্ট্যান্ড ব্যবস্থা, নিয়মিত চেকপোস্ট ও ক্যামেরা পর্যবেক্ষণ—এসব কার্যকর হলে শহরের শৃঙ্খলা ফেরানো সম্ভব।
সর্বোপরি, অটোরিকশা অনেক পরিবারের জীবিকা, আবার একইসঙ্গে নগরবাসীর এক বড় ভোগান্তির কারণ। জনস্বার্থ বজায় রেখে নিয়মতান্ত্রিক রেজিস্ট্রেশন, লাইসেন্স ও ট্রাফিক ট্রেনিং বাধ্যতামূলক করা—এটাই এখন সময়ের দাবি। গাজীপুর নগরবাসী ও ভুক্তভোগীরা আশা করছেন, মহল্লায় অটো চলবে—কিন্তু প্রধান সড়ক ও ফ্লাইওভার হবে অটোরিকশামুক্ত।
আপনার মতামত লিখুন :