আব্দুল মালেক বেপারি, কুয়েত অফিস: মধ্যপ্রাচ্যের অন্যতম ধনী দেশ কুয়েতে প্রায় তিন লাখ বাংলাদেশি প্রবাসী বসবাস করেন। এদের মধ্যে প্রায় সাড়ে পাঁচ হাজারের মতো বাংলাদেশি পরিবার রয়েছে। অধিকাংশ পরিবারই ব্যবসা-বাণিজ্য ও পেশাগত কাজে ব্যস্ত থাকায় পারিবারিক জীবনে সময় দেওয়ার সুযোগ সীমিত। তবুও অনেক প্রবাসী নারী স্বামীদের পাশে দাঁড়িয়ে সংসারের আয় বাড়ানোর পাশাপাশি দেশের অর্থনীতিতেও গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখে চলেছেন। রেমিট্যান্স প্রবাহ বৃদ্ধিতেও প্রবাসী নারীদের ভূমিকা দিন দিন দৃশ্যমান হচ্ছে।
বিশ্ব নারী দিবসকে সামনে রেখে কুয়েতে কর্মরত চার বাংলাদেশি নারীর সঙ্গে কথা বলে উঠে এসেছে সংগ্রাম, আত্মবিশ্বাস ও সাফল্যের গল্প।
নাসরিন আক্তার মৌসুমী: প্রবাসে থেকেও সাহিত্য-সংস্কৃতির সেতুবন্ধন
কেরানীগঞ্জের মেয়ে নাসরিন আক্তার মৌসুমী ১৯৯৯ সালে কুয়েতে পাড়ি জমান। স্বামী আলী নেওয়াজ সেখানে ব্যবসা করেন। তিন সন্তানের জননী নাসরিন পরিবার সামলানোর পাশাপাশি নিজের পরিচয় গড়েছেন সাহিত্য ও গণমাধ্যমে।
তিনি বলেন, “আমরা অনেক সময় মনে করি, মেয়েদের বিয়ে হয়ে গেলে জীবন থেমে যায়। এই চিন্তা থেকে বের হতে হবে। দৃষ্টিভঙ্গি বদলালেই নারীরা নিজেদের অধিকার আদায় করতে পারবে।”
২০১৫ সাল থেকে সামাজিক মাধ্যমে লেখালেখি শুরু করেন নাসরিন। পরে বিভিন্ন টেলিভিশন টকশোতে প্রবাসীদের সুখ-দুঃখ তুলে ধরেন। এবারের একুশে বইমেলায় তার সম্পাদনায় প্রকাশিত হয়েছে যৌথ কাব্যগ্রন্থ ‘স্বপ্নের সাতকাহন’। বর্তমানে তিনি জয়যাত্রা টেলিভিশনের কুয়েত প্রতিনিধি হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।
নাসিমা সরকার: সংসার, শিক্ষকতা আর আত্মনির্ভরতার গল্প
কুমিল্লার ব্রাহ্মণবাড়িয়ার মেয়ে নাসিমা সরকার প্রায় ২০ বছর ধরে কুয়েতে বসবাস করছেন। স্বামী ইমরান হোসেন একজন ইলেকট্রিক্যাল ইঞ্জিনিয়ার। তিন সন্তানের জননী নাসিমা সংসারের দায়িত্ব সামলানোর পাশাপাশি গত ১০ বছর ধরে শিক্ষকতা করছেন।
নারীর অগ্রগতি প্রসঙ্গে তিনি বলেন, “নারীরা এখন আর পিছিয়ে নেই। দেশে-বিদেশে, সরকারি-বেসরকারি সব ক্ষেত্রেই নারীরা সাফল্যের স্বাক্ষর রাখছে।”
আমেনা আক্তার রেনু: পরিশ্রমে অর্জিত পেশাগত স্বীকৃতি
ঢাকার মেয়ে আমেনা আক্তার রেনু কুয়েতের সালমিয়া অঞ্চলে পরিবার নিয়ে বসবাস করছেন। স্বামী আরিফ আমেরিকান আর্মির একটি ক্যাম্পে মেইনটেন্যান্স অপারেশন ম্যানেজার হিসেবে কর্মরত। রেনু নিজে একটি আমেরিকান ফুড কোম্পানিতে কাজ করেন, যেখানে তিনি একমাত্র বাংলাদেশি নারী কর্মী।
দুই যুগেরও বেশি সময় ধরে নিষ্ঠার সঙ্গে কাজ করায় প্রতিষ্ঠান থেকে তিনি দু’বার ‘স্টার অব দ্য মান্থ’ সম্মাননা পেয়েছেন। বর্তমানে তিনি একই প্রতিষ্ঠানে সুপারভাইজার পদে কর্মরত।
রেনুর ভাষায়, “বাংলাদেশি নারীরা যদি আরও সুযোগ পায়, তাহলে তারা বড় বড় প্রতিষ্ঠানে কাজ করতে পারবে এবং দেশের অর্থনীতিতেও বড় অবদান রাখতে সক্ষম হবে।”
সাথী আক্তার চৌধুরী: দীর্ঘ প্রবাস জীবনের কর্মসংগ্রাম
বিক্রমপুরের শ্রীনগরের মেয়ে সাথী আক্তার চৌধুরী প্রায় ১৫ বছর ধরে কুয়েতে কাজ করছেন। একসময় আল গানিম মেডিসিন কোম্পানিতে ১১ বছর কাজ করেছেন। পরে অতিরিক্ত ডিউটির কারণে সেখান থেকে সরে এসে বর্তমানে তিন বছর ধরে ট্রাফিকো ট্রাভেলসে কর্মরত আছেন।
তার মেয়ে সাহরা হোসেন দ্বাদশ শ্রেণির পরীক্ষার্থী এবং ছেলে সাহিল হোসেন কানাডায় বিবিএ পড়ছেন।
সাথীর কথায়, “সুযোগ পেলে বাংলাদেশি নারীরা আরও ভালো প্রতিষ্ঠানে কাজ করতে পারবে। পরিবার সামলানোর পাশাপাশি দেশের অর্থনীতিতেও অবদান রাখতে পারবে।”
প্রবাসে নারীর অদম্য পথচলা
এই চার নারীর গল্প শুধু ব্যক্তিগত সাফল্যের নয়; বরং প্রবাসে থেকেও কীভাবে নারীরা পরিবার, পেশা এবং দেশের প্রতি দায়িত্ব একসঙ্গে সামলাচ্ছেন—তারই অনুপ্রেরণামূলক উদাহরণ। সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন এবং সুযোগের বিস্তার ঘটলে প্রবাসী বাংলাদেশি নারীরা আরও বড় পরিসরে সাফল্য অর্জন করতে সক্ষম হবেন—এটাই তাদের প্রত্যাশা।
আপনার মতামত লিখুন :