‘সবার আগে বাংলাদেশ’—রাষ্ট্র পরিচালনার এই মূলনীতিকে সামনে রেখে নির্বাচনী ইশতেহার ঘোষণা করতে যাচ্ছে বিএনপি। এতে দুর্নীতিবিরোধী কঠোর অবস্থান, মুক্তিযুদ্ধের শহীদদের নির্ভুল তালিকা প্রণয়ন এবং জুলাই গণঅভ্যুত্থানের বিচার নিশ্চিত করার মতো বিষয়গুলো বিশেষ গুরুত্ব পাচ্ছে।
আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ছয় দিন আগে, শুক্রবার (৬ ফেব্রুয়ারি) রাজধানীর সোনারগাঁও হোটেলে বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান এই ইশতেহার ঘোষণা করবেন। দলটির মিডিয়া সেল জানিয়েছে, বিকেল সাড়ে ৩টায় অনুষ্ঠানটি শুরু হবে। এতে সভাপতিত্ব করবেন দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর এবং সঞ্চালনা করবেন নির্বাচন পরিচালনা কমিটির চেয়ারম্যান নজরুল ইসলাম খান।
ইশতেহারের ভিত্তি
দলীয় সূত্রে জানা গেছে, ইশতেহারটি প্রণয়ন করা হয়েছে বিএনপির ঘোষিত ‘রাষ্ট্র কাঠামো মেরামতের ৩১ দফা’, শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের ‘১৯ দফা’, বেগম খালেদা জিয়ার ‘ভিশন–২০৩০’ এবং ‘জুলাই জাতীয় সনদ’-এর সমন্বয়ে।
প্রধান অঙ্গীকার ও প্রতিশ্রুতি
ইশতেহারে ফ্যামিলি কার্ড, কৃষি কার্ড, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কর্মসংস্থান, পরিবেশ, পররাষ্ট্র নীতি, প্রতিরক্ষা খাত, জুলাই গণঅভ্যুত্থানের বিচার এবং আওয়ামী লীগ আমলের শেয়ারবাজার কেলেঙ্কারির তদন্তকে প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে। নারী ও তরুণ সমাজের আকাঙ্ক্ষাকে গুরুত্ব দিয়ে ইশতেহারের বিষয়বস্তু চূড়ান্ত করা হয়েছে।
ইশতেহারে ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ, ১৯৭৫ সালের সিপাহী-জনতার বিপ্লব এবং ১৯৯০ সালের গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠার বিষয়গুলোর উল্লেখ থাকবে।
সবার জন্য বিনামূল্যে চিকিৎসাসেবা
স্বাস্থ্য খাতে জিডিপির ৫ শতাংশ বরাদ্দের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে বিএনপি। প্রতিটি নাগরিকের জন্য ‘ই-হেলথ কার্ড’ চালুর মাধ্যমে বিনামূল্যে চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করা হবে। মাতৃস্বাস্থ্য, শিশুস্বাস্থ্য ও জটিল রোগের চিকিৎসায় সরকারি-বেসরকারি অংশীদারিত্ব (PPP) মডেল চালুর পরিকল্পনা রয়েছে। একটি কেন্দ্রীয় ডিজিটাল হেলথ ডেটাবেজ গড়ে তোলা হবে এবং বাংলাদেশকে ‘স্বাস্থ্য পর্যটন সিটি’ হিসেবে গড়ে তোলার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
তরুণ ও যুবসমাজের উন্নয়ন
তরুণদের দক্ষতা উন্নয়ন ও কর্মসংস্থানে আইটি পার্কে অফিস সুবিধা, ফ্রি ওয়াইফাই জোন, আউটসোর্সিং ও এসএমই খাতে সহজ শর্তে ঋণ দেওয়া হবে। অ্যামাজন ও আলিবাবার মতো আন্তর্জাতিক ই-কমার্স প্ল্যাটফর্মের সঙ্গে দেশীয় বাজার যুক্ত করার উদ্যোগ থাকবে। বিদেশি ভাষা শিক্ষা, স্টার্ট-আপ ফান্ড গঠন এবং মাধ্যমিক পর্যায় থেকেই কারিগরি শিক্ষা চালুর অঙ্গীকার রয়েছে।
শিক্ষা খাতের সংস্কার
শিক্ষা খাতে জিডিপির ৫ শতাংশ বরাদ্দ, শিক্ষা সংস্কার কমিশন গঠন, তৃতীয় বিদেশি ভাষা শিক্ষা বাধ্যতামূলক করা এবং ঝরে পড়া রোধে বিনামূল্যে স্কুল ড্রেস প্রদানের পরিকল্পনা রয়েছে। সব শিক্ষা প্রতিষ্ঠান সন্ত্রাস ও মাদকমুক্ত করার পাশাপাশি নারী শিক্ষার্থীদের জন্য স্বাস্থ্য সুরক্ষা সুবিধা নিশ্চিত করা হবে।
শিক্ষকদের জন্য আকর্ষণীয় বেতন কাঠামো
প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের জন্য উন্নত বেতন কাঠামো ও কল্যাণমূলক কর্মসূচি চালুর প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে।
৫ বছরে এক কোটি জনশক্তি রপ্তানি
আগামী পাঁচ বছরে এক কোটি দক্ষ ও অদক্ষ জনশক্তি বিদেশে পাঠানোর পরিকল্পনা রয়েছে। আইটি খাতে ১০ লাখ নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
পরিবেশ ও জলবায়ু
পাঁচ বছরে ২৫ কোটি বৃক্ষরোপণ এবং প্লাস্টিক বর্জ্য ৩০ শতাংশ কমানোর পরিকল্পনা রয়েছে। পরিবেশবান্ধব সবুজ কর্মসংস্থান সৃষ্টির ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
ন্যায়বিচার ও মানবাধিকার
জুলাই-আগস্ট গণঅভ্যুত্থানসহ সকল মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার নিশ্চিত করা হবে। গুম ও বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড বন্ধে আন্তর্জাতিক মানের কঠোর আইন প্রণয়ন করা হবে।
জবাবদিহিতা ও স্থানীয় সরকার
স্থানীয় সরকারকে শক্তিশালী করতে প্রতি বছর উন্মুক্ত স্থানে ‘উন্নয়ন জনসভা’ আয়োজনের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে।
প্রতিরক্ষা ও সার্বভৌমত্ব
‘বাংলাদেশ ফার্স্ট’ নীতির আলোকে আধুনিক ও যুগোপযোগী সশস্ত্র বাহিনী গড়ে তোলার পরিকল্পনা ইশতেহারে অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
পুঁজিবাজার ও অর্থনীতি
পুঁজিবাজারে বিগত ১৫ বছরের অনিয়ম তদন্তে বিশেষ কমিশন গঠন, বিদেশি বিনিয়োগ বৃদ্ধি এবং শেয়ারবাজার শিক্ষার প্রসার ঘটানোর অঙ্গীকার করা হয়েছে।
বিদ্যুৎ ও জ্বালানি
২০৩০ সালের মধ্যে বিদ্যুৎ উৎপাদন ক্ষমতা ৩৫ হাজার মেগাওয়াটে উন্নীত করার পরিকল্পনা রয়েছে।
যোগাযোগ ও পরিবহন
গ্রামীণ সড়ক উন্নয়নের পাশাপাশি বড় শহরে সাইকেল রাইড শেয়ারিং ও পৃথক লেন চালুর উদ্যোগ থাকবে।
রাজস্ব ও সুশাসন
রাজস্ব-জিডিপি অনুপাত ১৫ শতাংশে উন্নীত করা, পাচারকৃত অর্থ উদ্ধার এবং দুর্নীতির বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি বাস্তবায়নের অঙ্গীকার রয়েছে।
সামাজিক নিরাপত্তা
বেসরকারি কর্মীদের জন্য পেনশন ফান্ড গঠন, ফ্যামিলি কার্ড, কৃষি কার্ড এবং মৎস্যজীবীদের জন্য ‘জাল যার, জলা তার’ নীতি বাস্তবায়নের ঘোষণা দেওয়া হয়েছে।
নদী ও কৃষি
২০ হাজার কিলোমিটার নদী ও খাল খনন ও পুনঃখননের মহাপরিকল্পনা ইশতেহারে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
ধর্মীয় ও সামাজিক মর্যাদা
‘ধর্ম যার যার, রাষ্ট্র সবার’ নীতির ভিত্তিতে সব ধর্মীয় উপাসনালয়ের নেতাদের জন্য মাসিক সম্মানী ও উৎসব ভাতা দেওয়ার প্রতিশ্রুতি রয়েছে। ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর উন্নয়নে পৃথক অধিদপ্তর গঠনের পরিকল্পনাও থাকছে।
আপনার মতামত লিখুন :