হরমুজ প্রণালী বন্ধের শঙ্কায় বিশ্ববাজারে তেলের দামে রেকর্ড লাফ

অনলাইন ডেস্ক , প্রতিদিনের কাগজ

প্রকাশিত: ০৩ মার্চ, ২০২৬, ০৫:২৫ পিএম

ইরান এবং ইসরায়েল-যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার যুদ্ধ এখন বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি করিডোর ‘হরমুজ প্রণালী’তে ছড়িয়ে পড়েছে। এর ফলে বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম হু হু করে বাড়ছে। এই উত্তেজনার জেরে সোমবার (২ মার্চ) তেলের দাম প্রতি ব্যারেলে ৭৯ দশমিক ৪০ ডলার ছাড়িয়ে গেছে, যা গত শুক্রবার ছিল ৭৩ ডলার। 

ইরানের বিপ্লবী গার্ড কর্পস (আইআরজিসি) এই জলপথটি বন্ধ ঘোষণা করে সতর্ক করে বলেছে, কোনো জাহাজ এখান দিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করলে তাতে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হবে। 

সামুদ্রিক গোয়েন্দা সংস্থা উইন্ডওয়ার্ডের জ্যেষ্ঠ বিশ্লেষক মিশেল বকমান আল জাজিরাকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বলেন, ‘মধ্যপ্রাচ্যে চলমান অস্থিরতার জেরে হরমুজ প্রণালীতে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল অন্তত ৮০ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে। জাহাজ চলাচল কমে যাওয়ার পাশাপাশি মধ্যপ্রাচ্য ও উপসাগরীয় রুটে পণ্য পরিবহন খরচ বৃদ্ধি পেয়েছে, যা বিশ্ব শিপিং শিল্পের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি করছে।’

ইরানের হামলায় অন্তত পাঁচটি তেলবাহী ট্যাঙ্কার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং দুইজন ক্রু সদস্য নিহত হয়েছেন। বর্তমানে ওমান ও ইরানের মধ্যবর্তী এই প্রণালীতে প্রায় ১৫০টি জাহাজ আটকা পড়ে আছে। অধিকাংশ বাণিজ্যিক অপারেটর, বড় তেল কোম্পানি এবং বীমা প্রতিষ্ঠানগুলো এই রুট থেকে তাদের কার্যক্রম সরিয়ে নিয়েছে।

মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাতের তীব্রতা বৃদ্ধিতে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন জ্বালানি বিশেষজ্ঞ র‍্যাচেল জিয়েম্বা। আল জাজিরাকে তিনি বলেন, রাতারাতি পরিস্থিতি মারাত্মক মোড় নেওয়ায় উপসাগরীয় অঞ্চলের জ্বালানি অবকাঠামো চরম ঝুঁকির মুখে পড়েছে। এরই মধ্যে কাতার সতর্কতামূলক পদক্ষেপ হিসেবে এলএনজি উৎপাদন স্থগিত করেছে। জিয়েম্বা সতর্ক করে বলেন, ‘তেলবাহী ট্যাঙ্কারগুলো উপসাগরে প্রবেশ করতে চাইছে না, যা বর্তমান পরিস্থিতির ভয়াবহ ঝুঁকিকেই স্পষ্ট করে।’

হরমুজ প্রণালী দিয়ে সরবরাহ করা অপরিশোধিত তেলের প্রায় ৭০ শতাংশ যায় এশিয়ায় বিশেষ করে চীন, ভারত, জাপান এবং দক্ষিণ কোরিয়ায়। এছাড়া ইউরোপের ব্যবহৃত জেট ফুয়েলের ৩০ শতাংশ এবং বিশ্বের মোট এলএনজি সরবরাহের ২০ শতাংশ এই পথ দিয়েই যায়।

সাপ্লাই চেইন প্ল্যাটফর্ম 'ওভারহল'-এর নির্বাহী ভাইস প্রেসিডেন্ট ডেভিড ওয়ারিক মধ্যপ্রাচ্যের বর্তমান পরিস্থিতিকে সতর্ক করেন যে, দ্রুত পরিবর্তনশীল এই পরিস্থিতির কারণে বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যবস্থা বা সাপ্লাই চেইন মারাত্মক অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে।

নিরাপত্তার খাতিরে শিপিং কোম্পানিগুলো এখন তাদের জাহাজগুলোকে আফ্রিকার ‘কেপ অফ গুড হোপ’ হয়ে ঘুরিয়ে দিচ্ছে। ওয়ারিক বলেন, যুদ্ধকালীন ঝুঁকি বিমা এবং জরুরি আপদকালীন বিমার বাড়তি মাশুলের কারণে প্রতিটি চালানে হাজার হাজার ডলার অতিরিক্ত ব্যয় হচ্ছে। এর ফলে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে বড় ধরনের আর্থিক চাপের সৃষ্টি হয়েছে

বিশেষজ্ঞদের মতে, হরমুজ প্রণালী সম্পূর্ণ বন্ধ করে দেওয়া ইরানের জন্য আত্মঘাতী হতে পারে কারণ এতে পারস্য উপসাগরীয় অন্যান্য মুসলিম দেশগুলোও যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ার উস্কানি পাবে। 

তবে এই সংকটে জ্বালানি উৎপাদনকারী দেশ হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রের তেল কোম্পানিগুলো লাভবান হতে পারে। অন্যদিকে, সাধারণ ভোক্তা এবং উৎপাদন খাত চরম ক্ষতির মুখে পড়বে।

সূত্র: আল জাজিরা

Link copied!