বিরোধী দলের তীব্র আপত্তির মধ্যেই মাত্র দুই দিনে মোট ৪১টি বিল পাস করে নতুন ইতিহাস গড়েছে জাতীয় সংসদ। এর মধ্যে একদিনেই সর্বোচ্চ ৩১টি বিল পাসের নজির স্থাপন করা হয়েছে, যা দেশের সংসদীয় ইতিহাসে একটি রেকর্ড।
শুক্রবার (১০ এপ্রিল) অধিবেশনের ১৩তম কার্যদিবসে আরও ১০টি বিল পাস হয়। সকালে উত্থাপিত এসব বিলের ওপর কোনো সংশোধনী প্রস্তাব না থাকায় আলোচনা ছাড়াই সর্বসম্মতিক্রমে সেগুলো পাস করা হয়। অধিবেশনে সভাপতিত্ব করেন স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ।
সংসদের বিশেষ কমিটি জানায়, অন্তর্বর্তী সরকারের জারি করা ১৩৩টি অধ্যাদেশের মধ্যে ৯৮টি অপরিবর্তিতভাবে এবং ১৫টি সংশোধনসহ পাসের সুপারিশ করা হয়েছে। বাকি ২০টির মধ্যে চারটি বাতিল এবং ১৬টি নতুনভাবে শক্তিশালী করে বিল আকারে আনার সুপারিশ করা হয়েছে।
এর আগে বৃহস্পতিবার (০৯ এপ্রিল) ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনের ১১তম কার্যদিবসে কণ্ঠভোটে ৩১টি বিল পাস হয়। এর মধ্যে অন্তর্বর্তী সরকারের জারি করা অধ্যাদেশ থেকে কোনো পরিবর্তন ছাড়াই ২৮টি বিল পাস করা হয় এবং অধ্যাদেশ রহিত করে আরও তিনটি বিল অনুমোদন দেওয়া হয়।
ডেপুটি স্পিকার ব্যারিস্টার কায়সার কামালের সভাপতিত্বে অধিবেশনে ‘স্থানীয় সরকার (পৌরসভা) (সংশোধন) বিল-২০২৬’ উত্থাপন করা হলে বিরোধী দল এর বিরোধিতা করে। যদিও শেষ পর্যন্ত কণ্ঠভোটে বিলটি পাস হয়।
এ ঘটনায় ক্ষোভ প্রকাশ করে বিরোধী দলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান সংসদ থেকে ওয়াকআউটের ঘোষণা দেন। তিনি বলেন, দুঃখজনক হলেও সত্য, বিরোধী দলের যৌক্তিক বাধা স্বত্তেও যে কয়টি গণবিরোধী বিল আজকে পাস হয়েছে, আমরা তার দায় নিতে চাই না। এ কারণে আমরা সংসদ থেকে ওয়াকআউট করছি।
ওয়াকআউটের আগে আলোচনাকালে জামায়াতে ইসলামীর সংসদ সদস্য নাজিবুর রহমান বিলটির বিরোধিতা করে বলেন, আইন অনুযায়ী স্থানীয় সরকারের নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের সরিয়ে দিয়ে সেখানে অনির্বাচিত ব্যক্তিদের বসানোর কোনো সুযোগ নেই। কিন্তু এখন সেটাই করা হচ্ছে। নির্বাচন না দিয়ে দলীয় লোকজন দিয়ে স্থানীয় সরকার পরিচালনা করা হচ্ছে।
জবাবে বিলটি উত্থাপনকারী স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম বলেন, এই আইন সংশোধন করা না হলে ফ্যাসিস্ট শক্তি ফিরে আসার সুযোগ থাকবে। পাশাপাশি এই সংশোধনের মধ্য দিয়ে স্থানীয় সরকার নির্বাচনে দলীয় প্রতীকে নির্বাচন বাতিল করা হয়েছে। বর্তমান সরকার দ্রুত নির্বাচনও দিয়ে দেবে।
জামায়াতে ইসলামীর সংসদ সদস্যদের ওয়াকআউটের পর স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ সংসদে দাঁড়িয়ে বলেন, আমি ধন্যবাদ জানানোর জন্য উঠছি। আইন প্রণয়ন প্রক্রিয়ার ফাস্ট রিডিং, সেকেন্ড রিডিং, থার্ড রিডিং—সব রিডিংয়ে উনারা সহায়তা করেছেন। কেউ কেউ হাত তুলে সমর্থনও দিয়েছেন। সমস্ত প্রক্রিয়ায় অংশ নেওয়ার পরে ওয়াকআউটের কোনো মানে আছে কি না, এটা জানার জন্য। সমস্ত প্রক্রিয়ায় তারা অংশ নিয়েছেন, এ জন্য ধন্যবাদ।
দুই দিনে যেসব বিল পাস হলো—
‘জাতীয় ক্রীড়া পরিষদ (সংশোধন) বিল, ২০২৬’, ‘বঙ্গবন্ধু ক্রীড়াসেবী কল্যাণ ফাউন্ডেশন (সংশোধন) বিল, ২০২৬’, ‘শেখ হাসিনা জাতীয় যুব উন্নয়ন ইনস্টিটিউট (সংশোধন) বিল, ২০২৬’, ‘বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (সংশোধন) বিল, ২০২৬’, ‘পাবলিক প্রকিউরমেন্ট (সংশোধন) বিল, ২০২৬’, ‘বৈদেশিক কর্মসংস্থান ও অভিবাসী (সংশোধন) বিল, ২০২৬’, ‘বাংলাদেশ শ্রম সংশোধন বিল, ২০২৬’, ‘স্থানীয় সরকার (ইউনিয়ন পরিষদ) (সংশোধন) বিল, ২০২৬’।
‘আইনগত সহায়তা প্রদান (সংশোধন) বিল, ২০২৬’, ‘জাতীয় মুক্তিযোদ্ধা কাউন্সিল (সংশোধন) বিল, ২০২৬’, ‘ভূমি ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ ও কৃষিভূমি সুরক্ষা বিল, ২০২৬’, ‘বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ (সংশোধন) বিল, ২০২৬’, ‘বাংলাদেশ গ্যাস (সংশোধন) বিল, ২০২৬’, ‘মানবদেহে অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ সংযোজন বিল, ২০২৬’, ‘বৈদেশিক অনুদান (স্বেচ্ছাসেবামূলক কার্যক্রম) রেগুলেশন (সংশোধন) বিল, ২০২৬’, ‘মানব পাচার ও অভিবাসী চোরাচালান প্রতিরোধ ও দমন বিল, ২০২৬’, ‘বন ও বৃক্ষ সংরক্ষণ বিল, ২০২৬’, ‘বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান নভোথিয়েটার (সংশোধন) বিল, ২০২৬’, ‘বঙ্গবন্ধু বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি ফেলোশিপ ট্রাস্ট (সংশোধন) বিল, ২০২৬’, ‘জেলা পরিষদ (সংশোধন) বিল, ২০২৬’, ‘স্থানীয় সরকার (পৌরসভা) (সংশোধন) বিল, ২০২৬’, ‘সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় (রহিতকরণ) বিল, ২০২৬’।
‘জাতীয় মানবাধিকার কমিশন (রহিত ও পুনঃপ্রচলন) বিল, ২০২৬’, ‘সুপ্রিম কোর্টের বিচারক নিয়োগ (রহিতকরণ) বিল, ২০২৬’, ‘স্থানীয় সরকার (সিটি কর্পোরেশন) (সংশোধন) বিল, ২০২৬’, ‘বাংলাদেশ বিল্ডিং রেগুলেটরী কর্তৃপক্ষ বিল, ২০২৬’, ‘রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ বিল ২০২৬’, ‘স্থানীয় সরকার (উপজেলা পরিষদ) (সংশোধন) বিল, ২০২৬’, ‘ব্যক্তিগত উপাত্ত সুরক্ষা বিল, ২০২৬’, ‘বাংলাদেশ হাউজ বিল্ডিং ফাইনান্স কর্পোরেশন (এমেন্ডমেন্ট) বিল, ২০২৬’ এবং ‘নেগুশিয়েবল ইনস্টুমেন্ট (এমেন্ডমেন্ট) বিল, ২০২৬’।
শুক্রবার পাস হওয়া বিলগুলোর মধ্যে গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রী জাকারিয়া তাহের ‘নারায়ণগঞ্জ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ বিল, ২০২৬’; ‘বরিশাল উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ বিল, ২০২৬’; ‘ময়মনসিংহ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ বিল, ২০২৬’; ‘কুমিল্লা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ বিল, ২০২৬’ এবং ‘রংপুর উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ বিল, ২০২৬’ সংসদে উত্থাপন করেন এবং তা সর্বসম্মতিক্রমে পাস হয়।
সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রী নিতাই রায় চৌধুরী ‘বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমী (সংশোধন) বিল, ২০২৬’ পাসের প্রস্তাব উত্থাপন করেন এবং তা সর্বসম্মতিক্রমে পাস হয়।
পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রী আবদুল আউয়াল মিন্টু ‘বাংলাদেশ বনশিল্প উন্নয়ন কর্পোরেশন বিল, ২০২৬’ পাসের প্রস্তাব উত্থাপন করেন এবং তা সর্বসম্মতিক্রমে পাস হয়।
অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী ‘আমানত সুরক্ষা বিল, ২০২৬’; ‘এক্সাইজেস এন্ড সল্ট বিল, ২০২৬’; ‘মূল্য সংযোজন কর ও সম্পূরক শুল্ক (সংশোধন) বিল, ২০২৬’ পাসের প্রস্তাব উত্থাপন করেন এবং তা সর্বসম্মতিক্রমে পাস হয়।
আপনার মতামত লিখুন :