বাংলাদেশের বিচারিক ইতিহাসে এক নতুন নজির সৃষ্টি করেছে পল্লবীর সাত বছরের শিশু রামিসা আক্তারকে ধর্ষণের পর হত্যার মামলা। মাত্র ১৯ দিনের মধ্যে এ মামলার রায় ঘোষণা হওয়ায় দ্রুত বিচার নিয়ে নতুন আলোচনার জন্ম হয়েছে। তবে বিচারিক আদালতের রায়ের পরও মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের আগে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ আইনগত ধাপ অতিক্রম করতে হবে।
গত ২৪ মে মামলাটি ঢাকার মহানগর শিশু সহিংসতা দমন ট্রাইব্যুনালে স্থানান্তর করা হয়। এরপর মাত্র দুই সপ্তাহের মাথায়, রোববার (৭ জুন), ট্রাইব্যুনালের বিচারক মাসরুর সালেকীন আসামি সোহেল রানা ও তার স্ত্রী স্বপ্না খাতুনকে মৃত্যুদণ্ড দেন।
রায়ে সোহেল রানাকে পাঁচ লাখ এবং স্বপ্না খাতুনকে দুই লাখ টাকা জরিমানাও করা হয়েছে। আদালত নির্দেশ দিয়েছেন, জরিমানার অর্থ রামিসার আইনগত উত্তরাধিকারীদের দিতে হবে। আসামিরা অর্থ পরিশোধে ব্যর্থ হলে তাদের স্থাবর ও অস্থাবর সম্পত্তি ক্রোক করে বিক্রির মাধ্যমে ক্ষতিপূরণ আদায়ের ব্যবস্থা নিতে হবে।
রায়ের পর সন্তোষ প্রকাশ করেছেন রাষ্ট্রপক্ষ, আসামিপক্ষের আইনজীবী এবং নিহত শিশুর পরিবার।
রাষ্ট্রপক্ষের স্পেশাল পাবলিক প্রসিকিউটর আজিজুর রহমান দুলু বলেন, নৃশংস এই শিশু হত্যাকাণ্ডে আদালত যে রায় দিয়েছেন, তাতে তারা সন্তুষ্ট।
রাষ্ট্রনিযুক্ত আইনজীবী মুসা কলিমউল্লাহ জানান, আসামি সোহেল রানা আদালতে নিজের অপরাধ স্বীকার করে ক্ষমা প্রার্থনা করেছেন এবং ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় জবানবন্দিও দিয়েছেন। ফলে তিনি আত্মস্বীকৃত অপরাধী হিসেবে তার অপরাধের বিচার পেয়েছেন বলে মন্তব্য করেন তিনি।
অন্যদিকে রামিসার বাবা আব্দুল হান্নান মোল্লা রায়ে সন্তোষ প্রকাশ করে দ্রুত কার্যকরের দাবি জানিয়েছেন। তিনি বলেন, নির্ধারিত সময়ের মধ্যেই কাঙ্ক্ষিত রায় পাওয়ায় পরিবার আশাবাদী। এখন তাদের একমাত্র প্রত্যাশা, মৃত্যুদণ্ডের রায় দ্রুত কার্যকর করা হোক।
ট্রাইব্যুনাল মৃত্যুদণ্ডের রায় দিলেও তা কার্যকর করতে হলে উচ্চ আদালতের অনুমোদন প্রয়োজন। ফৌজদারি কার্যবিধির ৩৭৪ ধারা অনুযায়ী মৃত্যুদণ্ড অনুমোদনের জন্য মামলাটি হাইকোর্টে পাঠানো হবে, যা ‘ডেথ রেফারেন্স’ নামে পরিচিত।
আসামিরা আপিল করলে ডেথ রেফারেন্স ও আপিল একসঙ্গে শুনানি হবে। হাইকোর্ট মৃত্যুদণ্ড বহাল রাখলে আসামিরা সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগে যেতে পারবেন। এরপরও রিভিউ আবেদন করার সুযোগ থাকবে। সবশেষে সংবিধানের ৪৯ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী রাষ্ট্রপতির কাছে প্রাণভিক্ষার আবেদন করা যেতে পারে। সেই আবেদন নাকচ হলে কারা কর্তৃপক্ষ আইনি প্রক্রিয়া অনুযায়ী মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করবে।
আইন সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, সাধারণ নিয়মে ডেথ রেফারেন্স ও আপিল নিষ্পত্তিতে দীর্ঘ সময় লেগে যায়। গত ডিসেম্বর পর্যন্ত ১ হাজার ২৭২টি ডেথ রেফারেন্স শুনানির অপেক্ষায় ছিল। বর্তমানে হাইকোর্টে ২০১৭ ও ২০১৮ সালের মামলাগুলোর শুনানি চলছে। ফলে স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় এ মামলার শুনানি শেষ হতে ৮ থেকে ৯ বছর সময়ও লাগতে পারে।
অ্যাটর্নি জেনারেল কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, শিশু সহিংসতার মামলাগুলো দ্রুত নিষ্পত্তির জন্য পৃথক বেঞ্চ গঠনের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। সেই বেঞ্চেই রামিসা হত্যা মামলার ডেথ রেফারেন্স অগ্রাধিকার ভিত্তিতে শুনানি হতে পারে।
আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান জানিয়েছেন, সব আইনি প্রক্রিয়া দ্রুত সম্পন্ন করা গেলে তিন মাসের মধ্যেই সাজা কার্যকর করা সম্ভব হতে পারে। তিনি বলেন, সাত দিনের মধ্যে ডেথ রেফারেন্স হাইকোর্টে যাবে। এরপর পেপারবুক প্রস্তুত ও শুনানির কাজ সম্পন্ন হবে। সংশ্লিষ্ট বেঞ্চ অগ্রাধিকার দিলে দ্রুত রায় বাস্তবায়ন সম্ভব।
তিনি আরও জানান, অতীতে মেজর সিনহা ও বুয়েট শিক্ষার্থী আবরার ফাহাদ হত্যা মামলার বিচারও বিশেষ উদ্যোগে দ্রুত সম্পন্ন হয়েছিল। রামিসার মামলাসহ শিশু নির্যাতন ও হত্যার অন্যান্য মামলাও দ্রুত নিষ্পত্তির জন্য প্রধান বিচারপতির সঙ্গে আলোচনা হয়েছে।
অ্যাটর্নি জেনারেল ব্যারিস্টার রুহুল কুদ্দুস কাজল বলেছেন, মামলার রায়ের নথি হাতে পাওয়ার পর দ্রুততম সময়ে শুনানির উদ্যোগ নেওয়া হবে। প্রয়োজনে প্রধান বিচারপতির বিশেষ নির্দেশনাও নেওয়া হবে। প্রয়োজনীয় প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে দ্রুত আপিল নিষ্পত্তির সর্বোচ্চ চেষ্টা করা হবে বলেও তিনি আশ্বাস দেন।
বাংলাদেশের ইতিহাসে সবচেয়ে দ্রুত সময়ে বিচারিক আদালতের রায় পাওয়া এই মামলাটি এখন নতুন এক পরীক্ষার মুখে। দ্রুত বিচারের নজির স্থাপনের পর এখন সবার দৃষ্টি উচ্চ আদালতের প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে কত দ্রুত রায় কার্যকর করা যায়, সেদিকেই।
আপনার মতামত লিখুন :