দীর্ঘ ১৬ বছরেরও বেশি সময় ধরে চরম প্রতিকূলতা, জেল-জুলুম এবং রাজনৈতিক সংকটে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) রাজপথের আন্দোলন ও সাংগঠনিক দায়িত্ব অত্যন্ত প্রজ্ঞার সঙ্গে সামলানো মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর রাষ্ট্রপতি মনোনয়ন পাওয়ায় দলের মহাসচিব পদ ছেড়েছেন। একইসঙ্গে তিনি বর্তমান সরকােরর স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব থেকেও আনুষ্ঠানিকভাবে সরে দাঁড়িয়েছেন।
দেশের ২৩তম রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে তাকে প্রার্থী করেছে ক্ষমতাসীন দল বিএনপি। জাতীয় সংসদে বিএনপির নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকায় মির্জা ফখরুলের রাষ্ট্রপতির চেয়ারে বসা এখন কেবল আনুষ্ঠানিকতা ও সময়ের ব্যাপার মাত্র।
কিন্তু মির্জা ফখরুলের এই শীর্ষ সাংবিধানিক পদে আরোহণের পর কে হবে বিএনপির পরবর্তী মহাসচিব, কে সামলাবেন তার ছেড়ে দেওয়া মন্ত্রিত্বের দায়িত্ব— রাজনীতির মাঠ থেকে চায়ের কাপে এখন এটিই আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বিএনপির মতো একটি বৃহৎ ও বর্তমানে ক্ষমতাসীন দলের মহাসচিব পদটি কেবল একটি সাংগঠনিক পদ নয়; এটি সরকার ও দলের মধ্যে সমন্বয় সাধনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সেতু।
ফখরুলের মতো একজন ধীরস্থির, সর্বজনশ্রদ্ধেয় এবং আন্তর্জাতিক মহলে গ্রহণযোগ্য নেতার শূন্যস্থান পূরণ করা দলটির জন্য এক বিশাল চ্যালেঞ্জ। দলের জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী এরই মধ্যে জানিয়েছেন, মহাসচিব নির্বাচনের সম্পূর্ণ দায়িত্ব দলের চেয়ারম্যান ও বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ওপর ন্যস্ত করা হয়েছে।
গঠনতন্ত্র ও উদ্ভূত রাজনৈতিক পরিস্থিতি বিবেচনা করে শিগগিরই নতুন মহাসচিব অথবা ভারপ্রাপ্ত মহাসচিবের নাম ঘোষণা করবেন দলীয় প্রধান।
বৃহস্পতিবার (১৩ আগস্ট) রাষ্ট্রপতি পদে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের মনোনয়নপত্র সিইসির কাছে দাখিলের পর সাংবাদিকরা তার দলীয় ও সরকারি পদে কে আসবেন জানতে চাইলে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায় বলেন, ‘এটার জন্য অপেক্ষা করেন, পরে শুনবেন।’
২০১১ সালে তৎকালীন মহাসচিব খোন্দকার দেলোয়ার হোসেনের মৃত্যুর পর চরম ক্রান্তিকালে বিএনপির হাল ধরেছিলেন মির্জা ফখরুল। প্রথমে ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব এবং পরে ২০১৬ সালের ষষ্ঠ জাতীয় কাউন্সিলে পূর্ণাঙ্গ মহাসচিব হিসেবে দায়িত্ব পান তিনি।
ফখরুলের অনুসারীদের ভাষ্য, ফ্যাসিবাদের দেড় দশকে বিরোধী দলে থাকা অবস্থায় দমন-পীড়ন, হাজারো মামলা এবং দলের শীর্ষ নেতৃত্বের অনুপস্থিতিতে (খালেদা জিয়ার কারাবাস ও তারেক রহমানের নির্বাসন) তিনি একাই দলকে ঐক্যবদ্ধ রেখেছিলেন। তার পরিমিতিবোধ, মার্জিত রাজনৈতিক ভাষা এবং বুদ্ধিবৃত্তিক বক্তব্য শুধু দলের ভেতরেই নয়, রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ ও সুশীল সমাজের কাছেও তাকে এক অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গিয়েছিল।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বর্তমান বাস্তবতা ভিন্ন। বিএনপি এখন আর বিরোধী দল নয়, বরং ক্ষমতাসীন দল। দলটির চেয়ারম্যান তারেক রহমান এখন দেশের প্রধানমন্ত্রী। ফলে নতুন যিনি মহাসচিব হবেন, তাকে বিরোধী দলের মতো শুধু রাজপথে স্লোগান দিলে বা আন্দোলন জমালে চলবে না। তাকে সামলাতে হবে রাষ্ট্র পরিচালনার সঙ্গে দলীয় নেতাকর্মীদের প্রত্যাশার চাপ। ক্ষমতাসীন দলের মহাসচিব হিসেবে আন্তর্জাতিক মহলের সঙ্গে কূটনীতি, সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে দলের সমন্বয় এবং লাখ লাখ নেতা-কর্মীকে সুশৃঙ্খল রাখার এক কঠিন পরীক্ষায় অবতীর্ণ হতে হবে নতুন নেতৃত্বকে।
দলের একাধিক নীতিনির্ধারক, স্থায়ী কমিটির সদস্য এবং রাজনীতির মাঠের বিশ্বস্ত সূত্রে জানা গেছে, ফখরুলের উত্তরসূরি হিসেবে মূলত তিন জ্যেষ্ঠ রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বকে কেন্দ্র করে বিএনপির ভেতরে-বাইরে জোরালো হিসেব-নিকাশ চলছে। তারা হলেন—রুহুল কবির রিজভী, সালাহউদ্দিন আহমদ এবং আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। এই তিন নেতার প্রত্যেকেরই রয়েছে ভিন্ন ভিন্ন রাজনৈতিক ব্যাকগ্রাউন্ড এবং নিজস্ব শক্তির জায়গা।
দীর্ঘদিন ধরে বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন রুহুল কবির রিজভী। বিএনপির দুঃসময়ের ইতিহাসে তার নাম স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে বলে মনে করেন তৃণমূলের নেতা-কর্মীরা। বিশেষ করে বিগত দেড় দশকেরও বেশি সময় ধরে চরম রাজনৈতিক সংকটে, পুলিশের ঘেরাওয়ের মুখেও নয়াপল্টনে দলের কেন্দ্রীয় কার্যালয় পাহারা দেওয়া, নিয়মিত সংবাদ ব্রিফিং করে দলের অবস্থান পরিষ্কার করা এবং কঠিন পরিস্থিতিতেও মাঠের নেতাকর্মীদের উজ্জীবিত রাখার ক্ষেত্রে তার ভূমিকা ছিল অতুলনীয়। তিনি আক্ষরিক অর্থেই ছিলেন ‘নয়াপল্টনের অতন্দ্র প্রহরী’।
বিএনপির জাতীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য এবং বর্তমান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদের নামও মহাসচিব হিসেবে অতি জোরালোভাবে আলোচনায় রয়েছে। সাবেক আমলা (সচিবালয়ের কর্মকর্তা) হিসেবে প্রশাসনিক কাঠামো সম্পর্কে তার রয়েছে গভীর ধারণা। পরবর্তীতে রাজনীতিতে এসেও তিনি নিজের মেধা ও প্রজ্ঞার প্রমাণ দিয়েছেন। ২০১৫ সালে গুম হওয়ার পর দীর্ঘ প্রবাস ও নির্বাসন জীবনেও দলের নীতিনির্ধারণে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছেন।
জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর নির্বাসন কাটিয়ে দেশে ফেরার পর দলের হাইকমান্ডে তার প্রভাব দৃশ্যমান। প্রশাসনিক অভিজ্ঞতা, অন্যান্য রাজনৈতিক দলের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা, ঠান্ডা মাথায় পরিস্থিতি মোকাবিলার ক্ষমতা তাকে এই দৌড়ে অনেকটাই এগিয়ে রাখছে। ক্ষমতাসীন দলের মহাসচিব হিসেবে যে ধরনের ব্যুরোক্রেটিক ও পলিটিক্যাল ব্যালেন্সিং (আমলাতান্ত্রিক ও রাজনৈতিক ভারসাম্য) প্রয়োজন, সালাহউদ্দিন আহমদের তা শতভাগ রয়েছে।
সালাহউদ্দিন আহমদ বর্তমানে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে রয়েছেন। একটি দেশের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষার মতো বিশাল দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি একই সঙ্গে দলের শীর্ষ সাংগঠনিক পদ (মহাসচিব) তিনি সামলাবেন কি না, তা নিয়ে একধরনের সমীকরণ মেলাচ্ছে দল। অতীতে বিভিন্ন দলে এমন নজির থাকলেও, বর্তমান বাস্তবতায় এক ব্যক্তির কাঁধে এত বড় দুটি দায়িত্ব তুলে দেওয়া হলে কোনো একটির কাজে ব্যাঘাত ঘটতে পারে বলে কেউ কেউ মনে করছেন।
চট্টগ্রামের বর্ষীয়ান রাজনীতিবিদ এবং বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী দীর্ঘদিন ধরে দলের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিষয়ক কাজের মূল সমন্বয়ক হিসেবে অবিচল ভূমিকা রাখছেন। সাবেক বাণিজ্যমন্ত্রী হিসেবে অর্থনীতি ও রাজনীতির সংযোগস্থলে তার বিশেষ দখল রয়েছে।
বিরোধী দলে থাকা অবস্থায় সমমনা দলগুলোর সঙ্গে জোটবদ্ধ আন্দোলন গড়ে তোলা এবং বিদেশি কূটনীতিক, দূতাবাস ও পরাশক্তিগুলোর সঙ্গে লিয়াজোঁ রক্ষায় তিনি কেন্দ্রীয় ভূমিকা পালন করেছেন। বিশেষ করে পশ্চিমা বিশ্বের কাছে বিএনপির গণতান্ত্রিক ভাবমূর্তি তুলে ধরার ক্ষেত্রে তার অবদান অনস্বীকার্য। বিএনপি যেহেতু এখন সরকার গঠন করেছে, তাই আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নিজেদের অবস্থান আরও সুদৃঢ় করা, বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণ এবং ভূ-রাজনৈতিক ভারসাম্য রক্ষার কৌশল গ্রহণ করতে হলে আমির খসরুই হতে পারেন সবচেয়ে উপযুক্ত পছন্দ। তার পরিশীলিত আচরণ ও বাগ্মিতা দলের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করবে।
আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর প্রধান দুর্বলতা হিসেবে তৃণমূলের সরাসরি সাংগঠনিক কর্মসূচির সঙ্গে তার দূরত্বের বিষয়টি সামনে আসে। তিনি মূলত নীতিনির্ধারণী ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনেই বেশি বিচরণ করেন। মহাসচিব পদটি মূলত একটি হার্ডকোর সাংগঠনিক পদ, যেখানে দেশের প্রতিটি জেলার থানা-ওয়ার্ড পর্যায়ের নেতাদের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ রাখতে হয়। এই তৃণমূল ব্যবস্থাপনার সঙ্গে তার কাজের ধরন কতটা খাপ খাবে—দলের ভেতরে সেই প্রশ্নও জোরেশোরে উচ্চারিত হচ্ছে।
সাংগঠনিক পথরেখা: পূর্ণাঙ্গ নাকি ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব?
বিএনপির গঠনতন্ত্র এবং ইতিহাস বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, দলের শীর্ষ পদে হঠাৎ শূন্যতা সৃষ্টি হলে তাৎক্ষণিকভাবে পূর্ণাঙ্গ কাউকে নিয়োগ দেওয়ার নজির কম। বিএনপির নীতিনির্ধারণী সূত্রের খবর অনুযায়ী, দলটির জাতীয় কাউন্সিলের আগে তড়িঘড়ি করে পূর্ণাঙ্গ মহাসচিব ঘোষণার চেয়ে আপাতত ‘ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব’ হিসেবে কাউকে দায়িত্ব দেওয়ার সম্ভাবনাই বেশি।
ইতিহাস ঘাঁটলে দেখা যায়, ২০১১ সালে তৎকালীন মহাসচিব খন্দকার দেলোয়ার হোসেনের মৃত্যুর পর মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরকেও প্রথমে ‘ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব’ করা হয়েছিল। দীর্ঘ পাঁচ বছর তিনি এই ভারপ্রাপ্ত পদেই দায়িত্ব পালন করেন। পরবর্তীতে দলের সর্বস্তরে নিজেকে প্রমাণ করার পর ২০১৬ সালের ষষ্ঠ জাতীয় কাউন্সিলে তিনি পূর্ণাঙ্গ মহাসচিব হিসেবে অনুমোদন পান।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, বিএনপি এবারও সেই পুরনো এবং পরীক্ষিত পথ অনুসরণ করতে পারে। কারণ সরাসরি পূর্ণাঙ্গ মহাসচিব নিয়োগ দিলে দলের অন্য জ্যেষ্ঠ নেতাদের মধ্যে একধরনের মনস্তাত্ত্বিক দূরত্ব তৈরি হতে পারে। ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব নিয়োগের মাধ্যমে দলীয় প্রধান তারেক রহমান মূলত নতুন নেতাকে একটি ‘টেস্টিং পিরিয়ড’ বা পরীক্ষামূলক সময় দিতে পারেন, যেখানে তিনি সরকার ও দলের মধ্যে সমন্বয়ের সক্ষমতা প্রমাণ করবেন।
সিদ্ধান্তের কেন্দ্রবিন্দু: তারেক রহমানের চূড়ান্ত বার্তা
বিএনপির নীতি-নির্ধারকদের মতে, মহাসচিব কেবল একটি আলংকারিক পদ নয়— তিনি হচ্ছেন দলের চেয়ারম্যানের মূল সমন্বয়কারী বা এক্সিকিউটিভ অফিসার। বিশেষ করে বিএনপি যেহেতু এখন রাষ্ট্র ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত। তাই সরকার ও দলের মধ্যকার ক্ষমতার সামঞ্জস্য রক্ষা করা অত্যন্ত সংবেদনশীল ও স্পর্শকাতর কাজ।
সব জল্পনা-কল্পনা, সমীকরণ এবং হিসেব-নিকাশ বিশ্লেষণ করে এখন পুরো দেশ ও দলের নেতাকর্মীদের দৃষ্টি নিবদ্ধ দলের চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সিদ্ধান্তের দিকে। তিনি তার রাজনৈতিক প্রজ্ঞা ও দূরদর্শিতা দিয়ে কাকে বেছে নেন, সেটাই এখন দেখার বিষয়।
মহাসচিবের পদত্যাগের পর পরবর্তী প্রক্রিয়া কেমন হবে— এমন প্রশ্নের জবাবে বিএনপির ভাইস-চেয়ারম্যান শামসুজ্জামান দুদু বলেন, “যেহেতু তিনি (মহাসচিব) পদত্যাগ করে চলে গেছেন এবং এই মুহূর্তে দলের কোনো কাউন্সিল হচ্ছে না, তাই একজন ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব দায়িত্ব গ্রহণ করবেন। তার (সাবেক মহাসচিবের) পরে জ্যেষ্ঠতার ভিত্তিতে যিনি আছেন অথবা অন্য কোনো নেতা— অর্থাৎ একজন ভারপ্রাপ্ত হিসেবে দায়িত্ব পাবেন।”
দলীয় গঠনতন্ত্রের নিয়ম উল্লেখ করে বিএনপির এই ভাইস চেয়ারম্যান আরও বলেন, “আমাদের দলের গঠনতন্ত্র অনুযায়ী সাধারণত পার্টির চেয়ারপারসনই মহাসচিব মনোনীত করেন। পরবর্তীতে সেটি কাউন্সিলে অনুমোদন করিয়ে নেওয়া হয়। কিন্তু যেহেতু এখন কাউন্সিল হচ্ছে না, সেই হিসেবে চেয়ারম্যান যাকে মনোনীত করবেন, তিনিই আগামী কাউন্সিল হওয়া পর্যন্ত মহাসচিবের দায়িত্ব পালন করবেন।”

আপনার মতামত লিখুন :