প্রকৃতির কাছে ঋণ শোধের এক জীবন

নিউজ ডেস্ক , প্রতিদিনের কাগজ

প্রকাশিত: ০১ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ০৯:৪৬ পিএম

প্রকৃতির কাছে ঋণ শোধের এক জীবন

ফাইল ফটো

স্বাধীন চৌধুরী , কবি ও সাংবাদিক 

মুক্তিযুদ্ধের প্রজন্ম থেকে পরিবেশ সংরক্ষণের দীর্ঘ অভিযাত্রা—ব্যবসা ও গণমাধ্যমের শক্তিকে কাজে লাগিয়ে বাংলাদেশের প্রকৃতি, জীববৈচিত্র্য ও পরিবেশ সচেতনতার জন্য কয়েক দশক ধরে কাজ করে চলেছেন মুকিত মজুমদার বাবু। ২০২৬ সালের স্বাধীনতা পুরস্কার তাঁর সেই দীর্ঘ কর্মযাত্রার রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি। একজন মানুষ জীবনে কতবার স্বাধীনতার অর্থ নতুন করে আবিষ্কার করতে পারেন?

মুকিত মজুমদার বাবুর জীবনের দিকে তাকালে প্রশ্নের ব্যতিক্রমী উত্তর পাওয়া যায়। ১৯৭১ সালে তিনি লড়েছেন একটি স্বাধীন দেশের জন্য। আর স্বাধীনতার পরের পাঁচ দশকে তাঁর আরেকটি লড়াই—সেই দেশের মাটি, পানি, বন, পাখি ও বন্যপ্রাণীকে বাঁচিয়ে রাখার।

একটি যুদ্ধ ছিল অস্ত্র হাতে। অন্যটি ক্যামেরা, কলম, সংগঠন ও জনসচেতনতার শক্তিতে।প্রথম লড়াই এনে দিয়েছে স্বাধীন বাংলাদেশ। দ্বিতীয় লড়াই তাঁকে নিয়ে গেছে বাংলাদেশের প্রকৃতির আরও গভীরে—সুন্দরবনের বাঘ থেকে হাওরের পাখি, পাহাড়ের বন থেকে নদীর জীবন, বিপন্ন প্রাণী থেকে একটি চারাগাছ পর্যন্ত।

ব্যবসায়ী হিসেবে তিনি প্রতিষ্ঠান গড়েছেন। গণমাধ্যম-উদ্যোক্তা হিসেবে মানুষের কাছে পৌঁছানোর শক্তি পেয়েছেন। কিন্তু সেই শক্তির একটি বড় অংশ তিনি ব্যয় করেছেন এমন এক বিষয়ের জন্য, যার কোনো ভোট নেই, কোনো দাবি জানানোর ভাষা নেই—প্রকৃতি।

এখানেই মুকিত মজুমদার বাবুর গল্প অন্যরকম।

চ্যানেল আইয়ের পর্দায় ‘প্রকৃতি ও জীবন’ দিয়ে তিনি বাংলাদেশের প্রকৃতিকে ঘরে ঘরে পৌঁছে দিয়েছেন। প্রকৃতি ও জীবন ফাউন্ডেশনের মাধ্যমে সচেতনতার সঙ্গে যুক্ত করেছেন বৃক্ষরোপণ, জীববৈচিত্র্য ও বন্যপ্রাণী সংরক্ষণের মতো বাস্তব উদ্যোগ। আজ তাঁর জীবনের সেই দীর্ঘ অভিযাত্রার সামনে দাঁড়িয়ে আছে আরেকটি মাইলফলক—২০২৬ সালের স্বাধীনতা পুরস্কার। এ যেন এক বৃত্তের পূর্ণতা।

যে মানুষটি একদিন দেশের স্বাধীনতার জন্য লড়েছিলেন, জীবনের পরবর্তী অধ্যায়ে তিনি লড়েছেন সেই স্বাধীন দেশের প্রকৃতিকে বাঁচিয়ে রাখার জন্য। আর তাই মুকিত মজুমদার বাবুর গল্প কেবল একজন ব্যবসায়ী, গণমাধ্যম-উদ্যোক্তা কিংবা পরিবেশকর্মীর জীবনী নয়। এ যেন একজন মানুষের দেশকে ভালোবাসার সংজ্ঞা ধীরে ধীরে বিস্তৃত হয়ে ওঠার গল্প।

স্বাধীনতা থেকে প্রকৃতি—এই দীর্ঘ পথের শেষে এসে প্রশ্নটি আবারও ফিরে আসেঃ

দেশকে ভালোবাসা কি শুধু তার মানুষের জন্য? নাকি তার নদী, বন, পাখি, প্রাণী আর আগামী প্রজন্মের জন্যও?

মুকিত মজুমদার বাবুর জীবন সেই প্রশ্নেরই এক দীর্ঘ উত্তর।

মুক্তিযুদ্ধের প্রজন্ম

মুকিত মজুমদার বাবুর জীবনের শুরুতেই রয়েছে বাংলাদেশের ইতিহাসের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়—মুক্তিযুদ্ধ। ১৯৭১ সালে তিনি মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন। তাঁর প্রজন্মের তরুণদের কাছে স্বাধীনতা ছিল শুধু একটি রাজনৈতিক আকাঙ্ক্ষা নয়; ছিল একটি নতুন দেশের স্বপ্ন এবং তার জন্য আত্মত্যাগের প্রস্তুতি।

স্বাধীনতার পর তিনি পড়াশোনা চালিয়ে যান। নটর ডেম কলেজে শিক্ষাজীবন শেষে ১৯৭৮ সালে উচ্চশিক্ষার জন্য বিদেশে যান। যুক্তরাজ্য ও যুক্তরাষ্ট্রে পড়াশোনা শেষে ১৯৮৪ সালে দেশে ফিরে আসেন।

দেশে ফিরে শুরু হয় তাঁর কর্মজীবনের মূল পর্ব। ব্যবসায় যুক্ত হয়ে ধীরে ধীরে তিনি ইমপ্রেস গ্রুপের সঙ্গে তাঁর দীর্ঘ কর্মসম্পর্ক গড়ে তোলেন।মুক্তিযুদ্ধের অভিজ্ঞতা তাঁর প্রজন্মের মানুষের চিন্তা ও জীবনদর্শনে যে দেশপ্রেম ও দায়বোধ তৈরি করেছিল, তাঁর পরবর্তী কর্মযাত্রায় তার সামাজিক প্রতিফলন খুঁজে পাওয়া যায়।

ব্যবসা থেকে গণমাধ্যম

মুকিত মজুমদার বাবু ইমপ্রেস গ্রুপের প্রতিষ্ঠাতা পরিচালক হিসেবে ব্যবসায়িক অঙ্গনে প্রতিষ্ঠিত হন। পরবর্তীতে গণমাধ্যমেও তাঁর ভূমিকা বিস্তৃত হয়।

ইমপ্রেস গ্রুপের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ চ্যানেল আই। ১৯৯৯ সালে যাত্রা শুরু করা এই টেলিভিশন চ্যানেল বাংলাদেশের বেসরকারি সম্প্রচারমাধ্যমে একটি গুরুত্বপূর্ণ অবস্থান তৈরি করে।

মুকিত মজুমদার বাবু চ্যানেল আইয়ের পরিচালক হিসেবে যুক্ত আছেন। তবে তাঁর কাছে গণমাধ্যম কেবল ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান নয়—জনসচেতনতা তৈরিরও শক্তিশালী মাধ্যম। এই ভাবনা থেকেই পরিবেশকে তিনি টেলিভিশনের একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হিসেবে সামনে আনেন।

‘প্রকৃতি ও জীবন': পর্দায় বাংলাদেশের প্রকৃতি

মুকিত মজুমদার বাবুর পরিবেশকর্মের সবচেয়ে দৃশ্যমান অধ্যায় ‘প্রকৃতি ও জীবন’। ২০০৮ সালে প্রকৃতি ও পরিবেশবিষয়ক একটি অনুষ্ঠান করার পরিকল্পনা থেকে উদ্যোগটির সূচনা। এরপর ৩ ডিসেম্বর ২০০৯ প্রতিষ্ঠিত হয় প্রকৃতি ও জীবন ফাউন্ডেশন এবং ১ আগস্ট ২০১০ চ্যানেল আইয়ে শুরু হয় ‘প্রকৃতি ও জীবন’ ধারাবাহিক অনুষ্ঠান। এর লক্ষ্য ছিল বাংলাদেশের প্রকৃতি, জীববৈচিত্র্য ও পরিবেশকে তথ্যভিত্তিক ও শিক্ষামূলকভাবে সাধারণ মানুষের সামনে তুলে ধরা।

বন, পাহাড়, নদী, জলাভূমি, সমুদ্র, পাখি, উদ্ভিদ ও বন্যপ্রাণীর পাশাপাশি উঠে এসেছে পরিবেশ দূষণ, বন উজাড়, আবাসস্থল ধ্বংস ও জলবায়ু পরিবর্তনের মতো বিষয়। ২০২৬ সালে চ্যানেল আইয়ের প্রকাশিত তথ্যে অনুষ্ঠানটির চার শতাধিক পর্ব প্রচারের কথা বলা হয়েছে।

একটি টেলিভিশন অনুষ্ঠানের ক্ষেত্রে এত দীর্ঘ ধারাবাহিকতা নিজেই এক বৃহত্তম অর্জন। এর মাধ্যমে বাংলাদেশের প্রকৃতিকে নথিবদ্ধ করার পাশাপাশি দর্শকের প্রকৃতি-দৃষ্টিও বদলানোর চেষ্টা হয়েছে। প্রকৃতি এখানে আর দূরের কোনো দৃশ্য নয়; হয়ে উঠেছে মানুষের জীবন ও ভবিষ্যতের অংশ।

প্রকৃতি ও জীবন ফাউন্ডেশন : সচেতনতা থেকে সংরক্ষণ

প্রকৃতি ও জীবন ফাউন্ডেশন মুকিত মজুমদার বাবুর পরিবেশ ভাবনাকে প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো দেয়। ফাউন্ডেশনের কর্মকাণ্ডের প্রধান ক্ষেত্রগুলোর মধ্যে রয়েছে— বৃক্ষরোপণ ও সবুজায়ন, বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ, পাখি সংরক্ষণ ও পাখিশুমারি, জীববৈচিত্র্য নিয়ে গবেষণা, বিপন্ন প্রজাতি সংরক্ষণ, পরিবেশ শিক্ষা, প্রকৃতি ও জীবন ক্লাব, প্রকৃতিমেলা ও সচেতনতামূলক কার্যক্রম এবং পরিবেশবিষয়ক প্রকাশনা ও প্রচার।

বন্যপ্রাণী অবমুক্তকরণ, শকুন সংরক্ষণ, শিকারি পাখি নিয়ে কাজ এবং বিপন্ন প্রাণী রক্ষার বিভিন্ন উদ্যোগও এর কর্মকাণ্ডের অংশ। এর মধ্যে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য বাটাগুর বাসকা বা বড় কাইট্টা কাছিম সংরক্ষণ-সংক্রান্ত উদ্যোগ। একটি প্রজাতি রক্ষা মানে শুধু একটি প্রাণীকে বাঁচানো নয়; একটি বাস্তুতন্ত্রের ভারসাম্য রক্ষারও চেষ্টা।

প্রকৃতি ও জীবন ক্লাব

পরিবেশ সংরক্ষণের দীর্ঘমেয়াদি ভিত্তি তৈরি হয় সচেতন প্রজন্মের মাধ্যমে। এই ভাবনা থেকেই বিভিন্ন পর্যায়ে প্রকৃতি ও জীবন ক্লাব গড়ে তোলা হয়েছে। শিক্ষার্থী ও তরুণদের বৃক্ষরোপণ, পাখি ও বন্যপ্রাণী সম্পর্কে জানানো এবং স্থানীয় পরিবেশ রক্ষায় সম্পৃক্ত করা এর অন্যতম উদ্দেশ্য। একটি শিশুর হাতে একটি চারা তুলে দেওয়া কিংবা তাকে একটি পাখির জীবন সম্পর্কে জানানো হয়তো ছোট উদ্যোগ। কিন্তু পরিবেশ আন্দোলনের সামাজিক ভিত্তি তৈরি হয় এমন ছোট ছোট কাজ থেকেই।

বৃক্ষরোপণ : ভবিষ্যতের জন্য বিনিয়োগ

বৃক্ষরোপণ মুকিত মজুমদার বাবুর পরিবেশকর্মের এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। বিভিন্ন সময়ে চারা বিতরণ ও বৃক্ষরোপণ কর্মসূচির পাশাপাশি মানুষকে বাড়ির আঙিনা ও স্থানীয় পরিসরে গাছ লাগাতে উৎসাহিত করা হয়েছে।

গাছ লাগানোর তাৎপর্য কেবল সংখ্যায় নয়। একটি গাছ বেড়ে ওঠে ধীরে; তার ছায়া, অক্সিজেন, জীববৈচিত্র্যের আশ্রয় এবং পরিবেশগত সুফল পাওয়া যায় দীর্ঘ সময়ে। অর্থাৎ বৃক্ষরোপণ মূলত ভবিষ্যতের জন্য একটি বিনিয়োগ।

মানুষ ও প্রকৃতি : একই বাস্তবতা

মুকিত মজুমদার বাবুর কর্মকাণ্ড শুধু পরিবেশে সীমাবদ্ধ নয়। দুঃস্থ মানুষের সহায়তা, শীতবস্ত্র বিতরণ, বন্যার্তদের ত্রাণ, করোনাকালে চিকিৎসাসামগ্রী এবং প্রত্যন্ত অঞ্চলে স্বাস্থ্যসেবার উদ্যোগের সঙ্গেও তাঁর প্রতিষ্ঠান যুক্ত হয়েছে।

প্রকৃতি ও জীবন স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রের মাধ্যমে প্রত্যন্ত অঞ্চলের মানুষের জন্য চিকিৎসা ও ওষুধ দেওয়ার কার্যক্রম পরিচালিত হয়েছে। এখানে তাঁর কাজের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক স্পষ্ট—মানুষকে প্রকৃতি থেকে কখনো আলাদা করে দেখা হয় নি।

দূষিত নদী যেমন জলজ প্রাণীর ক্ষতি করে, তেমনি নদীনির্ভর মানুষের জীবন-জীবিকাও বিপন্ন করে। বন উজাড় যেমন প্রাণীর আবাসস্থল ধ্বংস করে, তেমনি স্থানীয় মানুষের জীবনেও তার প্রভাব পড়ে।

পরিবেশ তাই শেষ পর্যন্ত মানুষেরই জীবন-প্রশ্ন।

লেখক মুকিত মজুমদার বাবু

প্রকৃতির প্রতি তাঁর দায়বোধ লেখালেখিতেও প্রতিফলিত হয়েছে।উপলভ্য জীবনীমূলক সূত্রে তাঁর উল্লেখযোগ্য বইয়ের মধ্যে রয়েছে— ‘আমার অনেক ঋণ আছে’, ‘আমার দেশ আমার প্রকৃতি’, ‘আমার রূপসী বাংলা’, ‘সবুজ আমার ভালোবাসা’, ‘স্বপ্নের প্রকৃতি’, ‘সবুজে সাজাই আমার বাংলাদেশ’ এবং ‘হৃদয়ে সবুজ বাংলা’।

প্রকৃতিবিষয়ক সংকলন ‘প্রকৃতিকথা’ সম্পাদনার সঙ্গেও তিনি যুক্ত ছিলেন। এ ছাড়া প্রকৃতিবিষয়ক ত্রৈমাসিক ‘প্রকৃতিবার্তা’-র সম্পাদকমণ্ডলীর সভাপতির দায়িত্ব পালন করেছেন।তাঁর বইয়ের নামগুলোতেই তাঁর চিন্তার মানচিত্র ফুটে ওঠে—দেশ, প্রকৃতি, সবুজ, স্বপ্ন এবং মানুষের সঙ্গে প্রকৃতির সম্পর্ক।

পরিবার ও সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডল

মুকিত মজুমদার বাবুর ব্যক্তিজীবনের সঙ্গে বাংলাদেশের সাহিত্য ও সংস্কৃতির ঘনিষ্ঠ যোগ রয়েছে। তাঁর স্ত্রী কেকা ফেরদৌসী দেশের পরিচিত রন্ধনশিল্পী ও টেলিভিশন ব্যক্তিত্ব। কেকা ফেরদৌসীর মা ছিলেন কথাসাহিত্যিক রাবেয়া খাতুন এবং বাবা চলচ্চিত্র সাংবাদিক ও পরিচালক ফজলুল হক। ফলে তাঁর পারিবারিক পরিমণ্ডরের সঙ্গে বাংলাদেশের সাহিত্য, চলচ্চিত্র, টেলিভিশন ও সংস্কৃতির একটি গুরুত্বপূর্ণ ধারার যোগাযোগ রয়েছে।

পুরস্কার ও স্বীকৃতি

পরিবেশ ও প্রকৃতি সংরক্ষণে তাঁর দীর্ঘ কর্মযাত্রা বিভিন্ন জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পুরস্কারে স্বীকৃত হয়েছে।

উল্লেখযোগ্য সম্মাননার মধ্যে রয়েছে— জাতীয় পরিবেশ পদক—২০১২; HSBC–The Daily Star Climate Award—২০১২; বঙ্গবন্ধু অ্যাওয়ার্ড ফর ওয়াইল্ডলাইফ কনজারভেশন—২০১৩; Business Excellence Award, Singapore—২০১৪; জাতীয় পরিবেশ পদক—২০১৫; ঢাকা আহছানিয়া মিশন চাঁদ সুলতানা পুরস্কার—২০১৫; FOBANA Award—২০১৬; পল্লীমা গ্রিন স্বর্ণপদক—২০১৭; A Friend of Nature—২০২১ এবং Mark Angelo River Award—২০২৪। এসব স্বীকৃতির কিছু তাঁর ব্যক্তিগত কর্মকাণ্ডের সঙ্গে, আবার কিছু তাঁর প্রতিষ্ঠানভিত্তিক উদ্যোগের সঙ্গে সম্পর্কিত। তাই প্রতিটি পুরস্কারের প্রকৃতি ও প্রাপক হিসেবে তাঁর বা প্রতিষ্ঠানের ভূমিকা পৃথকভাবে বিবেচনা করা প্রয়োজন।

২০২৬ : স্বাধীনতা পুরস্কার

মুকিত মজুমদার বাবুর কর্মজীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি এসেছে ২০২৬ সালে।

পরিবেশ সংরক্ষণে অবদানের জন্য তাঁকে স্বাধীনতা পুরস্কার ২০২৬-এর জন্য নির্বাচিত করা হয়।

৫ মার্চ ২০২৬ ঘোষণার পর ১৬ এপ্রিল রাজধানীর ওসমানী স্মৃতি মিলনায়তনে আয়োজিত অনুষ্ঠানে তিনি প্রধানমন্ত্রীর কাছ থেকে পুরস্কার গ্রহণ করেন। স্বাধীনতা পুরস্কার তাঁর জীবনের জন্য বিশেষ তাৎপর্য বহন করে। কারণ তাঁর জীবনের সঙ্গে একদিকে রয়েছে ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ, অন্যদিকে স্বাধীন বাংলাদেশের পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য রক্ষায় কয়েক দশকের কর্মযাত্রা।

দুটি সময় যেন একটি জীবনে এসে মিলেছে—

১৯৭১ : স্বাধীনতার জন্য সংগ্রাম।

২০২৬ : স্বাধীন দেশের প্রকৃতি রক্ষার কাজের স্বীকৃতি।

প্রকৃতির কাছে ঋণ

মুকিত মজুমদার বাবুর একটি বইয়ের না—‘আমার অনেক ঋণ আছে’। এই নামটি তাঁর পরিবেশ ভাবনার একটি প্রতীকী ব্যাখ্যাও হয়ে উঠতে পারে।

প্রকৃতির কাছে মানুষের ঋণ অসীম। মাটি খাদ্য দেয়, নদী পানি ও জীবিকা দেয়, বন আশ্রয় ও পরিবেশগত ভারসাম্য দেয়। পাখি, কীটপতঙ্গ ও অগণিত প্রাণী মিলে গড়ে তোলে জীবনের জটিল ভারসাম্য।

কিন্তু মানুষের উন্নয়ন প্রকৃতির ওপর চাপও বাড়িয়েছে। বন কমেছে। জলাভূমি হারিয়েছে। নদী দূষিত হয়েছে। অনেক প্রাণী বিপন্ন হয়েছে। এই বাস্তবতায় পরিবেশ রক্ষা মানে মূলত ভবিষ্যতের জন্য কাজ করা।

মুকিত মজুমদার বাবুর কাজের মূল্যায়ন তাই শুধু পুরস্কারের সংখ্যা দিয়ে করা যায় না। গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো—তিনি কত মানুষের সামনে প্রকৃতির নতুন পরিচয় তুলে ধরতে পেরেছেন এবং কতজনকে প্রকৃতি রক্ষার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করাতে পেরেছেন।

স্বাধীনতার পরে আরেক দায়িত্ব

১৯৭১ সালে স্বাধীনতা অর্জন ছিল একটি জাতির অস্তিত্বের প্রশ্ন। আজ স্বাধীনতার পাঁচ দশকের বেশি সময় পরে বাংলাদেশের সামনে আরেকটি প্রশ্ন—এই দেশকে আমরা ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য কেমন রেখে যাব?নদী থাকবে কি? বন থাকবে কি? পাখি ও বন্যপ্রাণী থাকবে কি? শিশুরা কি নির্মল আকাশ ও জীবন্ত জলাভূমি দেখতে পাবে?

এই প্রশ্নগুলো এখন শুধু পরিবেশবিদদের নয়। রাষ্ট্র, সমাজ এবং প্রতিটি নাগরিকের। মুকিত মজুমদার বাবুর দীর্ঘ কর্মযাত্রা সেই প্রশ্নের উত্তর খোঁজার একটি প্রচেষ্টা।

ব্যবসা তাঁকে দিয়েছে প্রতিষ্ঠান গড়ার সামর্থ্য। গণমাধ্যম দিয়েছে মানুষের কাছে পৌঁছানোর শক্তি। আর প্রকৃতির প্রতি দায়বোধ সেই শক্তিকে দিয়েছে একটি নির্দিষ্ট সামাজিক অভিমুখ। সেখানেই তাঁর কাজের স্বাতন্ত্র্য।

শেষ কথা

একজন মানুষের জীবনকে তার পদবি দিয়ে চেনা যায়, কিন্তু তার মূল্যায়ন করতে হয় তার কাজ দিয়ে। মুকিত মজুমদার বাবু ব্যবসা করেছেন, প্রতিষ্ঠান গড়েছেন, গণমাধ্যমে কাজ করেছেন, লিখেছেন। কিন্তু তাঁর সবচেয়ে স্বতন্ত্র পরিচয় তৈরি হয়েছে প্রকৃতির পাশে দাঁড়ানোর মধ্য দিয়ে।

মুক্তিযুদ্ধের প্রজন্মের একজন মানুষ হিসেবে তিনি স্বাধীনতার জন্য লড়েছেন। পরবর্তী জীবনে তাঁর কর্মের একটি বড় অংশ নিবেদিত হয়েছে সেই স্বাধীন দেশের প্রকৃতি ও জীববৈচিত্র্য রক্ষায়।

২০২৬ সালের স্বাধীনতা পুরস্কার সেই দীর্ঘ কর্মযাত্রার রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি। তবে পরিবেশের কাজ কোনো পদকে শেষ হয় না।

একটি গাছ বেড়ে ওঠে বছরের পর বছর। একটি বন টিকে থাকে প্রজন্মের পর প্রজন্ম। নদী তার প্রবাহ ধরে রাখে সভ্যতার স্মৃতি। পাখি ফিরে আসে তার পুরোনো আবাসে—যদি আমরা সেই আবাসটুকু বাঁচিয়ে রাখতে পারি।

তাই মুকিত মজুমদার বাবুর জীবনকে শুধু একজন পরিবেশকর্মীর জীবনী হিসেবে দেখলে তার একটি দিকই দেখা হবে। কিন্তু এর ভেতরে আছে এক বড় বিশ্বাস— দেশকে ভালোবাসা মানে শুধু তার ইতিহাসকে ভালোবাসা নয়; তার মাটি, পানি, বন, প্রাণবৈচিত্র্য ও ভবিষ্যৎকেও রক্ষা করা।

প্রকৃতির কাছে মানুষের ঋণ কখনো পুরোপুরি শোধ হয় না।

তবু কেউ কেউ সেই ঋণ শোধের চেষ্টা করে যান।

মুকিত মজুমদার বাবুর দীর্ঘ জীবন ও কর্মযাত্রা সেই চেষ্টারই এক দৃশ্যমান দলিল।

 

 

 

Link copied!