খাসকামরায় পুলিশ কর্মকর্তাকে ডেকে নিয়ে মারধরের ঘটনায় ঢাকার অতিরিক্ত মহানগর দায়রা জজ আদালত-১০-এর বিচারক শাহিদুল ইসলামের ব্যাখ্যা চেয়ে শোকজ করেছে আইন মন্ত্রণালয়।
বুধবার (২ সেপ্টেম্বর) মারধরের ঘটনার বিচার চেয়ে সংসদ ভবনে বাংলাদেশ পুলিশ এসোসিয়েশনের সভাপতি কামরুল হাসান তালুকদার, সাধারণ সম্পাদক মনিরুল ইসলাম ডাবলুসহ পুলিশের ১২ সদস্যের একটি প্রতিনিধি দল আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামানের সাথে সাক্ষাৎ করেন। এসময় ভুক্তোভুগী পুলিশ কর্মকর্তা ঢাকা রেলওয়ে থানার উপপরিদর্শক (এসআই) মোহাম্মদ আলীও উপস্থিত ছিলেন। ঘটনার বর্ণনা দিয়ে বিচারক শাহিদুল ইসলামের বিচার চান তারা। আইনমন্ত্রী এসময় মনোযোগ সহকারে শোনেন ও বিভাগীয় তদন্তের মাধ্যমে ঘটনার সুষ্ঠু বিচারের আশ্বাস দেন বলে পুলিশ সূত্রে জানিয়েছে।
এদিকে আইন মন্ত্রণালয় সূত্র জানিয়েছে, বুধবারই ওই বিচারককে কারণ দর্শানোর নোটিশ (শোকজ) দেয়া হয়েছে। সেই নোটিশে উল্লেখ করা হয়েছে, অসদাচারণ ও শৃঙ্খলা ভঙ্গের দায়ে কেন আপনার (ওই বিচারক) বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেয়া হবে না, তা ৭ দিনের মধ্যে জবাব দিতে বলা হলো।
সাক্ষাৎ শেষে বাংলাদেশ পুলিশ এসোসিয়েশন জানিয়েছেন, ‘বাংলাদেশ পুলিশ অ্যাসোসিয়েশনের নেতৃবৃন্দ ঢাকা রেলওয়ে পুলিশে কর্মরত এসআই মোহাম্মদ আলীকে সঙ্গে নিয়ে জাতীয় সংসদ ভবনে আইন ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রী মহোদয়ের কার্যালয়ে সৌজন্য সাক্ষাৎ করেন। সাক্ষাৎকালে এসআই মোহাম্মদ আলীর সঙ্গে ঘটে যাওয়া অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনার বিষয়টি মাননীয় মন্ত্রী মহোদয়কে বিস্তারিতভাবে অবগত করা হয়।’
পুলিশ এসোসিয়েশন আরোও জানায়, ‘এ সময় মাননীয় মন্ত্রী মহোদয় বিষয়টি তদন্তপূর্বক প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করবেন বলে বাংলাদেশ পুলিশ অ্যাসোসিয়েশনের নেতৃবৃন্দকে আশ্বস্ত করেন। বাংলাদেশ পুলিশ অ্যাসোসিয়েশন আশা করে, বিষয়টি যথাযথ তদন্তের মাধ্যমে ন্যায়সঙ্গত ও প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।’
গত মঙ্গলবার বিচারকের খাসকামরায় পুলিশ কর্মকর্তাকে ডেকে মারধরের এ চাঞ্চল্যকর এ ঘটনা ঘটে। বিষয়টি বিচারাঙ্গণ ও পুলিশ প্রশাসনের মধ্যে ব্যাপক সমালোচনা দেখা যায়। ঢাকা আইনজীবী সমিতির কাছে লিখিত অভিযোগ ও ওই পুলিশ কর্মকর্তার ভাষ্য অনুসারে, গত ২৯ আগস্ট নারায়ণগঞ্জ ও পদ্মা সেতুগামী শহরতলী রেলওয়ে প্ল্যাটফর্মে দায়িত্ব পালন করছিলেন এসআই মোহাম্মদ আলী। এ সময় নিরাপত্তা তল্লাশির অংশ হিসেবে বিচারক শাহিদুল ইসলামের অফিস সহকারী (পিয়ন) সাকিব আল হাসানের (২৯) ব্যাগ তল্লাশি করতে চান তিনি।
তবে সাকিব এতে বাধা দেন সাকিব। ব্যাগ তল্লাশি করতে বাধা দেওয়ার পাশাপাশি সাকিব আল হাসান দায়িত্ব পালনরত পুলিশ সদস্যদের সঙ্গে অসৌজন্যমূলক আচরণ করেন। একপর্যায়ে তিনি প্রকাশ্যে পুলিশ সদস্যদের উদ্দেশ্যে ‘আপনাদের চেকিং করার কোনো অধিকার নেই’ বলে প্রতিবাদ করেন এবং নিরাপত্তাজনিত তল্লাশি কার্যক্রমে বাধা দেন। এতে সেখানে উপস্থিত শত শত যাত্রীর সামনে পুলিশকে নিয়ে নানা ধরনের বিরূপ মন্তব্য করেন।
পরে দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলার জন্য সাকিবকে থানায় নিয়ে আসা হয়। সেখানে প্রথমে নিজের পরিচয় না দিলেও পরে তিনি নিজেকে অতিরিক্ত মহানগর দায়রা জজ আদালত-১০-এর পিয়ন হিসেবে পরিচয় দেন। পরে কমলাপুরে বসেই মোবাইল ফোনের মাধ্যমে বিচারকের সঙ্গে কথা বলে সাকিবের পরিচয় নিশ্চিত হওয়ার পরে বিরোধ নিষ্পত্তি করা হয়।
তবে থানা থেকে বের হওয়ার সময় সাকিব আদালতে দেখে নেওয়ার হুমকি দেন বলে অভিযোগ করেন এসআই মোহাম্মদ আলী। বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের অবহিত করার পর ঢাকা রেলওয়ে থানায় একটি সাধারণ ডায়ের করেন (জিডি নং-১৪৭৩, তারিখ ২৯ আগস্ট) করেন পুলিশের ওই কর্মকর্তা।
এরই ধারাবাহিকতায় গত ৩১ আগস্ট এসআই মোহাম্মদ আলীকে তার উর্ধ্বতন কর্মকর্তার মাধ্যমে তলব করেন ঢাকা রেলওয়ে থানার আমলী আদালতের বিচারক সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট তাজুল ইসলাম সোহাগ। এই বিচারক পুলিশ কর্মকর্তাকে জানান, ঢাকা অতিরিক্ত মহানগর দায়রা জজ আদালত-১০ এর বিচারককে ‘মেনেজ’ করে আসেন। না হলে আপনার বিরুদ্ধে পিটিশন মামলা হতে পারে। কথামত গত মঙ্গলবার দুপুরে রেলওয়ে পুলিশের এ কর্মকর্তা ওই আদালতে গেলে হামলার শিকার হন বলে অভিযোগ উঠেছে।
অভিযোগে এসআই মোহাম্মদ আলী বলেন, ঢাকা অতিরিক্ত মহানগর দায়রা জজ আদালত-১০-এর ভেতরে আগে থেকেই একজন অজ্ঞাতনামা ব্যক্তি মোবাইল ফোন হাতে নিয়ে চেয়ারে বসে ছিলেন। পরে বিচারকের স্টাফসহ মোট তিনজন কক্ষে অবস্থান করেন এবং দরজা বন্ধ করে দেওয়া হয়। একপর্যায়ে একজন অজ্ঞাতনামা ব্যক্তি, যাকে তিনি আদালতের ওমেদার হিসেবে চিহ্নিত করেছেন, পেছন থেকে তাকে জোরে আঘাত করেন এবং এলোপাতাড়ি মারধর করেন।
অভিযোগে আরও বলা হয়, ওই ব্যক্তি মারধর করার সময় তাকে উদ্দেশ করে বলেন, ‘বুঝছস আমরা কারা?’ পরে তিনি দৌড়ে দরজার দিকে চলে যান। পুরো ঘটনাটি চেয়ারে বসে থাকা ব্যক্তি মোবাইল ফোনে ধারণ করেন বলেও অভিযোগ করেছেন এসআই মোহাম্মদ আলী। পুলিশ কর্মকর্তার অভিযোগ, ঘটনার সময় বিচারক তাকে ‘তুই-তামারি’ করে ধমক দেন। তিনি নিজের কোনো কথায় বিচারক ক্ষুব্ধ হয়ে থাকলে ক্ষমা চাওয়ার কথাও বলেন। তবে তার দাবি, বিচারক বিষয়টি আমলে না নিয়ে তার পিয়ন সাকিব আল হাসানের বক্তব্যের ভিত্তিতে পূর্বপরিকল্পিতভাবে লোক দিয়ে তাকে মারধর ও অপমান করিয়েছেন।’ তবে অভিযোগের বিষয়ে বিচারক শাহিদুল ইসলামের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
তবে আদালতের পিয়ন সাকিব আল হাসান জানান, ‘কমলাপুরে ট্রেন থেকে নামার সময় একজন কনস্টেবল এবং তার সাথে আরও ২-৩ জন সিভিল পোশাকের আমার কাঁধে থাকা ব্যাগের পিছন থেকে হাত দিলে তাদেরকে বলি, আপনারা আমার ব্যাগে পিছন থেকে হাত দিচ্ছেন কেন। আপনাদের প্রয়োজন হলে আমার সামনে আমার ব্যাগ চেক করুন। তখন আমি কোর্টের স্টাফ পরিচয় দিলে তারা আমাকে ছেড়ে দেয়।’
সাকিব আরও বলেন, ‘এই বিষয়টি অবগত করানোর জন্য রেলওয়ে থানায় গিয়ে সেইখানে এস আই মোহাম্মদ আলীকে এই বিষয়ে জানালে তিনি রাগান্বিত হয়ে আমাকে চড়-থাপ্পড় মারে। বিচারক স্যারের সাথে ফোনেও খারাপ ব্যবহার করে।’

আপনার মতামত লিখুন :