মঙ্গলবার, ০৩ মার্চ ২০২৬, ০৭:৪৬ পূর্বাহ্ন

শিক্ষা প্রকৃত মানুষের জন্ম দেয়” জন গে আধুনিক সময়োপযোগী সুশিক্ষা ছাড়া জাতি তার লক্ষ অর্জন করতে ব্যর্থ হবে

শিক্ষা প্রকৃত মানুষের জন্ম দেয়” জন গে আধুনিক সময়োপযোগী সুশিক্ষা ছাড়া জাতি তার লক্ষ অর্জন করতে ব্যর্থ হবে

শিক্ষা প্রকৃত মানুষের জন্ম দেয়" জন গে আধুনিক সময়োপযোগী সুশিক্ষা ছাড়া জাতি তার লক্ষ অর্জন করতে ব্যর্থ হবে

মোঃ শফিকুল ইসলাম, বিশেষ প্রতিনিধি : জীবন জীবিকা নির্ভরশীল সুশিক্ষার ওপর । জীবনের উন্নয়নের প্রধান সোপানই হল শিক্ষা। শিক্ষা ছাড়া কোন জাতি বা ব্যক্তি তার অভিষ্ঠ লক্ষ্যে পৌঁছাতে পারে না। এ জন্যই বলা হয়, যে জাতি শিক্ষায় যত বেশি উন্নত সে জাতি তত বেশি সমৃদ্ধ। আন্তর্জাতিক বিশ্বের দিকে তাকালে দেখা যায় শিক্ষা ব্যবস্থার জন্য বিশ্বের সেরা দেশগুলির তালিকায় ফ্রান্স ডেনমার্ক কানাডা জার্মানি সুইজারল্যান্ড রয়েছে। সামগ্রিকভাবে বিশ্বের সেরা দেশগুলির মধ্যে আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্র,অস্ট্রেলিয়া, নেদারল্যান্ডস,সুইডেন, জাপান, ফিনল্যান্ড, তাইওয়ান এবং সিঙ্গাপুর ও রয়েছে।

গুনগত শিক্ষার সর্বোচ্চ স্থানে অবস্থান করছে নরওয়ে।মোট জিডিপির ৬.৪ শতাংশ শিক্ষার জন্য ব্যয় করেন।এর পরপরই আছে নিউজিল্যান্ড। যারা মোট জিডিপির ৬.৩ শতাংশ, যুক্তরাজ্য মোট জিডিপির ৬.২ শতাংশ এবং যুক্তরাষ্ট্র মোট জিডিপির ৬.১ শতাংশ ব্যয় করে থাকেন। উপরন্তু বাংলাদেশ মোট জিডিপির মাত্র ১.৮৩%। এ হার জাতিসংঘ শিক্ষা, বিজ্ঞান ও সংস্কৃতি সংস্থার (ইউনেস্কো) প্রস্তাবিত হারের চেয়ে অনেক কম। যে কোনো দেশের জিডিপির ৪-৬% শিক্ষা খাতে ব্যয় করার পরামর্শ ইউনেস্কোর। তবে বাংলাদেশে ২০২১ ও ২০২২ অর্থবছরে এ হার ছিল যথাক্রমে ২.০৯% এবং ২.০৮%। Programme for international student Assessment এর মূল্যায়ন অনুযায়ী পৃথিবীর সবচেয়ে শ্রেষ্ঠ শিক্ষা ব্যবস্থা ফিনল্যান্ড।ফিনল্যান্ডের সমাজ ও রাষ্ট্র ব্যবস্থা অনেকটাই অন্যরকম। যাকে অনেকে আদর করে ন্যানি স্টেট বলে থাকে। Finland is the biggest nanny state in the EU. শিক্ষা মানুষের জীবনধারণ ও উন্নতির প্রধান নিয়ামক হিসাবেই আখ্যায়িত।

অন্য বস্ত্রহীন গুহাবাসী আদিম মানুষ আজ যে অত্যাধুনিক বিস্ময়কর সভ্যতার বিকাশ ঘটিয়েছে তার পেছনে রয়েছে যুগ-যুগান্তরের অর্জিত জ্ঞানের অসাধারণ প্রয়োগ। আধুনিক সভ্যতার বিকাশ ও প্রাচুর্যের মূলে অবদান রেখেছে প্রযুক্তি ভিত্তিক শিক্ষা। শিক্ষার গুণগত মান বৃদ্ধি করে শিক্ষা থেকে অর্জিত জ্ঞান আহরণ করে নতুন কিছু সৃষ্টি করতে পারা। এবং তার যথার্থ মূল্যায়ন করা। টমাস জেফারসন বলেন ” প্রতিটি জাতির ভিত্তি মজবুত হবে যদি সে জাতি সু- শিক্ষায় শিক্ষিত হয়।” তাই দেশের প্রেক্ষাপটে মেধাবী শিক্ষার্থীদের খুঁজে বের করতে হলে পরীক্ষা ব্যবস্থা আরও কঠোর করা যাতে সঠিকভাবে মূল্যায়ন করে মেধাবী শিক্ষার্থীদের আধুনিক প্রযুক্তি নির্ভরশীল হিসেবে গড়ে তোলা যায়।এক কথায় সৃজনশীল শিক্ষার্থী গড়াই হবে আধুনিক শিক্ষাব্যবস্থার মান উন্নয়নের মূল চাবিকাঠি।

নেলসন ম্যান্ডেলার উক্তি ছিল এরকম “শিক্ষা হ’ল সবচেয়ে শক্তিশালী অস্ত্র যা আপনি বিশ্বের পরিবর্তন করতে ব্যবহার করতে পারেন। দেশের মানব সম্পদ উন্নয়ন হলো সব ধরণের উন্নয়নের কেন্দ্রবিন্দু। আর শিক্ষা হলো মানব সম্পদ উন্নয়নের প্রধান হাতিয়ার। সেই শিক্ষাই যদি সময়োপযোগী না হয় তাহলে সার্বিক উন্নয়ন বাধাগ্রস্ত হবে। প্রাথমিক শিক্ষা সর্বজনীন হলেও আধুনিকতার ছোঁয়া লাগেনি। পরিবর্তন হয়েছে শুধু অবকাঠামোতে। উন্নত বিশ্ব যেখানে শিশু শিক্ষার্থীদের প্রযুক্তির ব্যবহার করে পাঠদানে মনযোগী হয়েছে আর শ্রেণি কক্ষে শিক্ষার্থীর সংখ্যা সীমিত করেছেন সেখানে বাংলাদেশে তার উল্টো।

মাধ্যমিক শিক্ষার অবস্থা অত্যন্ত শোচনীয়। শ্রেণি কক্ষে শিক্ষার্থীদের রেশিও নেই। অধিকাংশ বিদ্যালয়ে ৭০/৮০ এর বেশি শিক্ষার্থী একই ক্লাসে বসে পড়াশোনা করে। নেই কোনো শাখা। বিষয় ভিত্তিক শিক্ষক সংকট। শ্রেণি কক্ষের পরিসর অত্যন্ত ছোট। সাম্প্রতিক সময়ে অবকাঠামো গত উন্নয়ন পরিলক্ষিত হয় কিন্তু গুনগত শিক্ষার মান উন্নয়নে তেমন কোন ভূমিকা নেই। শিক্ষার্থীদের একাংশ মোবাইল আসক্ত হয়ে পড়ছে। তাই সক্রেটিস বলেছেন, ” যতদিন লেখাপড়ার প্রতি আকর্ষণ থাকে, ততদিন মানুষ জ্ঞানী থাকে, আর যখনই তার ধারণা জন্মে সে জ্ঞানী হয়ে গেছে, তখনই মূর্খতা তাকে ঘিরে ধরে।” এই বিষয়ে নবম শ্রেণির শিক্ষার্থী মোঃ রোহান আহমেদ, মোঃ সিয়াম ইসলাম, মোঃ সোহাগ হাসান বলেন বর্তমান শিক্ষার যে করুন অবস্থা এই ধারা পরিবর্তন না হলে আমাদের ভবিষ্যৎ জীবন অন্ধকার। প্রায়োগিক শিক্ষার ব্যবহার নেই। অধিকাংশ বন্ধুরা মোবাইল ডিভাইসে আসক্ত। সাথে বেড়েছে মোটরসাইকেল ব্যবহার।

শ্রেণি কক্ষে পাঠদানের আকর্ষণ নেই। এক ধরনের শিক্ষা বিমুখতা তৈরি হয়েছে। শুধুমাত্র ৩/৪ তলা ভবন হলেই পড়াশোনার মান উন্নয়ন হবে না। উন্নয়ন করতে হবে শিক্ষকদের। প্রজেক্ট এর ব্যবহার করে উন্নত বিশ্বের শিক্ষার সাথে এগুতে হবে আমাদের। দশম শ্রেণির শিক্ষার্থী অন্তর বলেন, মহামারি করোনার কারণে তেমন পড়তে পারিনি। শিক্ষা এখন একটা বোঝা মনে হয়। আমার সাথের অনেক বন্ধুরা পড়াশোনা বাদ দিয়ে বিদেশে চলে গেছে।এস এস সি পরীক্ষার হলে বেড়াতে গিয়ে দেখলাম বাহিরে ফিটফাট ভিতরে নাকি সদরঘাট।যে কোনো মূল্যেই নাকি এস এস সি পাশ করতে হবে।তা না হলে কেমন দেখায়। এই শিক্ষা দিয়ে লাভ কী? এসবের পরিবর্তন করে আমাদের শ্রেণি কক্ষে নিয়ে উপযুক্ত করে তুলতে হবে। ষষ্ঠ শ্রেণির শিক্ষার্থীদের মধ্যে হিমেল বলেন পঞ্চম শ্রেণিতে কি পড়লাম আর ষষ্ঠ শ্রেণিতে কি পড়া কিছুই তো বুঝি না।আর বই অনেক বেশি।স্যাররাও বলেন তোমাদের বইতে তেমন পড়া নেই। শুধু রিডিং । প্রশ্ন পরীক্ষা কোন টিই নেই। শুধু মূল্যায়ন হবে। আমারা তোমাদের ভাল মূল্যায়ন করে দিব। তোমারা রিডিং পড়ে বই শেষ কর। আমারা শিক্ষকের কথার প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে শুধু রিডিং পড়তেছি ।

তাই রবীন্দ্রনাথ বলেছেন ” তাকেই বলি শ্রেষ্ঠ শিক্ষা,যা কেবল তথ্য পরিবেশন করে না, যা বিশ্ব সত্তার সাথে সামঞ্জস্য রেখে আমাদের জীবনকে গড়ে তোলে।” বর্তমান সময়ের অধিকাংশ ছেলে মেয়েরা পরীক্ষায় পাশ করার জন্য বই পড়ে। জ্ঞান অর্জনের জন্য খুবই কম ছাত্ররা লেখা পড়া করে। আবার অনেক ছাত্র আছে,বই না পড়ে পরীক্ষায় নকল নিয়ে বসে। এরজন্য পাশের হার বাড়লেও দিন দিন শিক্ষার মান ক্রমাগত হ্রাস পাচ্ছে। উচ্চ শিক্ষা মানুষের দক্ষতাকে বাড়িয়ে দেয় বহুগুণ। শিক্ষার হার বৃদ্ধি এবং সু- নির্বাচিত উচ্চশিক্ষা দ্রুত অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জনে সহায়ক ভূমিকা পালন করে। কোরিয়া ,জাপান, মালয়েশিয়ার মতো দেশগুলো এর উদাহরণ। এসব দেশের মানব সম্পদ উন্নয়নে শিক্ষা এক অনন্য গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে বৈকি। অপরদিকে বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থা পরীক্ষা নির্ভর হয়ে পড়েছে। জ্ঞান নির্ভরতা কমে গেছে।দিন দিন সবাই পরীক্ষা দিয়ে পাশ করে যাবে আর এটাকেই শিক্ষার হার ধরে চালিয়ে দেয়া হচ্ছে। পরীক্ষা দিয়ে আমরা পাশ তো হয়ে যাচ্ছি কিন্তু কোনো জ্ঞান অর্জন করতে পারছি না। সিস্টেমটাও এমন হয়ে গেছে যে এখানে জ্ঞান শেখানো হয় না। জ্ঞান শেখানোর আগে কিভাবে পরীক্ষায় পাশ করতে হয় সেটা শেখানো হয়। আমাদের টার্গেট জ্ঞান অর্জন করা না। শুধু সার্টিফিকেট অর্জন করা।

কিন্তু এরিস্টটলের ভাষায় ” সুস্থ দেহ সুন্দর মন তৈরি করাই হল শিক্ষা।” উন্নত দেশগুলোতে শিক্ষার মানের বিষয়টা কে আমরা যতটা না বড় পার্থক্য তৈরি করে নেই বিষয়টি আসলে পুরোপুরি সেরকম নয়। বাংলাদেশের শিক্ষার্থীরা বিশ্ববিদ্যালয়ের যেসব অধ্যাপক দের থেকে জ্ঞান অর্জন করেন নেহাৎ তারাও কম জ্ঞানী নয় । অনেক শিক্ষকই বিশ্ব নন্দিত।কিন্তু বিষয়টি বাস্তবে অন্য জায়গায় গিয়ে ঠেকেছে। উন্নত দেশের উন্নত বিশ্ববিদ্যালয় গুলো তাদের সার্বিক উন্নয়নের জন্য সর্বোচ্চ প্রচেষ্টা করে থাকেন, যার দরুন তারা শিক্ষার্থীদের সর্বোচ্চ শিক্ষার সরঞ্জামাদি এবং গবেষণার জন্য উপযুক্ত সুযোগ সুবিধা দিয়ে থাকেন। যার ফলশ্রুতিতে সেখান থেকে আউটপুট টাও অনেক ভালো আসে। যেমন আমেরিকার নিউইয়র্ক সিটিতে ১২তম গ্রেড পাস করা শিক্ষার্থীদের ড্রাইভিং জানা বাধ্যতামূলক। বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থায় যা শেখানো হয় তার বেশিরভাগ শিক্ষাই সরাসরি কাজে লাগে না অথবা কাজে লাগানোর মতো সুযোগ সৃষ্টি হয় না।যার ফলশ্রুতিতে শিক্ষা জীবনের পরিসমাপ্তি হওয়ার পর বেকার হয়ে পরছেন অধিকাংশ।

সুশীল সমাজের মানুষের সাথে কথা বলে জানা গেছে যে তারা বলেন আমরা তো আমাদের ছেলে মেয়েদের পড়াশোনা করাই ভাল একটা চাকরির আশায়। কিন্তু উচ্চ শিক্ষিত হওয়ার পর ও বেকার থেকে রায়। তখন আমরা হতাশ হই। দেশের প্রেক্ষাপটে বাস্তবটা এমনই । অন্যদিকে বাস্তবতা টা উল্টো। কারণ উচ্চ শিক্ষিত হওয়ার মূল উদ্দেশ্য ছিল জ্ঞান অর্জন। কিন্তু তা না হয়ে চাকুরী নির্ভর হয়ে পড়েছে।স্কুল-কলেজ আমাদেরকে শেখায় বিভিন্ন বিষয়ের বেসিক ধারণা, প্রায়োগিক শিক্ষা চর্চা হয় বিশ্ব বিদ্যালয় গুলোতে । সমস্যা হয় আমরা একাডেমিক শিক্ষাকে চাকরি পাওয়ার উদ্দেশ্য হিসেবে ধরে নিয়ে থাকি। সব বিষয়ে স্কুল কলেজে পাওয়া বেসিক জ্ঞানগুলো আমাদের ব্যক্তিজীবনে বিভিন্ন পর্যায়ে কাজে লাগে, আমরা হয়ত বুঝতে পারিনা। যেই ছেলে মাধ্যমিক স্তরে পড়েনাই সে অক্সিজেন কি জিনিস জানেনা, যে স্কুলে যায়নাই সে সমীকরণ কি জিনিস জানেনা, যে হিসাব বিজ্ঞান পড়েনাই সে হিসাবের মানে বুঝবে শুধু টাকার হিসাব রাখা, যে অর্থনীতি পড়েনাই সে অর্থনীতি আর অর্থায়নের মধ্যে পার্থক্য বুঝবেনা।

উদাহরণ হিসেবে ইংরেজির কথা বলি, আমাদের দেশে ইংরেজি পড়াশোনা এইচএসসিতেই শেষ, ভার্সিটি লাইফে ইংরেজি ভাষা ও সাহিত্য নামে আলাদা বিভাগ আছে, এর বাইরে অধিকাংশ বিষয়েই ইংরেজি থাকেনা, থাকলেও সাপ্লিমেন্টরি হিসেবে থাকে যার নাম্বার মূল রেকর্ডে যায় না।আমি যতটুকু ইংরেজি জানি সেটা স্কুল কলেজ থেকে শিখে এসেছি। বাংলাদেশ সরকার আধুনিক শিক্ষা পদ্ধতি চালুর মাধ্যমে গতানুগতিক শিক্ষা থেকে বেরিয়ে আসার চেষ্টা অব্যাহত রেখেছেন। চেষ্টার কোনো ত্রুটি নেই। সরকারের শিক্ষা নীতি বাস্তবায়ন না হওয়ার মূল কারণ হয়তো আমলা তান্ত্রিক জটিলতা।আর দ্বিতীয় কারণ অদক্ষ শিক্ষক। তৃতীয় কারণ প্রয়োজনীয় চাহিদার তুলনায় উপকরণ নেই। প্রযুক্তি ব্যবহারে চাই শতভাগ বিদ্যুতের নিশ্চায়ন।যা দেশে চাইলে ও সম্ভবপর হয়ে উঠেছে না। বিষয়টি এমন হয়েছে যে ইচ্ছা আছে উপায় নাই। সর্বোপরি বলা যায় বাঙালি পারেন না এমন কোনো অসাধ্য নেই।সবাই মিলে করি কাজ হারি জিতি নাহি লাজ। লিংক বলেছেন “চেষ্টা করলেই মানুষ ইচ্ছা অনুযায়ী আনন্দ উপভোগ করতে পারে। পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ শিক্ষা গ্রন্থ আল কুরআন

শেয়ার করুন

Comments are closed.




দৈনিক প্রতিদিনের কাগজ © All rights reserved © 2025 Protidiner Kagoj |