মঙ্গলবার, ০৩ মার্চ ২০২৬, ০৩:২৮ অপরাহ্ন

সিরিয়া-তুরস্ক ভূমিকম্প এরদোয়ানের জন্য বিপদ হয়ে দাঁড়িয়েছে !

সিরিয়া-তুরস্ক ভূমিকম্প এরদোয়ানের জন্য বিপদ হয়ে দাঁড়িয়েছে !

অনলাইন ডেস্ক

তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ান জানুয়ারির শেষের দিকে উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলীয় প্রদেশ বুরসায় যুব সম্মেলনে যোগ দিয়েছিলেন। এই সম্মেলনে তিনি জানান, আগামী ১৪ মে তুরস্কে প্রেসিডেন্ট ও সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। ওয়াশিংটন পোস্টের এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানানো হয়।

প্রতিবেদনে বলা হয়, আগামী নির্বাচনকে তার রাজনৈতিক জীবনের সবচেয়ে বড় পরীক্ষা হিসেবে দেখা হচ্ছে। কিন্তু নির্বাচনের তিন মাস আগে ভয়াবহ ভূমিকম্পের কারণে প্রচণ্ড চাপে পড়েন তিনি।

গত সোমবার (৬ ফেব্রুয়ারি) সিরিয়া সীমান্তবর্তী তুরস্কের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলে ৭ দশমিক ৮ মাত্রার শক্তিশালী ভূমিকম্প আঘাত হেনেছে। ভয়াবহ এই ভূমিকম্পে দুই দেশে ২৩ হাজারের বেশি মানুষ নিহত হয়েছেন। শুধু তুরস্কেই ২০ হাজার ২১৩ জন নিহত হয়েছেন। ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপা পড়ে আছে বহু মানুষ।

এই ভূমিকম্প এরদোয়ানের জন্য বিপদ হয়ে দাঁড়িয়েছে। তিনি ২০০৩ সাল থেকে তুরস্কের ক্ষমতায় রয়েছেন। তিনি প্রথমে প্রধানমন্ত্রী ছিলেন। ২০১৪ সালের আগস্ট থেকে প্রেসিডেন্টের পদে রয়েছেন। ভূমিকম্পের আগে তুরস্কে পরিচালিত জরিপে দেখা গেছে, এরদোয়ানের জন্য আসন্ন নির্বাচন সহজ হবে না।

নির্বাচনে তাকে কঠিন প্রতিদ্বন্দ্বিতার মুখে পড়তে হবে। ভূমিকম্পের বিপর্যয়ের আগেও এরদোয়ানকে একের পর এক সংকট মোকাবেলা করতে হয়েছে। অর্থনীতিতে তার নীতি দেশকে স্প্রীলিং মুদ্রাস্ফীতির মধ্যে নিমজ্জিত করেছিল। গত বছর দেশে ভোগ্যপণ্যের দাম বেড়েছে প্রায় ৮৫ শতাংশ।

একই সঙ্গে এরদোয়ানকে দাবানলসহ অন্যান্য পরিবেশগত বিপর্যয় মোকাবেলা করতে হয়েছে। তার সরকারের বিরুদ্ধে স্বজনপ্রীতি ও দুর্নীতির গুরুতর অভিযোগ রয়েছে। নাগরিক স্বাধীনতা খর্ব করার জন্য এরদোয়ান সমালোচিত হয়েছেন।

এরদোয়ান নিজেও জানেন, অনেক চ্যালেঞ্জ রয়েছে। সে অনুযায়ী কাজ করছিলেন তিনি। সোমবার ভূমিকম্পের কয়েক ঘণ্টা পর রাজধানী আঙ্কারায় এক সংবাদ সম্মেলনে হাজির হন এরদোয়ান। পরে তাকে সক্রিয় হতে দেখা যায়।

গত বুধবার (৮ ফেব্রুয়ারি) এরদোয়ান ভূমিকম্প ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা পরিদর্শন করেন। এই স্থানগুলোর মধ্যে রয়েছে কাহরামানমারাস ও হাতায়। এগুলো ভূমিকম্পে সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত স্থানগুলির মধ্যে একটি। তিনি কাহরামানমারাসে ভূমিকম্প-পীড়িত এক কান্নারত নারীকে জড়িয়ে ধরে সান্ত্বনা দেন।

হাত্তা সফরকালে এরদোয়ান ভূমিকম্পের পর সরকারি পদক্ষেপে তার সরকারের ত্রুটির কথা স্বীকার করেন। তবে তিনি জোর দিয়ে বলেন, এ ধরনের দুর্যোগের জন্য প্রস্তুত থাকা সম্ভব নয়। তবে এখন পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রয়েছে।

তুরস্কে প্রথম বড় ভূমিকম্প হয়েছিল ১৯৯৯ সালে। সেই ভূমিকম্পের পর উদ্ধার ও ত্রাণ তৎপরতার জন্য দেশটির তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী বুলেন্ট আইসেভিট ব্যাপক সমালোচিত হন। সেই সময় এরদোয়ানের দল দেশটিকে ভালভাবে পরিচালনা করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। তার দল ২০০২ সালের নির্বাচনে জয়লাভ করে। এরদোয়ানের এই অভিজ্ঞতা নিশ্চয়ই মনে আছে।

সোমবারের ভূমিকম্পের পর এরদোয়ানের সরকার দ্রুত চার স্তরের জরুরি অবস্থা ঘোষণা করেন। দেশটির সরকার আন্তর্জাতিক সহায়তার আহ্বান জানিয়েছে। তুরস্কের আঞ্চলিক প্রতিদ্বন্দ্বীসহ অনেক দেশ এই আহ্বানে সাড়া দিয়েছে।

বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছেন, এরদোয়ান যদি বর্তমান সংকট ভালোভাবে মোকাবেলা করতে সক্ষম হন তাহলে রাজনীতিতে তার অবস্থান আরও শক্তিশালী হতে পারে। কিন্তু যদি সে ব্যর্থ হয়, তাহলে সে আইসভিটের পরিণতি ভোগ করতে পারে।

লন্ডন ভিত্তিক রাজনৈতিক ঝুঁকি পরামর্শক প্রতিষ্ঠান টেনিওর কো-প্রেসিডেন্ট উলফাঙ্গো পিকোলি জানান, তুরস্কের বর্তমান সরকার যদি ভূমিকম্পের পরে একটি কার্যকর জরুরী প্রতিক্রিয়া মাউন্ট করতে সক্ষম হয় তবে এটি দেশে এরদোয়ানের নেতৃত্বে জাতীয় ঐক্যের অনুভূতি জাগিয়ে তুলতে পারে।

এই মনোভাব এরদোয়ান ও তার দলকে শক্তিশালী করতে পারে। তবে বড় আকারের এই ভূমিকম্প দেশটির বর্তমান সরকারের জন্য একটি মারাত্মক চ্যালেঞ্জ তৈরি করবে বলে জানান উলফাঙ্গো পিকোলি।

তুরস্কের বর্তমান সরকার যদি ভূমিকম্পের পরে একটি কার্যকর জরুরী প্রতিক্রিয়া মাউন্ট করতে সক্ষম হয় তবে এটি দেশে এরদোয়ানের নেতৃত্বে জাতীয় ঐক্যের অনুভূতি জাগিয়ে তুলতে পারে।

তুরস্কের বর্তমান সরকার যদি ভূমিকম্পের পরে একটি কার্যকর জরুরী প্রতিক্রিয়া মাউন্ট করতে সক্ষম হয় তবে এটি দেশে এরদোয়ানের নেতৃত্বে জাতীয় ঐক্যের অনুভূতি জাগিয়ে তুলতে পারে।

যুক্তরাজ্য ভিত্তিক ফরেন পলিসি সেন্টারের রিসার্চ ফেলো এমরে ক্যালিস্কান জানান, ভূমিকম্প পরবর্তী প্রতিক্রিয়া সফল না হলে আগামী মে মাসের নির্বাচনে এরদোয়ান হেরে যেতে পারেন। ভূমিকম্পের পর সরকারের পদক্ষেপ নিয়ে দক্ষিণ তুরস্কে ইতোমধ্যেই ক্ষোভ ও হতাশা রয়েছে। উদ্ধারকাজে ব্যর্থতার জন্য অনেকেই সরকারের সমালোচনা করছেন।

বিশ্লেষক গনুল তোল জানান, তিনি মানুষের মধ্যে ক্ষোভ দেখেছেন। তিনি নিশ্চিত, জনগণের এই ক্ষোভের প্রভাব নির্বাচনে পড়বে। যুক্তরাষ্ট্র ভিত্তিক মিডল ইস্ট ইন্সটিটিউটের তুর্কি প্রোগ্রামের পরিচালক গনুল জানান, ১৯৯৯ সালের ভূমিকম্পের পর, তুরস্কের নাগরিক সমাজের সংগঠনগুলো ক্ষতিগ্রস্ত মানুষদের সাহায্য করার জন্য অক্লান্ত পরিশ্রম করেছিল।

তবে এবার তা কম। কারণ, ২০১৬ সালের ব্যর্থ অভ্যুত্থানের পর এরদোয়ান অনেকের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিয়েছেন। বিশ্লেষক গনুল জানান, ১৯৯৯ সালের ভূমিকম্পের দুই দশকেরও বেশি সময় পরেও তুরস্ক ভালো যাচ্ছে না। এরদোয়ান শুধু রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানকেই দুর্বল করেননি, তিনি তুরস্কের সুশীল সমাজকেও দুর্বল করেছেন।

শেয়ার করুন

Comments are closed.




দৈনিক প্রতিদিনের কাগজ © All rights reserved © 2025 Protidiner Kagoj |