মঙ্গলবার, ০৩ মার্চ ২০২৬, ০৬:০১ অপরাহ্ন
জয়নাল আবেদীন রিটন, ভৈরব : কিশোরগঞ্জের ভৈরবে একই গ্রামের ৬ যুবক নিখোঁজ হওয়ার ঘটনায় পরিবারগুলোতে চলছে শোকের মাতম। নিখোঁজ ৬ যুবকের স্বপ্নছিল ইতালীতে গিয়ে পরিবারের মুখে হাসি ফুটাবে। বাড়ি থেকে যাবার পর ৬ মাস যাবত তাদের কোন খোঁজ খবর মিলছেনা। কোথায় আছে কেমন আছে বেছে আছে নাকি মারা গেছে পরিবারের কেউ জানেনা। দালালের সাথেও যোগাযোগ করতে না পেরে পরিবারগুলো হতাশায় ভুগছে। নিখোঁজ সন্তানদের ফিরে পেতে সরকারের হস্তক্ষেপ কামনা করছেন ভুক্তভোগী পরিবার। নিখোঁজরা হলো নয়ন মিয়া (১৮), ফারুক মবিন (২৩), শিমুল (১৮), আনোয়ার হোসেন (৩২), আবদুর রহমান (৪০) রিফাত হোসেন (২৪)। নিখোঁজদের মধ্যে ৪ জন একই পরিবারের এবং সবার বাড়ী কালিপুর গ্রামে।
আরও পড়ুন: ৪৮ ঘণ্টা অবরোধ কর্মসূচির শেষ দিন আজ
সরেজমিনে গিয়ে ভুক্তভোগী পরিবারের ন্বজনদের সাথে কথা তারা জানান, স্বল্প আয়ের পরিবারে সুখ ফিরিয়ে আনতে গত ৬ মাস পুর্বে রায়পুরার সেলিম দালালের মাধ্যমে স্বপ্নের দেশ ইতালী যেতে রওনা হয় ভৈরব উপজেলা কালিপুর গ্রামের ৬ যুবক। দালাল বলেছিল লিবিয়া থেকে সাগর পথে বোট (ডাংকির) মাধ্যমে ইতালী পৌছাবে। বিনিময়ে দালালকে দিতে হয়েছে জনপ্রতি ১০ লাখ টাকা করে। লিবিয়া যাবার পর প্রথম কয়েকদিন ছেলেদের সাথে যোগাযোগ করতে পেরেছিল তাদের স্বজনরা। এরপর গত প্রায় ৬ মাস যাবত ছেলেদের সাথে আর যোগাযোগ করতে পারছেনা স্বজনরা। নিখোঁজ যুবকদের স্বজনরা আজও জানতে পারছেনা তাদের ছেলেরা আজওকি বেচে আছে নাকি মারা গেছে। সন্তানদের কোন খোঁজ খবর না পেয়ে নিখোজ পরিবারে চলছে শোকের মাতম। সন্তানহারা পরিবারগুলোর এখন একটাই দাবী নিখোঁজ সন্তানদের সরকারের সহায়তায় ফিরিয়ে আনার ব্যবস্তা করেন।
স্বজনরা আরো বলেন, গত এপ্রিল মাসে তারা ৬ জন একসাথে বাড়ি থেকে দালালের কথা অনুযায়ী ভিসা লাগানোর পর তারা দোবাই যায় বিমানে। সেখান থেকে এক সপ্তাহ পর তাদেরকে বিমানে লিবিয়া নেয়া হয়। লিবিয়া যাওয়ার আগে ৬ জনের পরিবার প্রত্যেকে ৫ লাখ টাকা করে দালাল সেলিমকে তার বাবা ভাইয়ের মাধ্যমে নগদ প্রদান করা হয়। পরে লিবিয়া পৌঁছলে বাকী ৫ লাখ টাকা স্থানীয় ব্যাংকে জমা দেয়। দালাল সেলিম চলতি বছরের গত ২২ মে এই ৬ জনকে লিবিয়া থেকে ডাংকিতে (বোর্ডে বসিয়ে) সাগরপথে ইতালির উদ্যেশে পাঠানোর সময় সাগরের পাড়েই বোর্ডটি ডুবে যায়। সেখান থেকে বেঁচে গিয়ে ২২ মে, বাড়িতে ঘটনা জানান তারা। এর পর থেকে বাড়ির সাথে ৬ যুবকের সাথে ছয়মাস ধরে যোগাযোগ বিছিন্ন। বাড়ি থেকে দালালকে চাপ দিলে পরবর্তীতে বড় বোটে পাঠানোর আশ্বাস দেন। কিন্তু মে মাসে ২৮ তারিখের পর থেকে দালালকেও ফোন করে পাওয়া যাচ্ছেনা।
এবিষয়ে দালাল সেলিমের বাবা মোঃ ইসলামের সাথে মোবাইলে কথা হলে তিনি বলেন, ছেলের কথামত আমি তাদের কাছ থেকে বিভিন্ন সময়ে টাকা গ্রহন করলেও এটাকা তাকে পাঠিয়ে দিয়েছি। আমার ছেলের খবর আমিও জানিনা। শুনেছি ৬ জনকে ডাংকিতে সাগর দিয়ে বোর্ডে করে ইতালী পাঠানোর সময় বোর্ডটি দূর্ঘটনায় পড়ে ভেঙ্গে যায়। পরে তাদেরকে সাগর থেকে উদ্ধার করা হয়েছে নাকি তারা মরে গেছে এখবর জানিনা আমি। আমার ছেলেই এসব ঘটনার খবর বলতে পারবে। আমার ছেলে ফোন ধরেনা এতে আমিও চিন্তিত আছি। ভৈরব থানার অফিসার ইনচার্জ মাকসুদুল আলম বলেন, মৃত্যুঝুঁকি জেনেও কিছু মানুষ অবৈধ ভাবে সাগর পথে লিবিয়া দিয়ে ইতালী যাওয়ার পথে সাগরে ডুবে মারা যায় অথবা দুস্কৃতি লোকদের মাধ্যমে জিম্মি হয়ে মুক্তিপণও দিতে হয়েছে।নির্যাতনের শিকারও হয়েছে। সব জেনেও মানুষ অবৈধ পথে ইউরোপ যেতে চায় যেটা মোটেও ঠিকনা। তবে ভুক্তভোগী পরিবারের পক্ষ থেকে লিখিত অভিযোগ পেলে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহন করা হবে।
উপজেলা নির্বাহী অফিসার মোহাম্মদ সাদিকুর রহমান সবুজ এ বিষয়ে বলেন, ভৈরব একটি প্রবাসী অধ্যষিত এলাকা। সমগ্র বাংলাদেশ শ্রমিক হিসেবে অনেক মানুষ জীবিকার তাগিদে ইউরোপে যাচ্ছে। তাদের অনেকেই অবৈধ পন্থায় যায়। এভাবে যেতে গিয়ে বিভিন্ন রকমের প্রতিবন্ধকতার মাঝে পড়ে র্সবস্ব হারাচ্ছে। অনেকেই জিম্মি হয়ে দিতে হচ্ছে মুক্তিপণ। হচ্ছে নির্যাতনের শিকার, আবার অনেকেই সাগর পাড়ি দিতে গিয়ে ডুবে মারা যাচ্ছে। নির্যাতনের শিকার হয়ে পঙ্গুত্ব হচ্ছে তারা। যারা মারা গেছে তারা পরিবারের আর কোন খোঁজ খবর নিতে পারবেনা। তারপরও অনেকেই অবৈধ ভাবে বিদেশে পাড়ি দিতে চায়। আমরা অনেক অভিযোগ পেয়েছি লিবিয়া থেকে অনেক লোক নিখোঁজ হচ্ছে আবার কেউ কেউ জিম্মি হয়ে মুক্তিপণ দিচ্ছে। পর্যাপ্ত পরিমানের তথ্যপাতি না থাকায় অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে তেমন কোন ব্যবস্থা নেয়া যাচ্ছেনা। যাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ তারাও দেশের বাহিরে থাকায় আইনগত জটিলাতার কারণে ব্যবস্থা নেয়া যাচ্ছেনা। আমরা সরকারের পক্ষ থেকে সব সময় মানুষকে বলছি আমাদের প্রবাসী কল্ল্যান মন্ত্রনালয় রয়েছে। আপনারা তাদের সাথে যোগাযোগ করে তাদের পরামর্শে ভিসা ও ওয়ার্ক পারমিট যাচাই করে বিদেশে যেতে পারেন। অবৈধ ভাবে বা অবৈধ পন্থায় দালালের মাধ্যমে কোন দেশেই যাওয়া ঠিক নয়।