মাদকে সয়লাব ভূরুঙ্গামারী: নিয়ন্ত্রণহীন পাচার, ধ্বংসের মুখে যুবসমাজ

বিশেষ প্রতিনিধি , প্রতিদিনের কাগজ

প্রকাশিত: ১৭ নভেম্বর, ২০২৫, ১২:২৮ পিএম

কুড়িগ্রামের সীমান্তবর্তী ভূরুঙ্গামারী উপজেলায় বানের পানির মতো ভারত থেকে ঢুকছে মাদকদ্রব্য। মদ, গাঁজা, হেরোইন, ইয়াবাসহ নানা ধরনের মাদক এখন উপজেলার সর্বত্র ছড়িয়ে পড়েছে। পুলিশের অভিযান ও মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের তৎপরতা সত্ত্বেও থামছে না পাচার ও বেচাকেনা। এতে দিন দিন ধ্বংসের মুখে পড়ছে এলাকার তরুণ সমাজ।

সীমান্তঘেঁষা হয়ে হওয়ায় উপজেলার বিভিন্ন পয়েন্ট দিয়ে অবাধে প্রবেশ করছে মাদক। প্রতিদিন লাখ লাখ টাকার মাদক কেনাবেচা হচ্ছে। এমনকি জায়গায় বসে অর্ডার দিলেই বাড়িতে মাদক পৌঁছে যাচ্ছে এমন অভিযোগও উঠেছে। এলাকায় ছড়িয়ে পড়েছে “মাদকের স্বর্গরাজ্য” উপাধি। স্কুল–কলেজের শিক্ষার্থী, যুবক, এমনকি ব্যবসায়ীরাও আসক্ত হয়ে পড়ছে নেশার কবলে।

স্থানীয়দের অভিযোগ মাদক ব্যবসায় জড়িত রয়েছে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের অনেক নেতা, এমনকি কিছু জনপ্রতিনিধিও। ফলে ভয়ে কেউই প্রকাশ্যে কথা বলতে সাহস পাচ্ছেন না।

উপজেলার ১০টি ইউনিয়নের প্রায় ৫০টিরও বেশি স্পটে চলছে মাদকের রমরমা ব্যবসা। সন্ধ্যার পর এসব এলাকায় বসে ‘ভাসমান মাদক হাট’। উল্লেখযোগ্য স্পটগুলোর মধ্যে রয়েছে—

শিংঝাড়, লালব্রীজ পাড়, পুরাতন রেললাইন, সোনাতলী, মানিককাজি ঘাট, লাকি সিনেমাহল পাড়া, দিয়াডাঙ্গা, শিলখুড়ি, নতুনহাট, বাবুরহাট, দুধকুমোর চর, ফুটানীবাজার, ঢাকাইয়া পাড়া ও সোনাহাট এলাকা।

দুই দেশের অন্তত শতাধিক চোরাকারবারী ভারত থেকে মাদক এনে বিভিন্ন রুটে তা ছড়িয়ে দিচ্ছে। অভিযোগ রয়েছে, তারা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কিছু অসাধু সদস্য ও রাজনৈতিক ব্যক্তিদের ‘ম্যানেজ’ করেই ব্যবসা চালাচ্ছে।

মাদকের প্রধান রুটগুলো: 

শিংঝাড়–মানিককাজি–বাগভান্ডার–খাটামারী: ফেনসিডিল রুট

মানিককাজি–পাথরডুবি–বাঁশজানি–দিয়াডাঙ্গা: গাঁজা রুট

শালঝোড়–ধলডাঙ্গা–পাগলারহাট–উত্তর তিলাই: মদের রুট

কাজিয়ারচর–তিলাই উত্তর–চর ভূরুঙ্গামারী–সোনাহাট স্থলবন্দর: হেরোইন–ইয়াবা রুট, এসব মাদক প্রথমে সীমান্ত পার হয়ে এরপর সড়কপথে আসে। পরে বাস, ট্রাক, মাইক্রোবাস ও ভ্যান–লরিতে করে সারা দেশে ছড়িয়ে পড়ে। পুলিশ–ডিএনসির অভিযানেও বড় মাদক ব্যবসায়ীরা ধরাছোঁয়ার বাইরে

মাঝেমধ্যে পুলিশ ও মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর অভিযান চালালেও বড় সিন্ডিকেট এখনো অধরা।

পুলিশের তথ্যানুসারে গত জুলাইয়ে ৯০ পিস ইয়াবা, ২ গ্রাম হিরোইন ও ১ কেজি ৬০০ গ্রাম গাঁজা উদ্ধারসহ তিনজনকে গ্রেফতার করা হয়।

ডিএনসি–র হিসাবে গত এক বছরে তারা ১১ মাদক ব্যবসায়ীকে আটক করেছে এবং ৫৫ বোতল মদ, ৬ কেজির বেশি গাঁজা, ফেন্সিডিল, হেরোইন, ইয়াবা ও ৩ লাখ ৩৭ হাজার টাকা জব্দ করেছে।

ভূরুঙ্গামারী সরকারি কলেজ পাড়ার একাধিক ব্যক্তি জানান, “আমাদের পাশেই দিনের পর দিন মাদক বেচাকেনা চলে। ভয়-ভীতির কারণে কিছুই বলতে পারি না। মাদকের গন্ধে বাড়িতে থাকা দুষ্কর হয়ে যায়।”

অন্যদিকে কামাত আঙ্গারিয়া গ্রামের পিয়ারি বেগম বলেন, “আমার ছেলে মাদকে আসক্ত হয়ে গেছে। অনেক চেষ্টা করেও তাকে ফিরিয়ে আনতে পারছি না।”

ভূরুঙ্গামারী থানার ওসি আল হেলাল মাহমুদ বলেন “মাদকের বিষয়ে আমাদের জিরো টলারেন্স নীতি অব্যাহত রয়েছে। মাদক ব্যবসায় কেউ জড়িত থাকলে ছাড় দেওয়া হবে না। তবে মাদক ব্যবসায়ীদের ছাড়া কিছু সাংবাদিকদের তদবিরই বেশি।”

মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর কুড়িগ্রামের সহকারী পরিচালক আবু জাফর বলেন “সচেতনতা বৃদ্ধিতে আমরা বিভিন্ন উপজেলায় কর্মশালা করছি। জনবল কম হলেও অভিযান চলছে। মাদকের সঙ্গে যেই জড়িত থাকুক, কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না।”

Link copied!