ভূমিকম্পের শঙ্কা: ছুটি শেষেও কাটছে না শিক্ষার্থীদের উদ্বেগ

মোঃ আল শাহারিয়া সুইট , ডিআইইউ সংবাদদাতা

প্রকাশিত: ২৮ নভেম্বর, ২০২৫, ০৫:২৯ পিএম

গত ২১ নভেম্বর থেকে শুরু হওয়া ভূমিকম্পের ঘটনাগুলি শিক্ষার্থীদের মনে গভীর আতঙ্ক সৃষ্টি করেছে। বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ ছুটি ঘোষণা করলেও, একের পর এক ভূমিকম্পের অনুভূতি শিক্ষার্থীদের ভেতরের ভয়কে আরও বাড়িয়ে তুলেছে। ছুটি শেষ হলেও বেশিরভাগ শিক্ষার্থী এখনো অস্থির এবং নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন, যা তাঁদের শিক্ষাজীবনে মনোযোগ ও স্বাভাবিক কার্যক্রমকে প্রভাবিত করছে।

শুক্রবার (২৮ নভেম্বর) তীব্র ভূমিকম্পের পর ঢাকা ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি জরুরি বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে পুনরায় ছুটি ঘোষণা করে। কিন্তু এই ছুটি কিছুটা স্বস্তি দিলেও শিক্ষার্থীদের শঙ্কা পুরোপুরি কাটেনি। দেশের বিভিন্ন স্থানে পর্যায়ক্রমিক ভূমিকম্পে সৃষ্ট আতঙ্ক শিক্ষার্থীদের ওপর সবচেয়ে গভীর প্রভাব ফেলেছে। সাধারণত বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসকে নিরাপত্তা ও শিক্ষার উদ্দীপনার জায়গা হিসেবে দেখা হলেও, ঘনঘন ভূকম্পনে সেই স্বাভাবিক পরিবেশ অস্থির হয়ে উঠেছে। আবাসিক হলের শিক্ষার্থীরা রাতের ঘুম পর্যন্ত হারাচ্ছেন বারবার দুলে ওঠা ভবনের অনুভূতিতে।

বিশেষ করে পুরোনো ভবন, ফাটল ধরা হল বা উচ্চতলা আবাসিক ভবনে থাকা শিক্ষার্থীদের ভয় আরও বাস্তব। অনেকেই মনে করছেন, কাঁপুনি থেমে গেলেও ঝুঁকি পুরোপুরি কাটেনি। এই পরিস্থিতি তাদের প্রতিটি দিন-রাতকে টানটান করে রেখেছে।

এই পরিস্থিতিতে সবচেয়ে বড় সংকট হলো তথ্যহীনতা এবং প্রস্তুতির অভাব। কীভাবে ভূমিকম্পে নিরাপদ থাকতে হয়, ভবনগুলো কতটা ঝুঁকিপূর্ণ, এসব বিষয়ে স্পষ্ট কোনো নির্দেশনা বা নিয়মিত মহড়া অনেক প্রতিষ্ঠানে নেই। ফলে শিক্ষার্থীরা নিজেদের মতো করে আতঙ্ক সামলানোর চেষ্টা করছে—কেউ হলে থাকতে ভয় পেয়ে বাড়িতে চলে যাচ্ছে, কেউ আবার ক্লাসে মনোযোগ হারিয়ে অস্থিরতায় ভুগছে।

ঢাকা ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির ফার্মেসী বিভাগের শাহরিয়ার শুভ বলেন, “সাম্প্রতিক ভূমিকম্পের ঘটনাটি আমাদের মতো শিক্ষার্থীদের মনে গভীর আতঙ্ক সৃষ্টি করেছে। সেই কয়েক সেকেন্ডের ভূমিকম্প এতটাই তীব্র ছিল যে এখনো অনেকে মানসিকভাবে স্থির হতে পারছি না। ক্লাসে, লাইব্রেরিতে কিংবা নিজের রুমে থাকলেও হঠাৎ মনে হয় আবার যদি ভূমিকম্প হয়?” তার প্রত্যাশা, অবিলম্বে নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে আরও জোরদার করা হোক।

রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের নাঈমা জাহান আদিবা জানান, "ছোট্ট শব্দেও অনেক শিক্ষার্থী আঁতকে ওঠে, ঠিক মতো ঘুমতেও পারে না। দৈনন্দিন শিক্ষাজীবনেও এই ভয় ও অস্থিরতা প্রভাব ফেলছে।" তিনি ক্যাম্পাসের ভবনগুলোর নিরাপত্তা মূল্যায়ন, জরুরি নির্গমন পথ নির্ধারণ, নিয়মিত ভূমিকম্প মোকাবিলা ড্রিল ও প্রশিক্ষণ এবং জরুরি নির্দেশনা স্পষ্টভাবে জানিয়ে দেওয়ার দাবি জানান।

ব্যবসায় প্রশাসন বিভাগের মোঃ জহুরুল হক এই শঙ্কা বা আতঙ্ক সৃষ্টির দুটি প্রধান কারণ উল্লেখ করেন: কাঠামোগত ঝুঁকি এবং প্রস্তুতির অভাব। তিনি বলেন, “দেশের বহু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ভবন বহু পুরোনো এবং দুর্বল। সামান্য কম্পনে যখন দেয়ালে ফাটল দেখা দেয় বা পলেস্তারা খসে পড়ে, তখন এই ভবনগুলো আমাদের কাছে আর শিক্ষাকেন্দ্র থাকে না বরং মনে হয় এক-একটি 'মৃত্যুফাঁদ'।” তার দাবি, অবিলম্বে সকল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ভবনের নিরাপত্তা নিরীক্ষা করা হোক এবং ঝুঁকিপূর্ণ ভবন দ্রুত সংস্কার বা নিরাপদ স্থানে স্থানান্তরের ব্যবস্থা করা হোক। এছাড়া, বছরে অন্তত দু'বার ভূমিকম্পের সময় করণীয় সম্পর্কে বাস্তবসম্মত মহড়া আয়োজনের উপর জোর দেন তিনি।

একই বিভাগের খাতুনে জান্নাত রাকা বলেন, "মাত্র কয়েকদিনের ব্যাপ্তিতে এতো ভূমিকম্প কোনোভাবেই শিক্ষার্থীদের শান্ত থাকতে দিচ্ছে না। অতি উৎসুক এ প্রজন্ম না পারছে ক্লাস, পরীক্ষা, প্রেজেন্টেশন ছেড়ে শান্তির নীড়ে ফিরতে, আর না পারছে স্বস্তিতে বাঁচতে।" তিনি পজিটিভ মিডিয়া কাভারেজ, বিবেচিত হেডলাইনস, ভূমিকম্পের সতর্কতা ও প্রতিরক্ষামূলক প্রতিবেদন, এবং বিভিন্ন সামাজিক অনুষ্ঠান ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে কাউন্সিলিংয়ের আয়োজন করার কথা বলেন।

ভূমিকম্প থামানো আমাদের হাতে না থাকলেও, আতঙ্ক কমানো আমাদের দায়িত্ব। বিশ্ববিদ্যালয়গুলো যদি নিয়মিত প্রস্তুতি মহড়া, ভবন পরিদর্শন রিপোর্ট প্রকাশ, জরুরি আশ্রয়স্থল প্রস্তুত রাখা এবং শিক্ষার্থীদের মানসিক সহায়তা দেওয়ার উদ্যোগ নেয়, তাহলে অন্তত এই ভয়টুকু কমানো সম্ভব। অন্যথায়, ভূমিকম্পের কাঁপুনি থেমে গেলেও শিক্ষার্থীদের মনের কাঁপুনি থেকেই যাবে। শিক্ষার্থীরা আশা করছে, নিরাপত্তা নিশ্চিত হলে তারা আবার শান্তি ও স্বস্তির সঙ্গে তাদের পড়াশোনা চালিয়ে যেতে পারবে।

Link copied!