ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি–কে হত্যার মধ্য দিয়ে মধ্যপ্রাচ্যে নতুন অস্থিরতার সূচনা হয়েছে। ইসরায়েলি ও মার্কিন গোয়েন্দা সূত্রের দাবি, কয়েক দশকের নজরদারি ও ছয় মাসের নিবিড় সমন্বয়ের পর চূড়ান্ত এই অভিযান পরিচালিত হয়। প্রযুক্তিগত ও গোয়েন্দা সহায়তায় যুক্ত ছিল সিআইএ এবং ইসরায়েলের গোয়েন্দা সংস্থা মোসাদ।
ইসরায়েলি সামরিক কর্মকর্তাদের ভাষ্য, তেহরানে একাধিক স্থানে প্রায় একই সময়ে হামলা চালানো হয়। মাত্র ৬০ সেকেন্ডের ব্যবধানে খামেনিসহ ইরানের শীর্ষ সাত নিরাপত্তা কর্মকর্তা, তার পরিবারের সদস্য ও ঘনিষ্ঠজনদের হত্যা করা হয়। একই অভিযানে আরও প্রায় ৪০ জন জ্যেষ্ঠ ইরানি নেতা নিহত হন বলে দাবি করা হয়েছে।
স্যাটেলাইট চিত্রে দেখা গেছে, তেহরানে খামেনির কার্যালয় চত্বর থেকে কালো ধোঁয়ার কুণ্ডলী উড়ছে। গোয়েন্দা তথ্য অনুযায়ী, ওই সময় সেখানে শীর্ষ কর্মকর্তাদের বৈঠক হওয়ার কথা ছিল। মার্কিন গণমাধ্যম দ্যা নিউ ইয়র্ক টাইমস জানিয়েছে, বৈঠকের সময় ও খামেনির উপস্থিতি সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য ইসরায়েলকে সরবরাহ করেছিল সিআইএ।
বিশ্লেষকদের মতে, এটি ছিল দীর্ঘমেয়াদি ‘জিগস পাজল’ গোয়েন্দা অভিযানের ফল। খামেনির দৈনন্দিন রুটিন, পরিবারের গতিবিধি, নিরাপত্তা বলয়ের দুর্বলতা—সবকিছুর বিস্তারিত ডসিয়ার তৈরি করেছিল মোসাদ।
ইসরায়েলি বিশ্লেষক ও লেখক ইয়োসি মেলম্যান বলেন, ইসরায়েল বহু বছর ধরেই গুপ্তহত্যা কৌশলে অভ্যস্ত। তবে কোনো রাষ্ট্রপ্রধানকে লক্ষ্য করে এ ধরনের অভিযান নজিরবিহীন।
মোসাদের সাবেক প্রধান আমোস ইয়াদলিন এই হামলাকে “কৌশলগত ও অভিযানগত এক বিশাল চমক” হিসেবে উল্লেখ করেছেন। তার মতে, অনেকেই ধারণা করেছিলেন রাতের আঁধারে হামলা হবে; কিন্তু সকাল বেছে নেওয়া ছিল অপ্রত্যাশিত পদক্ষেপ।
২০২১ সাল থেকে মোসাদের নেতৃত্বে থাকা ডেভিড বার্নিয়া গুপ্তচরদের নিয়ে বিশেষ ‘ফরেইন লিজিয়ন’ ইউনিট গঠন করেন। মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে গুরুত্বপূর্ণ মিশনে এই ইউনিট কাজ করে।
বিশ্লেষকদের মতে, ইরানের ভেতরে স্থানীয় সূত্র নিয়োগ এবং প্রযুক্তিগত নজরদারির সমন্বয়ই এ অভিযানের সাফল্যের মূল চাবিকাঠি। যুক্তরাষ্ট্রের আড়িপাতা গোয়েন্দা তথ্য ও ইসরায়েলের মাঠপর্যায়ের মানব গোয়েন্দা তথ্য একত্র করে নির্ভুল লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়।
তবে এ পদক্ষেপ নিয়ে বিতর্ক রয়েছে। ইরান বিশেষজ্ঞ ও সাবেক সিআইএ কর্মকর্তা রুয়েল গেরেখ্ত মনে করেন, দীর্ঘমেয়াদে এটি কৌশলগত ভুল হতে পারে। তাঁর ভাষায়, কোনো নেতাকে সরিয়ে দিলে সমস্যা শেষ হয় না; বরং নতুন শক্তির উত্থান ঘটতে পারে।
একই সুরে কথা বলেছেন ইয়োসি মেলম্যানও। তিনি বলেন, হামাস ও হিজবুল্লাহর নেতাদের হত্যা করেও সংগঠনগুলো নির্মূল করা যায়নি। নেতৃত্বের শূন্যতা দ্রুতই পূরণ হয়ে যায়।
খামেনি হত্যার মধ্য দিয়ে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্র ইরানের শাসনব্যবস্থাকে দুর্বল করার বার্তা দিতে চেয়েছে। তবে এর ফলে আঞ্চলিক উত্তেজনা চরমে পৌঁছেছে। বিশ্লেষকদের মতে, এ ঘটনার প্রতিক্রিয়া শুধু ইরানেই সীমাবদ্ধ থাকবে না; পুরো মধ্যপ্রাচ্যেই এর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব পড়তে পারে।
মাত্র এক মিনিটের এক অভিযানে বদলে গেছে আঞ্চলিক শক্তির ভারসাম্য। এখন প্রশ্ন—এই কৌশল কি ইরানকে দুর্বল করবে, নাকি আরও কঠোর ও সংগঠিত প্রতিপক্ষের জন্ম দেবে?
আপনার মতামত লিখুন :