ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ শেষ করতেও এখন সংকটে ট্রাম্প

অনলাইন ডেস্ক , প্রতিদিনের কাগজ

প্রকাশিত: ১৬ মার্চ, ২০২৬, ০১:৩৬ এএম

ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধের দুই সপ্তাহ পার হওয়ার পর মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প হয়তো দ্রুতই জয়ের ঘোষণা দেওয়ার জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছেন। কিন্তু তার সামনে এখন বড় চ্যালেঞ্জ, যুদ্ধ শেষ হবে কি না, সেই সিদ্ধান্তে তেহরানেরও একটি ভূমিকা রয়েছে। মার্কিন সংবাদমাধ্যম ওয়াশিংটন পোস্ট এ খবর জানিয়েছে।

ইরানের নৌবাহিনীর অধিকাংশ শক্তি নির্মূল, ক্ষেপণাস্ত্র মজুদের বড় অংশ ধ্বংস এবং শীর্ষ নেতাদের হত্যার পর ট্রাম্প যুদ্ধের শুরুতে সামরিক নেতাদের দেওয়া লক্ষ্যমাত্রাগুলোর প্রায় কাছাকাছি পৌঁছে গেছেন। কিন্তু দুই সপ্তাহের এই রক্তক্ষয়ী সংঘাত ট্রাম্পের ঘোষিত বৃহত্তর লক্ষ্যগুলো অর্জন করতে পারেনি। তেহরানের কট্টরপন্থি শাসনব্যবস্থা এখনও ক্ষমতায় টিকে আছে এবং পারস্য উপসাগরের গুরুত্বপূর্ণ জাহাজ চলাচল পথ বন্ধ করে দিয়ে তারা বিশ্ব তেলের বাজারে অস্থিরতা সৃষ্টি করে চলেছে।

কূটনীতিক ও বিশ্লেষকদের মতে, দেশটির বর্তমান নেতৃত্ব এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি মরিয়া হয়ে পারমাণবিক অস্ত্রের দিকে ঝুঁকতে পারে। যুক্তরাষ্ট্রের ধারণা, ইরানের হাতে এখনও ৪৪০ কেজি উচ্চ মাত্রার সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম রয়েছে। মার্কিন ও ইসরায়েলি আক্রমণের মুখে টিকে থাকতে এই ইউরেনিয়ামকে তেহরান দর-কষাকষির প্রধান হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছে।

এই পরিস্থিতি ট্রাম্পের জন্য এক বিড়ম্বনা তৈরি করেছে। নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে নিজ দলের পক্ষ থেকেই তার ওপর চাপ বাড়ছে যুদ্ধের বদলে অর্থনীতিতে মনোযোগ দেওয়ার জন্য। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল বোমাবর্ষণ শুরু করার পর থেকে তেলের দাম ২৫ শতাংশ বেড়েছে। কৃষকরা সারের ক্রমবর্ধমান মূল্যের মুখোমুখি হচ্ছে এবং মার্কিন সেনাদের নিহতের সংখ্যাও বাড়ছে। হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচলের ওপর হামলার সক্ষমতা ইরান এখনও বজায় রেখেছে। ফলে যুক্তরাষ্ট্র একতরফাভাবে যুদ্ধ বিরতি দিলেও জ্বালানির দাম কমবে কি না, তা অনিশ্চিত।

প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প অবশ্য দাবি করছেন যে, যুদ্ধের গতি তার নিয়ন্ত্রণেই আছে। শুক্রবার ফক্স নিউজ রেডিওকে তিনি বলেন, যুদ্ধ তখনই শেষ হবে যখন আমি এটি অনুভব করব, আমার হাড়ের ভেতর অনুভব করব। তিনি আরও বলেন, আমরা সময়ের চেয়ে অনেক এগিয়ে আছি। অনেক এগিয়ে।

তবে ব্রুকিংস ইনস্টিটিউশনের ভাইস প্রেসিডেন্ট সুজান ম্যালোনি বলেন, রণক্ষেত্রের সাফল্য আর ইরানকে আঞ্চলিক হুমকি হিসেবে নিয়ন্ত্রণ করার সামর্থ্যের মধ্যে বড় ব্যবধান রয়েছে। তিনি বলেন, নির্দিষ্ট সামরিক লক্ষ্য অর্জনে আমরা ব্যাপক সাফল্য পেয়েছি, কিন্তু যতদিন ইরান যুদ্ধের সমাপ্তির তারিখ নির্ধারণ করতে পারবে এবং তাদের পারমাণবিক সক্ষমতা বজায় থাকবে, ততদিন এটি একটি কৌশলগত বিপর্যয় হিসেবেই গণ্য হবে।

ইরানের পারমাণবিক মজুদের বর্তমান অবস্থা নিয়ে ধোঁয়াশা রয়েছে। ধারণা করা হচ্ছে, গত জুনে মার্কিন বিমান হামলার পর ইউরেনিয়াম গ্যাসের ক্যানিস্টারগুলো ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপা পড়ে আছে। ইরানি বিজ্ঞানীরা সেই গ্যাস ব্যবহার করে ‘ডার্টি বম্ব’ তৈরি করতে পারবেন কি না, তা-ও নিশ্চিত নয়।

যুদ্ধের শুরুতে নিহত সর্বোচ্চ নেতা আলী খামেনি কয়েক দশক ধরে আমেরিকার বিরুদ্ধে প্রতিরোধের কৌশল সাজিয়েছিলেন। তার উত্তরসূরি ছেলে মোজতবা খামেনির হিসাব-নিকাশ ভিন্ন হতে পারে। মিডল ইস্ট ইনস্টিটিউটের ব্রায়ান কাটুলিস বলেন, আমরা আসলে ভিমরুলের চাকে ডিল মেরেছি এবং বিষয়টিকে আরও কট্টরপন্থার দিকে ঠেলে দিয়েছি।

প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ শুক্রবার এক সংবাদ সম্মেলনে ইউরেনিয়াম উদ্ধারে স্থল অভিযানের সম্ভাবনা নাকচ না করে বলেন, প্রেসিডেন্টের দৃষ্টি পারমাণবিক সক্ষমতার দিকে রয়েছে। আমাদের সামনে অনেক বিকল্প পথ খোলা আছে।

২৮ ফেব্রুয়ারি শুরু হওয়া এই হামলা ইরানের সামরিক সক্ষমতা গুঁড়িয়ে দিলেও হরমুজ প্রণালির মতো স্পর্শকাতর স্থানে আগে যে হুমকিগুলো তাত্ত্বিক ছিল, এখন তা বাস্তবে রূপ নিয়েছে। ২১ মাইল প্রশস্ত এই সরু পথে তেলবাহী ট্যাঙ্কারে হামলা এখন নিত্যনৈমিত্তিক ঘটনায় পরিণত হয়েছে।

পরিস্থিতি মোকাবিলায় ট্রাম্প ইরানকে চাপে ফেলতে খার্গ দ্বীপ-এর সব সামরিক লক্ষ্যবস্তু ধ্বংস করার দাবি করেছেন। একই সঙ্গে তিনি চীন, ফ্রান্স, জাপান ও ব্রিটেনকে এই অঞ্চলে জাহাজ পাঠানোর আহ্বান জানিয়েছেন। অথচ মাত্র এক সপ্তাহ আগে তিনি ব্রিটেনের বিমানবাহী রণতরী পাঠানোর প্রস্তাব হাসিমুখে প্রত্যাখ্যান করেছিলেন।

এদিকে, সেনেটর লিন্ডসে গ্রাহাম সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্স-এ একটি পোস্টে ইঙ্গিত দিয়েছেন যে, মেরিন সেনারা শিগগিরই খার্গ দ্বীপে আক্রমণ করতে পারে। তিনি লিখেছেন, যার নিয়ন্ত্রণে খার্গ দ্বীপ থাকবে, সেই এই যুদ্ধের ভাগ্য নির্ধারণ করবে।

জ্বালানির দাম নিয়ন্ত্রণে রাখতে আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থা (আইইএ) তাদের মজুদ থেকে ৪০ কোটি ব্যারেল তেল ছাড়ার ঘোষণা দিয়েছে। এছাড়া ট্রাম্প প্রশাসন রাশিয়ার তেল রফতানির ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা স্থগিত করেছে, যা ইউক্রেন যুদ্ধের অবসানে ট্রাম্পের নিজের প্রচেষ্টাকেই বাধাগ্রস্ত করতে পারে। এই সিদ্ধান্তের ফলে ক্রেমলিনের কোষাগারে বিপুল অর্থ জমা হবে, যা পুতিনকে ইউক্রেন যুদ্ধে আরও রসদ জোগাবে।

আটলান্টিক কাউন্সিলের ফেলো ড্যান শাপিরো বলেন, ট্রাম্প যদি একতরফাভাবে যুদ্ধ বিরতি দেন, ইরান তা গ্রহণ নাও করতে পারে। তার মতে, লক্ষ্য বারবার পরিবর্তন না করে পারস্পরিক উত্তেজনার প্রশমন ঘটানোই হবে বুদ্ধিমানের কাজ। নয়তো যুক্তরাষ্ট্র এমন এক অন্তহীন যুদ্ধের দিকে টেনে হিঁচড়ে নিয়ে যাবে যার শেষ প্রান্ত ক্রমেই দূরে সরে যাচ্ছে।

Link copied!