ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জয়লাভ করে দীর্ঘদিন পর সরকার পরিচালনার দায়িত্ব পেয়েছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল বিএনপি। দীর্ঘ সময় রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার বাইরে থাকায় দলটির অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনগুলোর নিয়মিত কমিটি দেওয়া হয়ে ওঠেনি। দলের ১১টি সহযোগী সংগঠনের ১০টিরই মেয়াদ উত্তীর্ণ হয়েছে অনেক আগে। কোনো কোনো সংগঠনের কমিটির বয়স পার হয়েছে এক যুগ। ফলে অঙ্গ-সংগঠনগুলোর কার্যক্রমে এক ধরনের স্থবিরতা নেমে এসেছে। এদিকে, মূল দল বিএনপিরও কাউন্সিল হয় না ১০ বছর ধরে।
এমন পরিস্থিতিতে দলের সাংগঠনিক ভিত্তি মজবুত করতে এবং নতুন নেতৃত্ব তৈরির লক্ষ্যে অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনগুলো পুনর্গঠনে জোর দিচ্ছে বিএনপি। পবিত্র ঈদুল ফিতরের পরপরই এ পুনর্গঠন প্রক্রিয়া শুরু হতে পারে।
দলীয় সূত্রে জানা গেছে, ছাত্রদলের নতুন কমিটি ঘোষণার মাধ্যমে শুরু হতে পারে এই প্রক্রিয়া।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বিএনপির অধিকাংশ অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের কোনো লিখিত গঠনতন্ত্র নেই। নিয়ম অনুযায়ী প্রতি তিন বছর অন্তর কাউন্সিল আয়োজনের বিধান থাকলেও দীর্ঘদিন ধরে তার কোনো বাস্তবায়ন দেখা যাচ্ছে না। নিয়মিত কাউন্সিল না হওয়ায় পদপ্রত্যাশী নেতাকর্মীদের মধ্যে বাড়ছে ক্ষোভ ও হতাশা। কাঙ্ক্ষিত পদ-পদবি না পেয়ে অনেকে দলীয় কার্যক্রমে নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়ছেন, যার ফলে সাংগঠনিক কাঠামো দুর্বল হয়ে পড়ছে এবং নতুন নেতৃত্ব তৈরির পথ রুদ্ধ হচ্ছে।
গত ফেব্রুয়ারি মাসে প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান তার তেজগাঁও কার্যালয়ে রাজনৈতিক উপদেষ্টাদের সঙ্গে বৈঠকে বসেন। ওই বৈঠকে উপদেষ্টারা দলের অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনগুলোর সাংগঠনিক নাজুক পরিস্থিতি তুলে ধরেন এবং দ্রুত পুনর্গঠনের পরামর্শ দেন। সার্বিক দিক বিবেচনা করে তারেক রহমান পবিত্র ঈদুল ফিতরের পরপরই এই পুনর্গঠন প্রক্রিয়া শুরু করার সুস্পষ্ট ইঙ্গিত দিয়েছেন।
দলের নীতিনির্ধারকরা বলছেন, নিকট ভবিষ্যতে বড় কোনো রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ না থাকলেও আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচন বিএনপির জন্য একটি অগ্নিপরীক্ষা। এই নির্বাচনে কাঙ্ক্ষিত ফলাফল পেতে হলে যোগ্য ব্যক্তিকে মনোনয়ন দেওয়ার পাশাপাশি মেয়াদোত্তীর্ণ ও স্থবির হয়ে পড়া অঙ্গ-সহযোগী সংগঠনগুলোকে ঢেলে সাজানো জরুরি। অভ্যন্তরীণ কোন্দল ও সাংগঠনিক দুর্বলতা নিয়ে নির্বাচনে অংশ নিলে জয়ের পথ কঠিন হতে পারে, যার সুযোগ নিতে পারে প্রতিদ্বন্দ্বী দলগুলো।
ছাত্রদল দিয়ে শুরু হচ্ছে পুনর্গঠন মিশন
দলীয় একটি সূত্র জানিয়েছে, গত ফেব্রুয়ারি মাসে প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান তার তেজগাঁও কার্যালয়ে রাজনৈতিক উপদেষ্টাদের সঙ্গে বৈঠকে বসেন। ওই বৈঠকে উপদেষ্টারা দলের অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনগুলোর সাংগঠনিক নাজুক পরিস্থিতি তুলে ধরেন এবং দ্রুত পুনর্গঠনের পরামর্শ দেন। সার্বিক দিক বিবেচনা করে তারেক রহমান পবিত্র ঈদুল ফিতরের পরপরই এই পুনর্গঠন প্রক্রিয়া শুরু করার সুস্পষ্ট ইঙ্গিত দিয়েছেন।
পরিকল্পনা অনুযায়ী, ছাত্রদলের নতুন কমিটি গঠনের মাধ্যমে এই সাংগঠনিক সংস্কার ও পুনর্গঠন কার্যক্রমের আনুষ্ঠানিক সূচনা হতে যাচ্ছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বিএনপির একজন ভাইস চেয়ারম্যান বলেন, বিগত বছরগুলোতে প্রতিকূল পরিস্থিতির কারণে আমরা সাংগঠনিক কার্যক্রম ও নিয়মিত কাউন্সিল করতে পারিনি। কিন্তু এখন পরিস্থিতির পরিবর্তন হয়েছে, দলের সুসময় যাচ্ছে। তাই দলকে শক্তিশালী করতে হলে নিয়মিত কাউন্সিলের মাধ্যমে গতিশীল নেতৃত্ব আনতে হবে।
তিনি আরও বলেন, বর্তমানে যেভাবে প্রশাসক নিয়োগ দেওয়া হচ্ছে, তাতে বোঝা যাচ্ছে খুব দ্রুত স্থানীয় সরকার নির্বাচন হবে না। তবে যখনই নির্বাচন হোক, সেখানে ভালো করতে হলে সংগঠনকে ঐক্যবদ্ধ ও শক্তিশালী করতে হবে।
ছাত্রদলে পদপ্রত্যাশীদের দৌড়ঝাঁপ
গত ১ মার্চ রাকিবুল ইসলাম রাকিব ও নাছির উদ্দিন নাছিরের নেতৃত্বে গঠিত ছাত্রদল কেন্দ্রীয় কমিটির দুই বছরের মেয়াদ শেষ হয়েছে। মেয়াদোত্তীর্ণ হওয়ার পাশাপাশি অভ্যন্তরীণ কোন্দল, গ্রুপিং এবং ছাত্র সংসদ নির্বাচনে আশানুরূপ ফলাফল না পাওয়ায় বর্তমান কমিটি সাংগঠনিকভাবে নাজুক অবস্থায় রয়েছে।
পবিত্র ঈদুল ফিতরের পরপর যেকোনো সময় এই কমিটি ভেঙে নতুন নেতৃত্ব ঘোষণা করা হতে পারে—এমন গুঞ্জন চলছে। এরই মধ্যে শীর্ষ পদ পেতে পদপ্রত্যাশীরা লবিং ও তদবির শুরু করেছেন।
ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক নাছির উদ্দিন নাছির বলেন, আমাদের দুই বছরের কমিটির মেয়াদ শেষ হয়েছে। আমাদের সাংগঠনিক অভিভাবক তারেক রহমান যখন চাইবেন তখনই নতুন কমিটি হবে।
ছাত্রদলের সভাপতি পদপ্রত্যাশী মমিনুল ইসলাম জিসান বলেন, কমিটির মেয়াদ শেষ হয়ে গেছে। আমরা দ্রুত নতুন কমিটি দেওয়ার অনুরোধ জানাব।
স্বেচ্ছাসেবক ও যুবদল
২০২২ সালের ৪ সেপ্টেম্বর এস এম জিলানীকে সভাপতি ও রাজীব আহসানকে সাধারণ সম্পাদক করে স্বেচ্ছাসেবক দলের কমিটি গঠন করা হয়। তিন বছর মেয়াদি এই কমিটির মেয়াদ ইতোমধ্যে শেষ হয়েছে। বর্তমান সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক দুজনই সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন।
যুবদলের আংশিক কমিটি গঠন করা হয় ২০২৪ সালের ৯ জুলাই। তবে দেড় বছর পার হলেও তা পূর্ণাঙ্গ করা সম্ভব হয়নি। সংগঠনের নেতারা জানিয়েছেন, শিগগিরই পূর্ণাঙ্গ কমিটি ঘোষণা করা হতে পারে।
অন্যান্য সংগঠনের অবস্থা
কৃষক দলের কমিটি ২০২১ সালে গঠিত হলেও এর মেয়াদ অনেক আগেই শেষ হয়েছে। সংগঠনটির বর্তমান কার্যক্রম নিয়েও অসন্তোষ রয়েছে।
মহিলা দলের কমিটি ২০১৬ সাল থেকে একই রয়েছে। দীর্ঘদিন সম্মেলন না হওয়ায় অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব ও সাংগঠনিক দুর্বলতা তৈরি হয়েছে।
মুক্তিযোদ্ধা দলের সর্বশেষ কাউন্সিল হয় ২০১৩ সালে। তিন বছর অন্তর কাউন্সিল হওয়ার কথা থাকলেও এক যুগ পার হয়ে গেছে।
শ্রমিক দলের সর্বশেষ কাউন্সিল অনুষ্ঠিত হয় ২০১৪ সালে। এরপর আর কোনো নতুন কমিটি হয়নি।
তাঁতী দল ও মৎস্যজীবী দলেও দীর্ঘদিন ধরে নতুন কমিটি গঠন হয়নি। জাসাসের কার্যক্রমও সীমিত আকারে চলছে এবং দীর্ঘদিন ধরে একই আহ্বায়ক কমিটি বহাল রয়েছে।
মূল দলের কাউন্সিল
অঙ্গ-সংগঠনগুলোর মতোই বিএনপির মূল দলের অবস্থাও একই রকম। ২০১৬ সালের ১৯ মার্চ দলটির সর্বশেষ জাতীয় কাউন্সিল অনুষ্ঠিত হয়েছিল। গঠনতন্ত্র অনুযায়ী প্রতি তিন বছর পরপর কাউন্সিল হওয়ার কথা থাকলেও তা হয়নি।
বিএনপি নেতাদের মতে, বর্তমান পরিস্থিতিতে সরকারের কার্যক্রম পরিচালনাই প্রধান অগ্রাধিকার। তাই এখনই কাউন্সিল আয়োজনের পরিকল্পনা নেই। তবে ভবিষ্যতে কেন্দ্রীয় কমিটির শূন্য পদগুলো পূরণ করে দলকে শক্তিশালী করা হবে।
দলীয় সূত্রগুলো মনে করছে, সব ঠিক থাকলে ২০২৭ সাল নাগাদ বিএনপির পরবর্তী জাতীয় কাউন্সিল অনুষ্ঠিত হতে পারে।
বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন বলেন, এখনই দলের কাউন্সিল করা নিয়ে কোনো চিন্তাভাবনা নেই। সবার নজর এখন সরকার পরিচালনার দিকে।
আপনার মতামত লিখুন :