সব সরকারের আমলেই ক্ষমতাধর শিক্ষা ক্যাডারের এক কর্মকর্তা যিনি বিগত ফ্যাসিবাদি আওয়ামী শাসন আমলের ১৭ বছরের পুরো সময়টাই ছিলেন শিক্ষা প্রশাসনের গুরুত্বপূর্ণ পদে, শেখ হাসিনা এবং তার সরকার গণঅভ্যুত্থানে পালালেও শেখ পরিবারের ‘অতি আপনজন’ হয়েও অন্তর্বর্তী সরকারের আমলেও তিনি ছিলেন ক্ষমতার কেন্দ্রে। জনগণের ম্যান্ডেট নিয়ে গঠন করা বিএনপি সরকারের আমলেও ক্ষমতার দাপটে হয়েছেন নায়েমের পরিচালক। বলছিলাম বিসিএস সাধারণ শিক্ষা ক্যাডারের ১৮ তম ব্যাচের কর্মকর্তা অধ্যাপক প্রিম রিজভীর কথা। অধ্যাপক প্রিম রিজভী বিগত ১৭ বছর ছিলেন আওয়ামী লীগের কন্যা, অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে ছিলেন এনসিপির জননী তবে বিএনপির আমলে তাকে সবাই কি বলে সম্বোধন করবে তা তিনি এখনও জানাননি।
মঙ্গলবার (২৪ মার্চ) শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বিভাগের উপসচিব তানিয়া ফেরদৌস স্বাক্ষরিত প্রজ্ঞাপনে অধ্যাপক প্রিম রিজভীকে মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক (প্রশিক্ষণ) থেকে জাতীয় শিক্ষা ব্যবস্থাপনা একাডেমি (নায়েম) এর পরিচালক (প্রশিক্ষণ ও বাস্তবায়ন) পদে পদায়ন করা হয়েছে। যা নিয়ে চলছে শিক্ষা ক্যাডারের কর্মকর্তাদের মধ্যে ক্ষোভ।
জানা গেছে, বিসিএস সাধারণ শিক্ষা ক্যাডারের ১৮ তম ব্যাচের কর্মকর্তা অধ্যাপক প্রিম রিজভী পতিত স্বৈরাচারী শেখ হাসিনার শাসনামলে ছিলেন শিক্ষা ক্যাডারের ক্ষমতার এক আলোচিত নাম। পিতা ছিলেন মুক্তিযুদ্ধকালীন স্বাধীন বাংলাদেশ সরকারের মন্ত্রী, শেখ মুজিবুর রহমানের গণপরিষদের নেতা আর স্বামী আওয়ামী শাসন আমলের জ্যেষ্ঠ সামরিক কর্মকর্তা। এই প্রভাবে কর্মজীবনের রাজধানী শহরে এবং শিক্ষা প্রশাসনের গুরুত্বপূর্ণ দপ্তরে চাকরি করেছেন বিগত ফ্যাসিবাদী আমলের প্রায় পুরো সময়টা। একদিনের জন্যও ঢাকার বাইরে যেতে হয়নি। পাঁচ আগস্ট শেখ হাসিনা পালিয়েছে, রূপ পাল্টিয়ে তিনিও হয়েছেন আগস্ট পরবর্তীতে ঘোর হাসিনা বিরোধী, পরবর্তীতে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করার চেষ্টা করেছেন এনসিপির জননী হিসেবে। আগস্ট পর্ববর্তীতে বাগিয়েছেন মাউশির ডিডি পদ। আর বিএনপির এই আমলে বাগালেন নায়েমের পরিচালক পদ।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, প্রিম রিজভী ২০০৩ সালে ঢাকা কলেজে ইংরেজি বিভাগে শিক্ষকতার মাধ্যমে কর্মজীবন শুরু করেন। এরপর বিএনপি সরকারের শাসন আমল শেষ হয়ে আসে তত্বাবধায়ক সরকার পরবর্তীতে সামরিক নিয়ন্ত্রিত অন্তর্বর্তীকালীন সরকার। সেই সরকারের ক্ষমতা ছাড়ে ২০০৮ সালের শেষের দিকে। সরকার আসে সরকার যায় সেসময় সামরিক কর্মকর্তা স্বামীর প্রভাবে একই কর্মস্থলে থেকে যান তিনি। ২০০৮ সালের শেষের দিকে আসে আওয়ামী লীগ সরকার। এরপর পদায়ন নেন মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তরের মাধ্যমিক স্তরে নারী শিক্ষার সম্প্রসারণ ও শিক্ষার মান উন্নয়ন প্রকল্পের (Secondary Education Stipend Project- SESP) সহকারী পরিচালক পদে। ২০১৪ সালে বিশ্ব ব্যাংকের অর্থায়নে পরিচালিত সেকেন্ডারি এডুকেশন কোয়ালিটি অ্যান্ড অ্যাকসেস এনহান্সমেন্ট প্রজেক্টের (SEQAEP) সহকারী পরিচালক (প্রশাসন) পদে পদায়ন বাগিয়েন নেন তিনি। সহযোগী অধ্যাপক পদে পদোন্নতি পেয়ে পদায়নেও নেন পদোন্নতি, চেয়ার পান একই প্রকল্পের উপ-পরিচালক পদের। এরপর ২০১৮ সালে ব্যানবেইসের উপ-পরিচালক (প্রশাসন) পদে পদায়ন পান তিনি। পাঁচ আগস্টের আগে কিছু সময় মাউশির ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা হিসেবে ওএসডি থাকলেও জুলাই গণঅভ্যুত্থানে পাঁচ আগস্ট শেখ হাসিনা পালিয়ে গেলে হাসিনা বিরোধী সেজে ফেসবুকে একাধিক পোষ্ট দিয়ে বিভিন্ন উপায়ে পদায়ন নেন মাউশির প্রশিক্ষণ শাখার উপ-পরিচালক পদে।
বছর দুয়েক আগে প্রিম রিজভী শিক্ষা সচিব বরাবর বদলির জন্য একটি দরখাস্ত দেন মাউশির তৎকালীন মহাপরিচালক অধ্যাপক নেহাল আহমেদ (যিনি পতিত সরকারের রাষ্ট্রপতি আব্দুল হামিদ খানের আপন ভাগিনা) এর মাধ্যমে। সেখানে তিনি মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তরের এইচআরএম উইংয়ের উপ-পরিচালক, সেকেন্ডারি এডুকেশন ডেভেলপমেন্ট প্রোগ্রামের (এসইডিপি) ডেপুটি প্রোগ্রাম কো-অর্ডিনেটর, জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড (এনসিটিবি) এর উর্ধ্বতন বিশেষজ্ঞ (মাধ্যমিক), জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড (এনসিটিবি) এর বিশেষজ্ঞ (প্রাথমিক) এই তিন পদের যে কোনো একটিতে পদায়ন চেয়েছিলেন।
বদলির এই দরখাস্তে তিনি উল্লেখ করেন, “বিনয়ের সাথে জানাচ্ছি যে, আমি বীর মুক্তিযোদ্ধা সামসুল হকের একমাত্র কন্যা। আমার পিতা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নকালীন সময় থেকে আমৃত্যু জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুর একান্ত সহযোগী ও আজীবন বঙ্গবন্ধুর আদর্শে অনুপ্রাণিত ছিলেন। আমার পিতা ১৯৭০ এর নির্বাচনে আওয়ামীলীগের প্রার্থী হিসেবে M.N.A পদে জয়লাভ করেন (আসন নং NE- 67, বাকেরগঞ্জ, বরিশাল) (কপি সংযুক্ত)। ১৯৭২ সালে তিনি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু গঠিত গণপরিষদে M.C.A হিসাবে যোগদান করেন। মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে তিনি ৯নং সেক্টরে পাক আর্মির সাথে মুখোমুখি যুদ্ধ করেন। তিনি মুক্তিযুদ্ধকালে সাময়িকভাবে স্বাধীন বাংলা সরকারের যোগাযোগ ও খাদ্য মন্ত্রীরও ভারপ্রাপ্ত দায়িত্বে ছিলেন। ২৯ ফেব্রুয়ারী ২০০৮ (লিপ ইয়ার) এ তাঁর মৃত্যুর পরে জাতীয় মর্যাদায় তাকে মিরপুর বুদ্ধিজীবি গোরস্থানে দাফন করা হয়।” অতএব আমাকে আবেদনকৃত পদের যে কোন একটিতে পদায়নের আবেদন জানাচ্ছি।
অধ্যাপক প্রিম রিজভী ঢাকাতেই কর্মজীবন কাটাতে বিভিন্ন সময়ে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে দেওয়া আবেদনে স্বামী জ্যেষ্ঠ সামরিক কর্মকর্তা ও Reflux নামক দূরারোগ্য কিডনি রোগে বহু বছর যাবৎ আক্রান্তের কথা উল্লেখ করেন। প্রতিনিয়ত তাকে ঢাকার সামরিক হাসপাতালে ডাক্তার দেখাতে হয়। অথচ তিনি পাঁচ আগস্টের পর মাউশির প্রশিক্ষণে পদায়ন নেওয়ার পর বিদেশ ছাড়াও একাধিক জেলায় ঘুরে বেড়িয়েছেন।
বিগত ১৭ বছর ছিলেন আওয়ামী লীগের কন্যা, অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে এনসিপির জননী অধ্যাপক প্রিম রিজভী মাউশির প্রশিক্ষণ উইংকে বানিয়েছিলেন আওয়ামী লীগ আমলের দোসরদের মিলনমেলা। ফ্যাসিস্ট হাসিনার সহযোগী তিন কর্মকর্তা যারা হাসিনা পতনের আগের দিন মাউশিতে হাসিনার পক্ষে মিছিল করেছিলেন। এই তিন কর্মকর্তাই প্রিম রিজভীর প্রিয় পাত্র। এই তিনজন হলেন, মাউশির প্রশিক্ষণ শাখার গবেষণা কর্মকর্তা মোহাম্মদ আবুল হোসেন কায়েস (বিসিএস-২৯), সহকারী পরিচালক (প্রশিক্ষণ-৪) ও গবেষণা কর্মকর্তা-৪ মোঃ আকবর আলী । মাউশির প্রশিক্ষণ উইংয়ের কোনো সিদ্ধান্ত একক ভাবে নিতে পারেননা পরিচালক। প্রিম রিজভীর দেওয়া সিদ্ধান্তে পরিচালক না করলে ফ্যাসিস্ট এই তিন কর্মকর্তাকে নিয়ে সরাসরি হুমকি প্রদান করেন তিনি এমনকি পরিচালককে একাধিকবার গালাগালি করার অভিযোগও উঠেছে তার বিরুদ্ধে।
প্রিমের প্রিয় ব্যক্তিত্ব আবুল হোসেন কায়েস যিনি বিগত এক যুগ ট্রেনিং শাখায় একই পদে বহাল থাকার সুবাদে বিভিন্ন সময়ে বিশ্বের ৩০টি দেশ ঘুরেছেন। কোন কোন দেশে একাধিকবার গিয়েছে বলে অভিযোগ আছে। বিশেষ করে কোরিয়ায় ৭/৮ বার কায়েস নিজে গিয়েছেন। কায়েসের স্ত্রী ফারজানা আকতার সহকারী অধ্যাপক (সমাজকর্ম, ইডেন কলেজ, ঢাকা) একাধিকবার আইসিটি ট্রেনিংয়েও নিয়ে গেছেন বলেন জানা গেছে। ২০২৪ এর ৪ আগষ্ট মাউশিতে হাসিনা সরকারের পক্ষে মিছিলকারীদের অন্যতম প্রশিক্ষণ শাখার গবেষণা কর্মকর্তা আবুল হোসেন কায়েস অন্তবর্তী সরকারের আমল পর্যন্ত বহাল তবিয়তে ছিলেন মাউশিতে। প্রশিক্ষণের গবেষণা কর্মকর্তা-৪ মোঃ আকবর আলী অন্তবর্তী সরকার আমল পর্যন্ত বহাল তবিয়তে ছিলেন এই মাউশিতেই।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে গত ১৭ বছর ডিজিটাল পানিসমেন্টে থাকা শিক্ষা ক্যাডারের এক কর্মকর্তা বলেন, শুধুমাত্র জাতীয়তাবাদী চেতনা ধারণ করায় ১৭ বছর ধরে ছিলাম সমুদ্রপারে। একদিনের জন্যও ঢাকায় পোস্টিং পায়নি, দপ্তরে তো দূরে থাক। অন্তর্বর্তী সরকারের আমল থেকে আছি ওএসডি হয়ে। আর প্রিম রিজভীদের মত মানুষেরা সারাজীবনই ক্ষমতার কেন্দ্রে থেকে যায়, দপ্তরগুলোর পরিচালক পদ পেয়ে যান যা দুঃখজনক। প্রধানমন্ত্রীর দৃষ্টি আকর্ষণ করেন এই কর্মকর্তা।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে বিসিএস সাধারণ শিক্ষা ক্যাডার অ্যাসোসিয়েশনের এক শীর্ষ নেতা শিক্ষা সংবাদ’কে বলেন, বিএনপি সরকারের ক্ষমতার শুরুতেই যদি আওয়ামী আমলের ক্ষমতাধর কর্মকর্তাকে পরিচালক পদে পদায়ন দিতে থাকেন তাহলে সামনে দিকে কি হবে তা আল্লাহ ভালো জানেন। তিনি পদায়নের ক্ষেত্রে পিডিএস টা ভালো করে দেখার জন্য সংশ্লিষ্টদের প্রতি আহ্বান জানান।
কিভাবে আওয়ামী আমলের সর্বোচ্চ সুবিধা নেওয়া অধ্যাপক প্রিম রিজভী নায়েমের পরিচালক পদে পদায়ন পেলেন জানতে চাইলে শিক্ষা সচিব আবদুল খালেক শিক্ষা সংবাদ’কে বলেন, বিষয়টি খতিয়ে দেখা হবে।
এ বিষয়ে বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ অধ্যাপক বদরুল ইসলাম শিক্ষা সংবাদ’কে জানান, বিএনপির প্রতি জনগণের যেমন প্রত্যাশা ও প্রাপ্তি অনেক ঠিক তেমনি সরকারের কর্মকর্তাদের প্রত্যাশাও অনেক। যদি আওয়ামী আমলের সুবিধাভুগী এসব কর্মকর্তাদের পরিচালকের মত গুরুত্বপূর্ণ পদে পদায়ন করা হতে থাকে তাহলে কর্মকর্তাদের মধ্যে অসন্তোষ বাড়বে। এই পদায়ন বাতিল করে পদায়নের ক্ষেত্রে আরও সচেতন হতে হবে। প্রধানমন্ত্রীকে এসব বিষয়ে নজর দেওয়া উচিত।
তিনি আরও বলেন, প্রশাসনের রন্ধ্রে রন্ধ্রে জেঁকে বসা সুবিধাবাদী কর্মকর্তাদের এই রূপান্তর কেবল দুর্ভাগ্যজনকই নয়, বরং তা জুলাই বিপ্লবের আকাঙ্ক্ষার সাথেও সাংঘর্ষিক। রাষ্ট্রের প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ দপ্তরে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে হলে আমলাতন্ত্রকে দলীয় প্রভাবমুক্ত করা এবং অতীত কর্মকাণ্ডের সঠিক তদন্ত সাপেক্ষে পদায়ন করা এখন সময়ের দাবি।
আপনার মতামত লিখুন :