দুয়ারে কড়া নাড়ছে বাঙালির প্রাণের উৎসব পহেলা বৈশাখ। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদে ঢাকের বাদ্য আর রঙ-তুলির আঁচড়ে শুরু হয়ে গেছে বঙ্গাব্দ ১৪৩৩ বরণের মূল আয়োজন শোভাযাত্রার আনুষ্ঠানিক প্রস্তুতি। তবে এই শোভাযাত্রার নাম নিয়েও বেশ বিতর্ক চলছে; পরিবর্তনও করা হচ্ছে বারবার। আজ রোববার সংস্কৃতিমন্ত্রী অ্যাডভোকেট নিতাই রায় চৌধুরী বাংলা নববর্ষে যে শোভাযাত্রা হয়, সেটি এখন থেকে ‘বৈশাখী শোভাযাত্রা’ নামে হবে। এর আগে, গত বছর পহেলা বৈশাখে চারুকলা থেকে বের হওয়া শোভাযাত্রার নাম ছিল ‘আনন্দ শোভাযাত্রা’। তার আগে এটি ছিল ‘মঙ্গল শোভাযাত্রা’। কিন্তু ইউনেস্কোর অপরিমেয় বিশ্ব সংস্কৃতি হিসেবে স্বীকৃতির সনদে ‘মঙ্গল শোভাযাত্রা অন পহেলা বৈশাখ’ নামেই বাংলা বর্ষবরণের আয়োজনটিকে উল্লেখ করা হয়েছে। এখন বারবার নাম বদলের ফলে জাতিসংঘের সংস্থার স্বীকৃতিতে কোনো প্রভাব পড়বে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
জাতিসংঘের শিক্ষা, সংস্কৃতি ও বিজ্ঞানবিষয়ক সংস্থা ইউনেসকো ২০১৬ সালের ৩০ নভেম্বর 'মঙ্গল শোভাযাত্রা'-কে বিশ্বের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের তালিকাভুক্ত করে।
মূলত ১৯৮৯ সাল থেকে পহেলা বৈশাখ থেকে শোভাযাত্রা করে আসছে চারুকলা। শুরুতে নাম ছিল 'আনন্দ শোভাযাত্রা'। পরে নব্বইয়ে স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনের পটভূমিতে অমঙ্গলকে দূর করে মঙ্গলের আহ্বান জানিয়ে শোভাযাত্রার নামকরণ হয় 'মঙ্গল শোভাযাত্রা'। পরে আবার অন্তর্বর্তী সরকারের সময় বাংলা বর্ষবরণের ‘মঙ্গল শোভাযাত্রা’র নাম পরিবর্তন করে ‘আনন্দ শোভাযাত্রা’ করা হয়।
কিন্তু ঢাবির চারুকলা অনুষদ জানায়, তারা গত বছরের ধারাবাহিকতায় এবারও 'আনন্দ শোভাযাত্রা' নামেই বর্ষবরণের প্রস্তুতি নিচ্ছে। গত সোমবার চারুকলা অনুষদের জয়নুল গ্যালারির সামনের লবিতে এই প্রস্তুতি পর্বের উদ্বোধন করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রো-ভাইস চ্যান্সেলর (প্রশাসন) অধ্যাপক ড. সায়মা হক বিদিশা। অনুষ্ঠানে চারুকলা অনুষদের ডিন অধ্যাপক ড. মো. আজহারুল ইসলাম শেখের সভাপতিত্বে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন একুশে পদকপ্রাপ্ত প্রখ্যাত শিল্পী অধ্যাপক ড. আবদুস সাত্তার। এ আয়োজনের উদ্বোধন শেষে চারুকলা অনুষদের ডিন গণমাধ্যমকে বলেন, এটি গত বছরই পরিস্কার করা হয়েছে। পহেলা বৈশাখে চারুকলা থেকে প্রথম যে শোভাযাত্রাটি হয়েছিল, তার নাম 'বর্ষবরণ আনন্দ শোভাযাত্রা'ই ছিল। সেটি পরে কী কারণে যেন 'মঙ্গল শোভাযাত্রা’ হয়ে যায়। আমরা কোনো কিছু পরিবর্তন করিনি। আমরা আগের ধারাবাহিকতা অব্যাহত রাখতে চাই। আরও বেশি অন্তর্ভুক্তিমূলক হবে এবারের আয়োজন।
এদিকে শোভাযাত্রার নামকরণ বিতর্কে ইউনেস্কো বলছে, নামকরণ সংক্রান্ত জাতীয় সিদ্ধান্তে তারা কোনো অবস্থান নেয় না। তবে সরকার যদি নাম পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত নেয়, তবে ইউনেস্কোর কাছে আনুষ্ঠানিক আবেদন জমা দিতে হয়।
বর্ষবরণ শোভাযাত্রার নামকরণ নিয়ে চলমান বিতর্কের বিষয়ে জানতে চাইলে এক ই-মেইল বার্তায় ইউনেস্কোর হেড অফ অফিস অ্যান্ড রিপ্রেজেনটেটিভ সুজান ভাইজ বলেছেন, ‘ইউনেস্কো নামকরণ সংক্রান্ত জাতীয় সিদ্ধান্তে কোনো অবস্থান নেয় না, কারণ এ ধরনের বিষয় সদস্য রাষ্ট্রগুলোর নিজস্ব এখতিয়ার ও সিদ্ধান্তের আওতাভুক্ত। যদি বাংলাদেশ সরকার এই নাম পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত নেয়, তবে ইউনেস্কোর কাছে একটি আনুষ্ঠানিক আবেদন জমা দিতে হবে।
ইনট্যাঞ্জিবল কালচারাল হেরিটেজ কনভেনশনের অপারেশনার ডিরেকটিভস অনুযায়ী, এ ধরনের অনুরোধ সংশ্লিষ্ট রাষ্ট্র করতে পারে এবং তা কমিটির অধিবেশনের অন্তত তিন মাস আগে বিবেচনার জন্য জমা দিতে হয়।
বর্তমানে মঙ্গল শোভাযাত্রা ইউনেস্কোর রিপ্রেজেন্টিটিভ লিস্ট অব দ্য ইনটানজিবল হেরিটেজ অব হিউমানিটিতে ‘মঙ্গল শোভাযাত্রা অন পহেলা বৈশাখ’ নামেই অন্তর্ভুক্ত রয়েছে বলে জানান তিনি।
এদিকে সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য বিভাগের একাধিক কর্মকর্তা বলেছেন, ইউনেস্কোর কাছে সংস্কৃতি মন্ত্রণালয় থেকে নাম পরিবর্তনের কোনো আবেদন করা হয়েছে বলে তাদের জানা নেই।
আপনার মতামত লিখুন :