শায়লা শারমিন চৌধুরী: দেশের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর গুরুত্বপূর্ণ পদগুলোতে—বিশেষ করে জেলা পুলিশ সুপার (এসপি) ও থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) পদায়নকে কেন্দ্র করে অনিয়ম, তদবির ও আর্থিক লেনদেনের গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগ রয়েছে, বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের সময় বিরোধী দল দমনে সক্রিয় ভূমিকা রাখা এবং গুম-গায়েবি মামলার আসামিদের পুনরায় গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে বসানো হচ্ছে। এই প্রক্রিয়ায় পেশাদারিত্বের চেয়ে রাজনৈতিক প্রভাব ও ব্যক্তিগত পছন্দের প্রাধান্য পাওয়ায় মাঠপর্যায়ে পুলিশ প্রশাসনে চরম অসন্তোষ বিরাজ করছে।
নীতিমালার তোয়াক্কা নেই, প্রাধান্য পাচ্ছে তদবির:
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময় নিয়োগ পাওয়া কয়েকজন রেঞ্জ ডিআইজি তাদের পছন্দের কর্মকর্তাদের পদায়নে দীর্ঘদিনের নীতিমালা ও প্রথা উপেক্ষা করছেন। অভিযোগ উঠেছে, অনেক কর্মকর্তা গুরুত্বপূর্ণ পোস্টিং ও পদোন্নতির আশায় কর্মস্থল ফেলে রাজধানী ও রাজনৈতিক প্রভাবশালীদের দ্বারে দ্বারে তদবির করছেন। এমনকি কোনো কোনো ক্ষেত্রে স্থানীয় প্রভাবশালী রাজনৈতিক নেতাদের সুপারিশকেও প্রাধান্য দেওয়া হচ্ছে।
ময়মনসিংহ রেঞ্জে 'পুরনো মদ নতুন বোতলে':
সবচেয়ে বেশি অভিযোগ উঠেছে ময়মনসিংহ রেঞ্জকে ঘিরে। বিগত সরকারের সময়ে দাপুটে হিসেবে পরিচিত অন্তত ১৭ জন ওসিকে এই রেঞ্জে পুনরায় পদায়ন করা হয়েছে বলে গুঞ্জন রয়েছে।
কেন্দুয়া থানার উদাহরণ: নেত্রকোনার কেন্দুয়া থানায় নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল আলোচিত ওসি আব্দুল মজিদকে। তিনি আওয়ামী আমলে নান্দাইল ও মুক্তাগাছা থানায় দায়িত্ব পালনকালে বিতর্কিত ভূমিকা রেখেছিলেন। বিষয়টি জানাজানি হলে এক ঘণ্টার মাথায় তাকে প্রত্যাহার করা হয়।
বঞ্চিত পেশাদার কর্মকর্তারা: অন্যদিকে, ১৫ বছর পদোন্নতিবঞ্চিত পরিদর্শক শামসুল হুদা খানের মতো কর্মকর্তাদের বেলায় রেঞ্জ ডিআইজি নেতিবাচক অবস্থান নিয়েছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। এসব বিষয়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও প্রধানমন্ত্রী কার্যালয়ে জমা পড়া অভিযোগের ভিত্তিতে ইতিমধ্যে তদন্ত শুরু হয়েছে। অভিযোগের একটি কপি প্রতিদিনের কাগজের হাতে এসেছে।
এসপি পদায়নে বড় বিতর্ক: স্থগিত দুই জেলার যোগদান:
গত মঙ্গলবার দেশের ১২টি জেলায় এসপি পদে রদবদল আনা হয়। এর মধ্যে বিতর্কিত ও মামলার আসামিদের নাম আসায় নতুন সংকটের সৃষ্টি হয়েছে। ফেনী জেলা: ফেনীর নবনিযুক্ত এসপি মোহাম্মদ মাহবুব আলম খানের বিরুদ্ধে চাঁপাইনবাবগঞ্জে থাকাকালীন ছাত্র-জনতার আন্দোলন দমনে কঠোর ভূমিকা ও শিবগঞ্জ থানায় হত্যা-গুমের মামলা থাকার অভিযোগ উঠেছে। ব্যাপক সমালোচনার মুখে পুলিশ সদর দপ্তর তার যোগদান স্থগিত করেছে।
ঝালকাঠি ও নীলফামারী: ঝালকাঠির নতুন এসপি প্রত্যুষ কুমার মজুমদারকেও যোগদানে বিরত থাকার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। অন্যদিকে, নীলফামারীর এসপি ফরহাদ হোসেন খানের সাথে সাবেক এক প্রতিমন্ত্রীর ঘনিষ্ঠতার ছবি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হলেও তিনি দ্রুত কর্মস্থলে যোগদান করেছেন।
অপরাধ বিশ্লেষকদের উদ্বেগ:
সাবেক আইজিপি ও অপরাধ বিশ্লেষক আব্দুল কাইয়ুম এই বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, "বিগত সময়ে যারা গায়েবি মামলা, নির্যাতন ও রাজনৈতিক দমন-পীড়নের সঙ্গে জড়িত ছিলেন, তাদের আবার গুরুত্বপূর্ণ পদে বসানো কোনোভাবেই সমীচীন নয়। সৎ, দক্ষ ও পেশাদার কর্মকর্তাদের নিয়োগ দিতে না পারলে পুলিশের ভাবমূর্তি পুনরুদ্ধার অসম্ভব হয়ে পড়বে।"
তিনি অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের নিয়োগ দেওয়া রেঞ্জ ডিআইজিদের ভূমিকাও খতিয়ে দেখার আহ্বান জানান।
পরবর্তী পদক্ষেপ পুলিশ সদর দপ্তরের নির্দেশনা অনুযায়ী, ফেনী ও ঝালকাঠি ছাড়া বাকি জেলাগুলোতে নতুন এসপিরা দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন। তবে বিতর্কিত কর্মকর্তাদের পুনর্বাসনের চেষ্টা নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক সমালোচনা চলছে। বিভিন্ন মহল থেকে দাবি উঠেছে, এসব পদায়নের পেছনে কোনো আর্থিক লেনদেন বা প্রভাবশালী মহলের হাত আছে কি না, তা উচ্চপর্যায়ের তদন্ত কমিটির মাধ্যমে খতিয়ে দেখতে হবে।
আপনার মতামত লিখুন :