আওয়ামী শাসনামলে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ থানায় দায়িত্ব পালন করা ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের (ওসি) ময়মনসিংহ রেঞ্জের ভেতরেই ঘুরেফিরে পদায়ন করার অভিযোগ উঠেছে। রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পরও বিতর্কিত কর্মকর্তাদের এক থানা থেকে অন্য থানায় বদলি করায় জনমনে এবং পুলিশ বাহিনীর ভেতরেই তীব্র সমালোচনা শুরু হয়েছে। সংশ্লিষ্টরা একে প্রকৃত সংস্কারের বদলে ‘লোক দেখানো’ রদবদল হিসেবে অভিহিত করছেন। জেলা পুলিশ সুপারগণ বলেন, রেঞ্জ ডিআইজি আতাউল কিবরিয়ার দিক নির্দেশনায় থানার ওসিদের পদায়ন করা হয় বলে একটি সূত্র জানিয়েছেন।
বদলির নেপথ্যে চাপা ক্ষোভ:
সূত্রমতে, সম্প্রতি ময়মনসিংহ রেঞ্জের বাইরে থেকে ২২ জন পুলিশ পরিদর্শককে বিভিন্ন থানায় ওসি হিসেবে পদায়ন করা হয়েছে। অভিযোগ উঠেছে, এই কর্মকর্তাদের বড় একটি অংশ বিগত সরকারের আমলে প্রভাবশালী মহলের আশীর্বাদপুষ্ট ছিলেন।
অথচ দীর্ঘ সময় ধরে পদায়ন বঞ্চিত ও পেশাদার হিসেবে পরিচিত বিপুল সংখ্যক পুলিশ পরিদর্শক এখনো কোনো সুযোগ পাচ্ছেন না। এই বৈষম্যের কারণে বাহিনীর একটি অংশের মধ্যে চরম ক্ষোভ ও হতাশা বিরাজ করছে।
বিশেষ করে, কেন্দুয়া উপজেলা ছাত্রদলের সাবেক সভাপতি ও বর্তমানে পুলিশ পরিদর্শক শামসুল হুদা খানের বিষয়টি নিয়ে প্রশাসনিক অঙ্গনে ব্যাপক আলোচনা চলছে। গত ২০ এপ্রিল ঢাকা রেঞ্জ থেকে তাকে ময়মনসিংহে বদলি করা হলেও যোগদানের আগেই ডিআইজি আতাউল কিবরিয়ার আপত্তির কারণে ২৯ এপ্রিল রহস্যজনকভাবে তার বদলি আদেশ বাতিল করা হয়। জানা যায়,শামসুল হুদা ছাত্র জীবনে ছাত্রদলের পদাধিকারি হওয়ার কারণে চাকুরী জীবনে নির্যাতনের শিকার হয়েছেন।
তালিকায় ১১ ওসি, নড়েচড়ে বসছে সদর দপ্তর:
গণমাধ্যমে এই সংবাদ প্রকাশের পর পুলিশ অধিদপ্তর নড়েচড়ে বসেছে। বিশ্বস্ত সূত্রে জানা গেছে, কেন্দুয়া থানায় ওসি আব্দুল মজিদকে পদায়ন ঘিরে এবং বারহাট্টা থানার ওসি চম্পা দামসহ মোট ১১ জন বিতর্কিত কর্মকর্তাকে সরিয়ে দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে ।
পুলিশ অধিদপ্তরের একজন অতিরিক্ত আইজিপি জানান, ২০১৪, ২০১৮ ও ২০২৪ সালের বিতর্কিত নির্বাচনে দায়িত্ব পালন করা ওসিদের চিহ্নিত করার কাজ চলছে। তিনি বলেন, “সবাইকে একসঙ্গে সরানো হয়তো সম্ভব নয়, তবে যারা একাধিক নির্বাচনে বিতর্কিত ভূমিকা রেখেছেন, বিরোধী রাজনৈতিক নেতাদের মামলা, হামলা ও নির্যাতনের অভিযোগের দোষে দুষ্ট সেই যাচাই বাছাই করত: তাদের অপরাধের মূল্যায়ন করে তাদের অগ্রাধিকার ভিত্তিতে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।
এ ক্ষেত্রে ইতোমধ্যেই ৩০ জন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা সহ বেশ কিছু অধস্তন কর্মীদের চাকুরীচ্যুতি সহ তাদের জন্য প্রযোজ্য ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা হয়েছে এবং অন্যান্যদের বিষয়ে এখনও সেই যাচাই বাছাই চলমান। তবে যাদের বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ নেই, তাদের দায়িত্ব পালনে বাধা নেই।”
স্বজনপ্রীতি ও রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ:
অভিযোগ উঠেছে, যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও অনেককে পদায়ন না করে ব্যক্তিগত সম্পর্ক ও রাজনৈতিক সুপারিশের ভিত্তিতে কিছু কর্মকর্তাকে গুরুত্বপূর্ণ থানায় বসানো হয়েছে। নেত্রকোনার বারহাট্টা থানার ওসি চম্পা দামের রাজনৈতিক পরিচয় ও পারিবারিক সম্পৃক্ততা নিয়ে স্থানীয়ভাবে নানা প্রশ্ন উঠেছে। এছাড়া অনেক ক্ষেত্রে সংসদ সদস্যদের (এমপি) সঙ্গে কোনো প্রকার সমন্বয় বা পরামর্শ ছাড়াই বিতর্কিত কর্মকর্তাদের পদায়ন করায় স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরাও ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন।
কর্তৃপক্ষের বক্তব্য:
এ বিষয়ে ময়মনসিংহ রেঞ্জ পুলিশের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানান, পূর্ববর্তী সরকারের আমলে সুবিধাভোগী কোনো ওসি বর্তমানে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে আছেন কিনা, তা গুরুত্বের সাথে খতিয়ে দেখা হচ্ছে। কোনো কর্মকর্তার বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ বা অনিয়মের প্রমাণ পাওয়া গেলে দ্রুত আইনানুগ ও বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
তবে সচেতন মহল ও বঞ্চিত কর্মকর্তাদের দাবি—কেবল লোক দেখানো রদবদল নয়, বরং স্বচ্ছতা, দক্ষতা এবং নিরপেক্ষতার ভিত্তিতে ওসি পদায়ন নিশ্চিত করে পুলিশ বাহিনীর হৃত গৌরব ফিরিয়ে আনা হোক।
আপনার মতামত লিখুন :