বাংলাদেশে বর্তমানে ঠিক কতটি গণমাধ্যম সক্রিয়- এই প্রশ্নের সুনির্দিষ্ট উত্তর রাষ্ট্রের কাছেও নেই। তথ্য মন্ত্রণালয়ের অনুমোদিত সংবাদপত্র, টেলিভিশন ও অনলাইন নিউজ পোর্টালের পাশাপাশি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমকেন্দ্রিক অসংখ্য তথাকথিত “সংবাদমাধ্যম” এখন কার্যত নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেছে।
বিশেষ করে ফেসবুক, ইউটিউব ও বিভিন্ন ওয়েবভিত্তিক প্ল্যাটফর্মে নামে-বেনামে গড়ে উঠছে হাজারো “অনলাইন নিউজ”, “লাইভ টিভি”, “অনুসন্ধানী মিডিয়া”, “ক্রাইম নিউজ” ও “জাতীয় সংবাদ” নামের পেজ ও চ্যানেল। এর বড় অংশের নেই কোনো সরকারি অনুমোদন, সম্পাদকীয় নীতিমালা বা পেশাগত জবাবদিহিতা।
ফলে একদিকে যেমন প্রকৃত সাংবাদিকতা চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ছে, অন্যদিকে সাধারণ মানুষ প্রতিনিয়ত গুজব, অপতথ্য ও বিভ্রান্তিকর সংবাদে আক্রান্ত হচ্ছেন।
অনুমোদিত গণমাধ্যম বনাম বাস্তব চিত্র:
সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, দেশে অনুমোদিত টেলিভিশন চ্যানেল, নিবন্ধিত সংবাদপত্র ও অনলাইন পোর্টালের একটি সরকারি তালিকা থাকলেও বাস্তবে সক্রিয় প্ল্যাটফর্মের সংখ্যা কয়েক গুণ বেশি।
বর্তমানে- দেশে বহু জাতীয় ও আঞ্চলিক দৈনিক প্রকাশিত হচ্ছে
অসংখ্য সাপ্তাহিক ও স্থানীয় পত্রিকা রয়েছে।
শত শত অনলাইন নিউজ পোর্টাল নিবন্ধনের জন্য আবেদন করেছে।
এর বাইরে ফেসবুক ও ইউটিউবভিত্তিক “নিউজ প্ল্যাটফর্ম” এর সংখ্যা প্রতিদিনই বাড়ছে।
বিশ্লেষকদের মতে, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমভিত্তিক “সংবাদ ব্যবসা” এখন এমন এক পর্যায়ে পৌঁছেছে, যেখানে একটি স্মার্টফোন ও ইন্টারনেট সংযোগ থাকলেই যে কেউ নিজেকে সাংবাদিক পরিচয় দিতে পারছেন।
সাংবাদিকতা নাকি সহজ পরিচয়ের পেশা?
বাংলাদেশে সাংবাদিক হতে এখনো নেই কোনো নীতিমালা বা কেন্দ্রীয় লাইসেন্সিং ব্যবস্থা। নেই বাধ্যতামূলক পেশাগত নিবন্ধনও।
ফলে বাস্তবে দেখা যাচ্ছে-
কোনো প্রশিক্ষণ ছাড়াই অনেকে সাংবাদিক পরিচয় ব্যবহার করছেন।
বিভিন্ন সংগঠনের নামে পরিচয়পত্র তৈরি করা হচ্ছে
উপজেলা ও জেলা পর্যায়ে গড়ে উঠছে অসংখ্য অজানা অনলাইন নিউজ পোর্টাল।
একই ব্যক্তি একাধিক প্রতিষ্ঠানের “স্টাফ রিপোর্টার” পরিচয় ব্যবহার করছেন।
এমনকি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে “প্রেস”, “মিডিয়া”, “টিভি” বা “সংবাদ” শব্দ ব্যবহার করে অসংখ্য প্ল্যাটফর্ম চালু রয়েছে, যাদের অধিকাংশেরই সংবাদ পরিবেশনে কোনো ন্যূনতম নীতিমালা অনুসরণ করার নজির নেই।
মোবাইল সাংবাদিকতা'র আড়ালে অপব্যবহার:
বিশ্বজুড়ে মোবাইল জার্নালিজম (MoJo) আধুনিক সাংবাদিকতার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। কিন্তু বাংলাদেশে “মোবাইল সাংবাদিকতা” শব্দটি এখন অনেক ক্ষেত্রে বিতর্কিত হয়ে উঠেছে।
কারণ অভিযোগ রয়েছে-
সাংবাদিক পরিচয়ে বিভিন্ন সরকারি অফিসে প্রবেশ
ভিডিও ধারণ করে ভয়ভীতি প্রদর্শন।
ব্যবসা প্রতিষ্ঠান থেকে বিজ্ঞাপন বা আর্থিক সুবিধা আদায়ের চেষ্টা।
ফেসবুক লাইভে যাচাইবিহীন তথ্য প্রচার।
ব্যক্তিগত দ্বন্দ্বকে “সংবাদ” আকারে প্রকাশ।
মাঠপর্যায়ের প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের অনেকেই বলছেন, বর্তমানে প্রকৃত সাংবাদিক ও ভুয়া পরিচয়ধারীদের আলাদা করাই কঠিন হয়ে পড়েছে।
মূলধারার গণমাধ্যম কেন চাপে?
প্রিন্ট ও টেলিভিশনভিত্তিক মূলধারার গণমাধ্যম এখন বহুমুখী সংকটে রয়েছে।
একদিকে-
সংবাদপত্রের উৎপাদন ব্যয় বেড়েছে।
বিজ্ঞাপন বাজার কমেছে,
ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে পাঠক সরে যাচ্ছে।
অন্যদিকে-
যাচাইবিহীন তথ্য দ্রুত ভাইরাল হচ্ছে।
ফেসবুকভিত্তিক নিউজ প্ল্যাটফর্ম বিজ্ঞাপন পাচ্ছে।
পেশাদার সাংবাদিকদের বিশ্বাসযোগ্যতা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
ফলে প্রকৃত সাংবাদিকতার সঙ্গে অপসাংবাদিকতার পার্থক্য অনেক সময় সাধারণ মানুষের কাছে অস্পষ্ট হয়ে যাচ্ছে।
গুজব, অপপ্রচার ও সামাজিক অস্থিরতা
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমভিত্তিক বিভিন্ন “নিউজ প্ল্যাটফর্ম” থেকে ছড়ানো গুজব বহুবার সামাজিক অস্থিরতার কারণ হয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে-
যাচাইবিহীন মৃত্যুর সংবাদ,
ধর্মীয় উসকানিমূলক পোস্ট,
রাজনৈতিক বিভ্রান্তি,
আদালতের ভুয়া রায়,
ব্যক্তি চরিত্রহননমূলক ভিডিও ও সংবাদ,
এসব এখন বড় সামাজিক হুমকিতে পরিণত হয়েছে।
তথ্য যাচাই ছাড়া “ব্রেকিং নিউজ” প্রকাশের প্রতিযোগিতা এখন অনেক ক্ষেত্রে সাংবাদিকতার মৌলিক নীতিকেই প্রশ্নবিদ্ধ করছে।
রাষ্ট্রের করণীয় কী?
গণমাধ্যম বিশেষজ্ঞ, সিনিয়র সাংবাদিক ও নীতিনির্ধারকদের মতে, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা বজায় রেখেই একটি আধুনিক, জবাবদিহিমূলক ও নীতিনির্ভর গণমাধ্যম কাঠামো গড়ে তোলা জরুরি।
১. জাতীয় গণমাধ্যম কমিশন গঠন: প্রিন্ট, ইলেকট্রনিক ও ডিজিটাল মিডিয়াকে সমন্বিতভাবে তদারকির জন্য স্বাধীন কমিশন গঠন করা যেতে পারে।
২. কেন্দ্রীয় সাংবাদিক নিবন্ধন ব্যবস্থা: প্রকৃত সাংবাদিকদের জন্য জাতীয় পর্যায়ে ডিজিটাল নিবন্ধন ও যাচাইযোগ্য পরিচয়পত্র চালু করা প্রয়োজন।
৩. অনলাইন পোর্টাল ও ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম যাচাই: সব অনলাইন নিউজ পোর্টাল, ইউটিউব চ্যানেল ও ফেসবুকভিত্তিক সংবাদমাধ্যমকে নিবন্ধনের আওতায় আনতে হবে।
৪. ন্যূনতম শিক্ষাগত ও পেশাগত যোগ্যতা: সাংবাদিকতার সঙ্গে সম্পৃক্তদের জন্য নৈতিকতা, গণমাধ্যম আইন, তথ্য যাচাই ও মানবাধিকার বিষয়ে প্রশিক্ষণ বাধ্যতামূলক করা যেতে পারে।
৫. অপসাংবাদিকতার বিরুদ্ধে দ্রুত বিচার: সাংবাদিক পরিচয়ে চাঁদাবাজি, প্রতারণা ও হয়রানির ঘটনায় বিশেষ আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন।
৬. প্রেস কাউন্সিলকে শক্তিশালী করা: বাংলাদেশ প্রেস কাউন্সিলকে আরও কার্যকর ও ক্ষমতাসম্পন্ন প্রতিষ্ঠানে রূপান্তর করতে হবে।
৭. ফ্যাক্ট-চেকিং নেটওয়ার্ক গড়ে তোলা: রাষ্ট্রীয় ও বেসরকারি উদ্যোগে সমন্বিত তথ্য যাচাই ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে।
৮. মূলধারার সাংবাদিকদের সুরক্ষা: পেশাদার সাংবাদিকদের নিরাপত্তা, বেতন কাঠামো, প্রশিক্ষণ ও আইনি সুরক্ষার বিষয়েও রাষ্ট্রকে উদ্যোগ নিতে হবে।
শেষ কথা:
গণমাধ্যম রাষ্ট্রের চতুর্থ স্তম্ভ। কিন্তু সেই স্তম্ভ যদি অনিয়ন্ত্রিত তথ্য, অপসাংবাদিকতা ও গুজবের চাপে দুর্বল হয়ে পড়ে, তবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে পুরো রাষ্ট্রব্যবস্থা ও গণতান্ত্রিক কাঠামো।
সাংবাদিকতার স্বাধীনতা অবশ্যই থাকতে হবে। তবে স্বাধীনতার নামে বিশৃঙ্খলা, প্রতারণা ও অপব্যবহার চলতে পারে না।
আজ সময় এসেছে রাষ্ট্র, গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠান, সাংবাদিক সংগঠন ও নাগরিক সমাজের সম্মিলিত উদ্যোগে একটি দায়িত্বশীল, আধুনিক ও জবাবদিহিমূলক গণমাধ্যম কাঠামো গড়ে তোলার।
লেখক: এম এ মমিন আনসারী
মহাসচিব
বাংলাদেশ সাংবাদিক কল্যাণ পরিষদ (বিএসকেপি)
কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী পরিষদ।
আপনার মতামত লিখুন :