কেরানীগঞ্জে পশুর হাটে ২ কোটি টাকার রাজস্ব ক্ষতি

ঢাকার কেরানীগঞ্জে আসন্ন ঈদুল আজহাকে কেন্দ্র করে বসতে যাওয়া অস্থায়ী পশুর হাটগুলোর ইজারা নিয়ে ব্যাপক অনিয়ম, সিন্ডিকেট ও রাজনৈতিক প্রভাবের অভিযোগ উঠেছে। স্থানীয় প্রভাবশালী মহলের নিয়ন্ত্রণ ও সমঝোতার কারণে চলতি বছর অধিকাংশ হাটই গত বছরের তুলনায় অস্বাভাবিক কম দামে ইজারা হয়েছে। এতে সরকারের প্রায় ২ কোটি ১০ লাখ টাকার রাজস্ব ক্ষতি হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।

উপজেলা প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে, চলতি বছর কেরানীগঞ্জে মোট ৯টি পশুর হাটের পরিকল্পনা থাকলেও এখন পর্যন্ত ৫টির ইজারা সম্পন্ন হয়েছে। বাকি কয়েকটি হাটে কাঙ্ক্ষিত দরপত্র না পাওয়ায় ইজারা কার্যক্রম স্থগিত রয়েছে।

চলতি বছরের ইজারা প্রক্রিয়ায় সবচেয়ে বেশি আলোচনায় ছিল আগানগর আমবাগিচা বালুর মাঠ পশুর হাটটি। কেরানীগঞ্জের অন্যতম বৃহৎ ও ঐতিহ্যবাহী এই হাটটি এবার সর্বোচ্চ ৫৯ লাখ ৩৩ হাজার টাকায় ইজারা পেয়েছেন স্থানীয় ব্যবসায়ী ও বিএনপি নেতা হাজী আনোয়ার হোসেন।

​অথচ সরকারি নথি অনুযায়ী, গত বছর একই হাট উন্মুক্ত প্রতিযোগিতার মাধ্যমে ইজারা পেয়েছিলেন আগানগর ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি আরসাদ রহমান ১ কোটি ৭০ লাখ টাকায়। অর্থাৎ, মাত্র এক বছরের ব্যবধানে এই একটি মাত্র হাট থেকেই সরকারের রাজস্ব ক্ষতি হয়েছে ১ কোটি ১০ লাখ ৬৭ হাজার টাকা। স্থানীয়দের অভিযোগ, সুনির্দিষ্ট সিন্ডিকেটের কারণে অন্য কোনো প্রতিযোগীকে এই হাটের দরপত্রে অংশ নিতে দেওয়া হয়নি, যার সরাসরি মাশুল দিতে হলো সরকারি কোষাগারকে।একই ধরনের অস্বাভাবিক দরপতনের চিত্র দেখা গেছে শুভাঢ্যা ইউনিয়নের হাসনাবাদ পশুর হাটে। এবার এই হাটটি সর্বোচ্চ ২৩ লাখ ১০ হাজার টাকায় ইজারা পেয়েছেন হাজী মো. সেলিম। অথচ গত বছর এই হাটের ইজারা মূল্য ছিল ৬১ লাখ টাকা। 

​অন্যদিকে, কেরানীগঞ্জের অন্যতম ঐতিহ্যবাহী ও ব্যস্ততম জিনজিরা পশুর হাটটি এবার ইজারা দেওয়া হয়েছে মাত্র ৭ লাখ টাকায়। হাটটি পেয়েছেন গতবারের ইজারাদার মো. মোজাদ্দেদ আলী বাবু। আশ্চর্যজনক বিষয় হলো, গত বছরও তিনিই এই হাটের ইজারা পেয়েছিলেন, তবে তখন তাকে গুনতে হয়েছিল ১৫ লাখ ২৫ হাজার টাকা। একই ব্যক্তি এক বছরের ব্যবধানে কীভাবে অর্ধেকেরও কম মূল্যে ঐতিহ্যবাহী এই হাটের নিয়ন্ত্রণ পেলেন, তা নিয়ে এলাকায় নানা গুঞ্জন চলছে।

রাজস্ব ধসের একই ধারাবাহিকতা দেখা গেছে কেরানীগঞ্জ মডেল থানাধীন হাটগুলোতেও। উপজেলার নতুন সোনাকান্দা গবাদিপশুর হাটটি এবার মাত্র ৪ লাখ ৫০ হাজার টাকায় ইজারা পেয়েছেন প্যানেল চেয়ারম্যান শাহাবুদ্দিন মেম্বার। অথচ গত বছর তিনি  এই হাটের ইজারা পেয়েছিলেন  প্রায় ৬ লাখ ৫০ হাজার টাকা।

​সবচেয়ে বড় চমক ও ধাক্কা এসেছে গত বছর ব্যাপক আলোচনায় থাকা মিলিনিয়াম সিটি পশুর হাটে (সাবেক নবাবী হাট)। এবার এই হাটটি মাত্র ২৬ লাখ ৬০ হাজার টাকায় ইজারা পেয়েছেন বিএনপি নেতা হাজী সাইফুল ইসলাম। অথচ ২০২৫ সালে উন্মুক্ত প্রতিযোগিতার মাধ্যমে একই হাট এনসিপি নেতা বকুল পেয়েছিলেন  ৭১ লাখ ২৪ হাজার টাকায়। অর্থাৎ, এক বছরের ব্যবধানে এই একটি হাট থেকেই সরকারের রাজস্ব কমেছে প্রায় ৪৪ লাখ ৬৪ হাজার টাকা, যা শতকরা হিসাবে প্রায় ৬২ শতাংশ কম। 

কাঙ্ক্ষিত দরপত্র না পাওয়ায় এখনো ইজারা দেওয়া সম্ভব হয়নি—রাজাবাড়ী বালুর মাঠ পশুর হাট,রসুলপুর মাদ্রাসা সংলগ্ন বালুর মাঠ হাট, খাড়াকান্দী মাদ্রাসা হাট এবং বাঘাশুর পশুর হাট।

উপজেলা প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে কেরানীগঞ্জের অস্থায়ী পশুর হাটগুলো থেকে সরকার প্রায় ৩ কোটি ৩০ লাখ টাকা রাজস্ব পেয়েছিল। অথচ চলতি বছর এখন পর্যন্ত আদায় হয়েছে মাত্র ১ কোটি ২০ লাখ ৫০ হাজার টাকা। অর্থাৎ মাত্র এক বছরের ব্যবধানে সরকারের রাজস্ব কমেছে প্রায় ২ কোটি ৯ লাখ ৫০ হাজার টাকা।

স্থানীয় ব্যবসায়ী ও বাসিন্দাদের অভিযোগ, উন্মুক্ত দরপত্রের কথা বলা হলেও বাস্তবে রাজনৈতিক প্রভাব ও সিন্ডিকেটের কারণে সাধারণ দরদাতারা টেন্ডারে অংশ নিতে পারেননি। হাটের নিয়ন্ত্রণ আগে থেকেই ভাগ-বাটোয়ারা করে রাখা হয় বলেও অভিযোগ করেন তারা।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে কয়েকজন ব্যবসায়ী বলেন, “গত বছর রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের পর উন্মুক্ত টেন্ডারের কারণে সরকার রেকর্ড পরিমাণ  রাজস্ব পেয়েছিল। কিন্তু এবার আবারও সেই ফ্যাসিস্ট আমলের পুরানা  সিন্ডিকেট প্রথা চালু হয়ে গেছে যার ফলে সরকার  শুধুমাত্র কেরানীগঞ্জ থেকেই বিপুল পরিমাণ রাজস্ব থেকে বঞ্চিত হল। "

কেরানীগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. ওমর ফারুক বলেন, “সরকারি নীতিমালা অনুসরণ করেই উন্মুক্ত দরপত্রের মাধ্যমে ইজারা কার্যক্রম সম্পন্ন করা হয়েছে এবং সর্বোচ্চ দরদাতাই ইজারা পেয়েছেন।যে সব হাটে কাঙ্ক্ষিত দরপত্র পাওয়া যায়নি, সেগুলোর বিষয়ে পরবর্তীতে সিদ্ধান্ত  জানানো হবে।”

সিন্ডিকেট ও অন্য দরদাতাদের বাধা দেওয়ার অভিযোগ সম্পর্কে তিনি বলেন, “আমাদের পক্ষ থেকে নিরাপত্তার কোনো ঘাটতি ছিল না।”

তবে স্থানীয়দের প্রশ্ন, যদি উন্মুক্ত প্রতিযোগিতা নিশ্চিত হতো, তাহলে গত বছরের তুলনায় অধিকাংশ হাটের ইজারা মূল্য অর্ধেকেরও নিচে নেমে আসত না।

পবিত্র ঈদুল আজহা উপলক্ষ্যে ঢাকার কেরানীগঞ্জে পাঁচটি অস্থায়ী পশুর হাটের ইজারা সম্পন্ন হয়েছে। তবে গত বছরের তুলনায় এবার হাটগুলোর ইজারা মূল্যে কোটি টাকার পতন দেখা গেছে। পাঁচটি হাটেরই ইজারা পেয়েছেন বিএনপির নেতারা। গতকাল সোমবার বিকালে কেরানীগঞ্জ উপজেলা পরিষদ সভাকক্ষে পাঁচটি হাটের ইজারা কার্যক্রম সম্পন্ন হয়।

উপজেলা প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে, এ বছর কেরানীগঞ্জের আমবাগিচা আগানগর হাট, জিনজিরা হাট, শুভাঢ্যা হাসনাবাদ হাট, বিসিক শিল্প নগরী সোনাকান্দা হাট, মিলেনিয়াম সিটি তারানগর হাট, খাড়াকান্দি হাট, রাজাবাড়ি হাট, বাঘাসুর হাট ও রসুলপুর বালুর মাঠ হাটের জন্য ইজারা বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হয়েছিল। এর মধ্যে পাঁচটি হাটের ইজারা সম্পন্ন হলেও বাকি চারটি হাটের ইজারা নির্ধারিত মূল্য না পাওয়ায় স্থগিত রাখা হয়েছে।

সবচেয়ে বড় পতন হয়েছে আমবাগিচা বালুর মাঠ আগানগর হাটে। গত বছর হাটটি ইজারা হয়েছিল ১ কোটি ৭০ লাখ টাকায়। এবার হাটটির সরকারি মূল্য নির্ধারণ করা হয় ৫৮ লাখ ৮৩ হাজার টাকা। বিএনপি নেতা আনোয়ার হোসেন ৫৯ লাখ ৩৩ হাজার টাকায় হাটটি ইজারা পেয়েছেন। অর্থাৎ মাত্র এক বছরের ব্যবধানে হাটটির ইজারা মূল্য কমেছে প্রায় ১ কোটি ১০ লাখ টাকা। মিলেনিয়াম সিটি তারানগর হাটেও বড় ধরনের পতন ঘটেছে। গত বছর হাটটি ৭১ লাখ ২৪ হাজার টাকায় ইজারা হলেও এবার সরকারি মূল্য ধরা হয় ২৫ লাখ ৫০ হাজার টাকা। বিএনপি নেতা সাইফুল ইসলাম হাটটি ২৬ লাখ ৬০ হাজার টাকায় ইজারা পেয়েছে। অর্থাৎ এবার প্রায় ৪৫ লাখ টাকা ইজারা কমেছে। এই হাটকে কেন্দ্র করে সম্প্রতি রাজনৈতিক উত্তেজনাও দেখা দেয়। ইজারা দরপত্র জমা দেওয়াকে কেন্দ্র করে জাতীয় যুবশক্তি ও ছাত্রশক্তির নেতাকর্মীদের ওপর হামলার অভিযোগ ওঠে বিএনপির নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে।

শুভাঢ্যা হাসনাবাদ হাটের ক্ষেত্রেও একই চিত্র দেখা গেছে। গত বছর ৬১ লাখ টাকায় ইজারা হওয়া হাটটির সরকারি মূল্য এবার ধরা হয় ২২ লাখ ৮০ হাজার টাকা। বিএনপি নেতা সেলিম আহমেদ হাটটি ২৩ লাখ ১০ হাজার টাকায় ইজারা পেয়েছেন। এতে গত বছরের তুলনায় প্রায় ৩৮ লাখ টাকা কম পেল সরকার।

ঐতিহ্যবাহী জিনজিরা হাট গত বছর ইজারা হয়েছিল ১৫ লাখ ২৫ হাজার টাকায়। এবার সরকারি মূল্য নির্ধারণ করা হয় ৬ লাখ ২০ হাজার টাকা। দক্ষিণ কেরানীগঞ্জ থানা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক মোজাদ্দেদ আলী ৭ লাখ টাকায় হাটটি ইজারা পান। এতে সরকারের আয় প্রায় ৮ লাখ টাকা কমেছে।

অন্যদিকে, বিসিক শিল্প নগরী সোনাকান্দা হাট গত বছর ৬ লাখ ৫০ হাজার টাকায় ইজারা হলেও এবার সরকারি মূল্য নির্ধারণ করা হয় ৩ লাখ ৫০ হাজার টাকা। শেষ পর্যন্ত হাটটি ৪ লাখ ৫০ হাজার টাকায় ইজারা হয়। এই হাটের ইজারাদার হয়েছেন বিএনপি নেতা শাহবুদ্দিন হোসেন।

কেরানীগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) উমর ফারুকের কাছে গত বছরের তুলনায় হাটের ইজারা মূল্য কমে যাওয়ার বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, 'ইজারায় যারা সর্বোচ্চ শিডিউল ফেলেছেন তারাই ইজারা পেয়েছেন। ইতিমধ্যে পাঁচটি হাটের ইজারা সম্পন্ন হয়েছে। আর নির্ধারিত মূল্য না পাওয়ায় কিছু হাটের ইজারা হয়নি।'

 

Link copied!