পুলিশ ভেরিফিকেশন ছাড়াই নিয়োগ, ফেঁসে যাচ্ছেন ময়মনসিংহের ডিসি

নিজস্ব সংবাদদাতা , প্রতিদিনের কাগজ

প্রকাশিত: ১৯ জুন, ২০২৬, ০৮:০০ পিএম

ছবি: সংগৃহীত

ময়মনসিংহ জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে নিয়োগে ব্যাপক অনিয়ম, জালিয়াতি ও আর্থিক লেনদেনের অভিযোগে নতুন করে আলোচনায় এসেছেন ময়মনসিংহের সাবেক জেলা প্রশাসক (ডিসি) ড. সুভাষ চন্দ্র বিশ্বাস। অভিযোগ রয়েছে, জাতীয় পরিচয়পত্রে প্রকৃত বয়স গোপন করে জন্মনিবন্ধনের তথ্য ব্যবহার করে আব্দুল কাদির নামে এক ব্যক্তিকে ৫৪ বছর বয়সে চাকরি দেওয়া হয়। একই প্রক্রিয়ায় তিনটি পদে মোট ১৭ জনকে নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল বলে অভিযোগ উঠেছে।

অনুসন্ধান সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, ২০১৮ সালের ২৪ ডিসেম্বর ময়মনসিংহ জেলা প্রশাসন অফিস সহায়ক পদে ১৩ জন, নিরাপত্তা প্রহরী পদে ৩ জন এবং পরিচ্ছন্নতাকর্মী পদে ১ জনকে নিয়োগ দেয়। অভিযোগ অনুযায়ী, নিয়োগপ্রাপ্তদের মধ্যে একাধিক ব্যক্তি জাতীয় পরিচয়পত্রে উল্লেখিত বয়স গোপন করে জন্মনিবন্ধনের মাধ্যমে বয়স কম দেখিয়ে চাকরি লাভ করেন।

এ ঘটনায় আওয়ামী শাসন আমলে (২০১৮ সাল) অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশ করেছিলেন দৈনিক ময়মনসিংহ প্রতিদিন-এর সাবেক সম্পাদক ও অনুসন্ধানী সাংবাদিক মো. খায়রুল আলম রফিক। প্রতিবেদনে সাবেক ডিসি ড. সুভাষ চন্দ্র বিশ্বাসের বিরুদ্ধে দুর্নীতি, জালিয়াতি এবং অবৈধ সম্পদ অর্জন এবং ভারতে ৪ টি বাড়ি করার অভিযোগ উত্থাপন করা হয়। সেই সময় এসব অভিযোগকে কেন্দ্র করে সাংবাদিক মোঃ খায়রুল আলম রফিকের  বিরুদ্ধে পাল্টা সাজানো অভিযোগও উত্থাপিত হয়েছিল এবং আওয়ামী শাসন আমলের প্রভাবশালী কিছু ব্যক্তিকে দিয়ে সাজানো মামলা করিয়ে ছিলেন সাবেক ডিসি ড. সুভাষ চন্দ্র বিশ্বাস। এমামলাগুলো ২০২২ সালে সত্যতা না পাওয়া এবং সাক্ষী না দেওয়ায় মামলা থেকে খালাস দিয়েছেন সাংবাদিক  মোঃ খায়রুল আলম রফিককে। ৭ বছরপর ডিসি ড. সুভাষ চন্দ্র বিশ্বাসের বিরুদ্ধে লিখিত অভিযোগ দায়ের করেন সাংবাদিক খায়রুল আলম রফিক। অভিযোগ পুনরায় তদন্ত শুরু হয়েছে। এরই মাঝে ডিসি ড. সুভাষ চন্দ্র বিশ্বাস দেশ ত্যাগ করে ভারতে পালিয়ে গেছেন বলে জানাগেছে। 

দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) সূত্রে জানা যায়, নিয়োগ প্রক্রিয়ায় সরকারি কর্মচারী নিয়োগ বিধি লঙ্ঘন এবং আর্থিক অনিয়মের প্রমাণ পাওয়ার পর দুদকের একজন অনুসন্ধানকারী কর্মকর্তা সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে মামলা দায়েরের সুপারিশ করেছিলেন। অভিযোগের তালিকায় নিয়োগ কমিটির ছয় সদস্য এবং নিয়োগপ্রাপ্ত ১৭ জনসহ মোট ২৩ জনের নাম ছিল।

অনুসন্ধান সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, ২০২১ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি দুদকের তৎকালীন সহকারী পরিচালক ও অনুসন্ধানকারী কর্মকর্তা সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে মামলা রুজুর সুপারিশ করেন। তবে একই বছরের ১৬ নভেম্বর দুদকের তৎকালীন সচিব ড. মু. আনোয়ার হোসেন হাওলাদার স্বাক্ষরিত এক চিঠির মাধ্যমে বিষয়টি নিষ্পত্তি করা হয়। ওই চিঠিতে অভিযোগ নিষ্পত্তির কারণ বিস্তারিত উল্লেখ করা হয়নি বলে জানা যায়।

এ বিষয়ে দুদকের সাবেক সচিব মো. মাহবুব হোসেন বলেন, “আমি দায়িত্ব নেওয়ার পর এমন কোনো ঘটনা ঘটেছে বলে আমার জানা নেই।” নিয়োগে অনিয়মের অভিযোগের বিষয়ে দুদকের সমন্বিত জেলা কার্যালয়, ময়মনসিংহের পরিচালক এ কে এম ফজলুল হক বলেন, “হ্যাঁ, নিয়োগ সংক্রান্ত একটি বিষয় নিষ্পত্তি হয়েছে। তবে কেন নিষ্পত্তি হয়েছে, তা এই মুহূর্তে বলতে পারছি না।”

অভিযোগের বিষয়ে সাবেক জেলা প্রশাসক ড. সুভাষ চন্দ্র বিশ্বাস বলেন, “আমি দায়িত্ব নেওয়ার আগে একটি বাছাই কমিটি ছিল। তারা যাচাই-বাছাই করে তালিকা প্রস্তুত করেছিল। নিয়োগে জন্মনিবন্ধন জমা দেওয়ার সুযোগ ছিল। প্রার্থীরা জন্মনিবন্ধন জমা দিয়েছেন এবং সেই অনুযায়ী সুপারিশ করা হয়েছে। আমি কোনো ধরনের ঘুষ গ্রহণ করিনি।”

তবে সরকারি কর্মচারী নিয়োগ বিধিমালা অনুযায়ী চূড়ান্তভাবে নির্বাচিত প্রার্থীদের পুলিশ ভেরিফিকেশন ও স্বাস্থ্য পরীক্ষার রিপোর্ট পাওয়ার পর নিয়োগ দেওয়ার কথা থাকলেও অভিযোগ রয়েছে, নিয়োগপ্রাপ্তরা ২০১৮ সালের ২৪ ডিসেম্বর যোগদান করেন, অথচ পুলিশ ভেরিফিকেশনের কাগজপত্র জমা দেওয়া হয় ২০১৯ সালের ১৯ মার্চ। অর্থাৎ নিয়োগের প্রায় তিন মাস পরে এসব আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করা হয়।

অনুসন্ধানে আরও উঠে আসে, নিয়োগপ্রাপ্ত কয়েকজন প্রার্থী প্রকৃত বয়সের তুলনায় উল্লেখযোগ্য পরিমাণ বয়স কমিয়ে চাকরি নিয়েছেন। অভিযোগ অনুযায়ী, অফিস সহায়ক পদে নিয়োগপ্রাপ্ত আব্দুল কাদির জাতীয় পরিচয়পত্রে জন্মসাল ১৯৬৫ হলেও জন্মনিবন্ধনে ১৯৯৩ সাল উল্লেখ করেন। ফলে তার বয়স ২৮ বছর কম দেখানো হয়। একইভাবে আবুল কাসেম ২২ বছর, আকরাম হোসেন ২০ বছর, শামসুল আলম ও ওমর ফারুক ১১ বছর করে বয়স কমিয়েছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। এ ছাড়া নিরাপত্তা প্রহরী পদে নিয়োগ পাওয়া তিনজন এবং পরিচ্ছন্নতাকর্মী পদে নিয়োগ পাওয়া একজনের বিরুদ্ধেও বয়স কমিয়ে চাকরি নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক  বলেন, “দুদকের নিজস্ব অনুসন্ধানে অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ার পর সংশ্লিষ্টরা কীভাবে দায়মুক্তি পেলেন, তার ব্যাখ্যা থাকা প্রয়োজন। দুদক একটি অনুসন্ধান ও তদন্তকারী প্রতিষ্ঠান। এমন বিষয়ে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা জরুরি।”

অভিযোগ রয়েছে, সাবেক ডিসি ড. সুভাষ চন্দ্র বিশ্বাসের বিরুদ্ধে অবৈধ সম্পদ অর্জনসহ বিভিন্ন অনিয়মের বিষয়েও অনুসন্ধান চলছে। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত এখনও প্রকাশিত হয়নি।

এদিকে ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর থেকে ড. সুভাষ চন্দ্র বিশ্বাস জনসমক্ষে খুব একটা দেখা যাচ্ছেন না বলে বিভিন্ন মহলে আলোচনা রয়েছে। তবে তিনি কোথায় অবস্থান করছেন, সে বিষয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি। তবে অনেকে জানিয়েছেন ভারতে ৪ টি বাড়ি করে পরিবার নিয়ে সেখানে আত্মগোপন করছেন। আবার কেউ কেউ বলছেন ২০২৪ সালের ৫ আগষ্টের পর থেকে দেশের আত্মগোপনে আছেন।

Advertisement

Link copied!