২০১৮ সালের নির্বাচনে তৎকালীন সরকারদলীয় প্রার্থীদের জিতিয়ে দেওয়ার নেপথ্যে আলোচিত-সমালোচিত জেলা প্রশাসক (ডিসি)রা আবারও আলোচনায় এসেছেন। তাঁদের কর্মকাণ্ডের নথি পর্যালোচনা শুরু করেছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) কর গোয়েন্দা বিভাগ এবং দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। ‘রাতের ভোটের কারিগর’ হিসেবে পরিচিত এসব কর্মকর্তার বিরুদ্ধে বিপুল পরিমাণ কর ফাঁকির অভিযোগ অনুসন্ধানে এনবিআরের আয়কর গোয়েন্দা ও তদন্ত ইউনিট মাঠে নেমেছে।
নির্বাচন কমিশনের প্রতিনিধি হিসেবে ডিসিরা নিজ নিজ জেলায় দায়িত্ব পালন করেন। তাঁদের অধীনে ও নির্দেশনায় জেলার অন্যান্য কর্মকর্তারাও নির্বাচনী দায়িত্ব পালন করেন। বিশেষ করে ২০১৮ সালের নির্বাচনকে কেন্দ্র করেই বর্তমান অনুসন্ধান বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে। অভিযোগ রয়েছে, ওই সময় কিছু কর্মকর্তা প্রার্থীদের কাছ থেকে বিপুল অঙ্কের অর্থ গ্রহণ করেছিলেন।
জানা গেছে, ২০১৮ সালের ওই বিতর্কিত নির্বাচনের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত ছিলেন তৎকালীন সময়ের ৫৭ জন ডিসি। পরবর্তীতে আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে তাঁদের অনেককে পদোন্নতি দেওয়া হয়। কেউ যুগ্ম সচিব, কেউ অতিরিক্ত সচিব পদে উন্নীত হন। তাঁদের মধ্যে অনেকে বিভাগীয় কমিশনার হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন। ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর তাঁরা বিভিন্ন স্থানে পদায়ন পান। বর্তমানে তাঁদের আয়কর নথি যাচাই করে প্রকৃত সম্পদের সঙ্গে মিলিয়ে দেখার উদ্যোগ নিয়েছে সংশ্লিষ্ট দুটি সংস্থা।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে এনবিআরের এক শীর্ষ কর্মকর্তা প্রতিদিনের কাগজকে বলেন, এসব কর্মকর্তার বিষয়ে জনগণের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে চাপা ক্ষোভ ছিল। সরকারের পতনের পর সেই ক্ষোভ আরও প্রকাশ্য হয়েছে। তিনি দাবি করেন, কয়েকজন সাবেক ডিসির বিরুদ্ধে দেশ-বিদেশে সম্পদ গড়ে তোলা, অর্থ পাচার এবং কর ফাঁকির বিভিন্ন তথ্য আয়কর গোয়েন্দাদের হাতে এসেছে। অভিযোগ রয়েছে, তাঁদের আত্মীয়স্বজনের মাধ্যমে কানাডা, দুবাই ও মালয়েশিয়ায় বিপুল পরিমাণ অর্থ পাচার করা হয়েছে। এসব অভিযোগ যাচাই-বাছাই করে কর ফাঁকির বিষয়টি অনুসন্ধান করা হবে। অভিযোগ প্রমাণিত হলে আয়কর আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
এ ছাড়া জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদের তথ্য পাওয়া গেলে তা দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) কাছে পাঠানো হবে। আইন অনুযায়ী দুদক তখন প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।
জানা গেছে, ২০১৮ সালের নির্বাচনের আগে জাতীয় নিরাপত্তা গোয়েন্দা সংস্থা (এনএসআই) একটি জরিপ পরিচালনা করেছিল। সেই প্রতিবেদনে আওয়ামী লীগের মাত্র ২২টি আসনে নিশ্চিত জয়ের সম্ভাবনা দেখানো হয়েছিল। বাকি আসনগুলোতে বিএনপি, জামায়াতে ইসলামী, জাতীয় পার্টি এবং অন্যান্য দলের প্রার্থীদের জয়ের সম্ভাবনার কথা উল্লেখ করা হয়। এরপর গোয়েন্দা সংস্থার প্রতিবেদন ও পুলিশের যাচাই-বাছাইয়ের ভিত্তিতে নির্বাচনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের দায়িত্ব দেওয়া হয় বলে অভিযোগ রয়েছে। এ ক্ষেত্রে ব্যক্তি ও তাঁর পরিবারের রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতাকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছিল।
এর আগে নির্দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচনের দাবিতে ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির নির্বাচন বিএনপিসহ অধিকাংশ নিবন্ধিত রাজনৈতিক দল বর্জন করেছিল। পরে ২০১৮ সালে বহুল আলোচিত সংলাপে শেখ হাসিনার কাছ থেকে সুষ্ঠু নির্বাচনের আশ্বাস পেয়ে বিএনপি নেতৃত্বাধীন জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট নির্বাচনে অংশ নেয়। তবে ওই নির্বাচন ব্যাপকভাবে বিতর্কিত ও প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে ওঠে।
আলোচিত ৫৭ ডিসি
ময়মনসিংহে ড. সুভাষ চন্দ্র বিশ্বাস, নেত্রকোনায় মঈনউল ইসলাম, জামালপুরে আহমেদ কবীর, শেরপুরে আনার কলি মাহবুব, সিলেটে এম. কাজী এমদাদুল ইসলাম, সুনামগঞ্জে মোহাম্মদ আব্দুল আহাদ, মৌলভীবাজারে মো. তোফায়েল ইসলাম, হবিগঞ্জে মাহমুদুল কবীর মুরাদ, ঢাকায় আবু ছালেহ মোহাম্মদ ফেরদৌস খান, গাজীপুরে ড. দেওয়ান মুহাম্মদ হুমায়ুন কবীর, নারায়ণগঞ্জে রাব্বী মিয়া, মুন্সীগঞ্জে সায়লা ফারজানা, কিশোরগঞ্জে মো. সারওয়ার মুর্শেদ চৌধুরী, টাঙ্গাইলে মো. শহীদুল ইসলাম, নরসিংদীতে সৈয়দা ফারহানা কাউনাইন, মাদারীপুরে মো. ওয়াহিদুল ইসলাম, শরীয়তপুরে মো. কাজী আবু তালেব, ফরিদপুরে উম্মে সালমা তানজিয়া, মানিকগঞ্জে এস. এম. ফেরদৌস, গোপালগঞ্জে মোহাম্মদ মোখলেসুর রহমান সরকার, রাজবাড়ীতে মো. শওকত আলী, চট্টগ্রামে মোহাম্মদ ইলিয়াস হোসেন, রাঙামাটিতে এ. কে. এম. মামুনুর রশিদ, বান্দরবানে মোহাম্মদ দাউদুল ইসলাম, খাগড়াছড়িতে মো. শহিদুল ইসলাম, কক্সবাজারে মো. কামাল হোসেন, লক্ষ্মীপুরে অঞ্জন চন্দ্র পাল, চাঁদপুরে মো. মাজেদুর রহমান খান, ফেনীতে মো. ওয়াহিদুজ্জামান, নোয়াখালীতে তন্ময় দাস, কুমিল্লায় মো. আবুল ফজল মীর, ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় হায়াত-উদ-দৌলা খান, রাজশাহীতে এস. এম. আব্দুল কাদের, চাঁপাইনবাবগঞ্জে এ. জেড. এম. নুরুল হক, নওগাঁয় মো. মিজানুর রহমান, নাটোরে মো. শাহরিয়াজ, পাবনায় জসিম উদ্দিন, বগুড়ায় ফয়েজ আহমেদ, সিরাজগঞ্জে কামরুন নাহার সিদ্দীকা, জয়পুরহাটে মোহাম্মদ জাকির হোসেন, খুলনায় মোহাম্মদ হেলাল হোসেন, বাগেরহাটে তপন কুমার বিশ্বাস, সাতক্ষীরায় এস. এম. মোস্তফা কামাল, যশোরে মো. আব্দুল আওয়াল, মাগুরায় মো. আলী আকবর, ঝিনাইদহে সরোজ কুমার নাথ, নড়াইলে আনজুমান আরা, কুষ্টিয়ায় মো. আসলাম হোসেন, মেহেরপুরে মো. আতাউল গনি, চুয়াডাঙ্গায় গোপাল চন্দ্র নাথ, বরিশালে এস. এম. অজিয়র রহমান, ঝালকাঠিতে মো. হামিদুল হক, পিরোজপুরে আবু আহমেদ সিদ্দিকী, পটুয়াখালীতে মো. মতিউল ইসলাম চৌধুরী, বরগুনায় কবীর মাহমুদ, ভোলায় মোহাম্মদ মাসুদ আলম ছিদ্দিকী এবং রংপুরে এনামুল হাবীব।
আপনার মতামত লিখুন :