নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জে মাদকের বিরুদ্ধে বছরের পর বছর অভিযান চলছে। গ্রেপ্তার হচ্ছেন খুচরা কারবারিরা। উদ্ধার হচ্ছে ফেনসিডিল, স্কাফ, হিরোইন, ইয়াবা, গাঁজা, চোলাইমদসহ অন্যান্য মাদক। কিন্তু কদিন বাদেই পাড়া মহল্লায় ,আবার সক্রিয় হয়ে উঠছে নতুন কোনো চক্র।উপজেলার কায়েতপাড়া ইউনিয়নের চনপাড়া এলাকায় সড়কের পাশে প্রতিদিন বিকেলে নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের
বাজার বসে। সন্ধ্যার পর থেকেই দৃশ্যপট পাল্টে যায় ,এ বাজারের। এ সময় যুবক, কিশোর থেকে শুরু করে ,নারী মাদক বিক্রেতা পর্যন্ত রাস্তায় নেমে আসে।সড়কের পাশে দাঁড়িয়ে তারা আওয়াজ দিয়ে বলতে দেখা যায়, ‘শরীর ব্যথার বড়ি লাগবোনি গো' । কেউ বলে- ‘দাঁত ব্যথার বড়ি আছে।' কেউ আবার বলে- ‘জ্বর-ঠাণ্ডা কাশির ,বড়ি লাগবোনি'। স্থানটিতে এই ‘বড়ি’ সাংকেতিক নামেই বিক্রি হচ্ছে মরণনেশা ইয়াবা ।
তারাবো বিশ্বরোড ট্রাক স্ট্যান্ড ঘিরেও সন্ধ্যার ভিন্ন এক পরিবেশ বিরাজ করে। দিনের বেলায় লোকজনের আনাগোনা থাকলেও সন্ধ্যার পরপরই সেখানে মাদক বিক্রেতা, মাদকসেবী ও অপরাধপ্রবণ ব্যক্তিদের আনাগোনা বেড়ে যায়। এতে স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে নিরাপত্তাহীনতা তৈরি হয়েছে। স্থানীয় বাসিন্দা মো. আব্দুল মোত্তালিব বলেন, ট্রাক স্ট্যান্ড এটি এখন অসামাজিক কর্মকাণ্ডের নিরাপদস্থলে পরিণত হয়েছে। সন্ধ্যার পর সাধারণ মানুষ ওই এলাকা এড়িয়ে চলেন।
খালপাড় এলাকার ফরিদ মিয়া জানান, মাদকের কারবার তরুণ সমাজকে ঝুঁকির মুখে ঠেলে দিচ্ছে এবং এলাকার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। পুলিশের অভিযানের পর কিছুদিনের জন্য মাদক বিক্রি কমে এলেও অল্প সময়ের মধ্যেই তা আবার আগের মতো শুরু হয়ে যায়। ফলে মাদকবিরোধী অভিযানের দীর্ঘমেয়াদি কার্যকারিতা নিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে হতাশা ও উদ্বেগ তৈরি হচ্ছে।
একই অবস্থা তারাব পৌরসভার ৯ নং ওয়ার্ড বরাবো এলাকায় স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, সন্ধ্যার পর বিভিন্ন এলাকা থেকে মানুষজন বরাবো বেকারীর মোড় এসে বেকারীর পিছন থেকে মাদক কিনে নিয়ে যায়।
এ রকম দৃশ্য শুধু বরাবো নয় , তারাবো পৌরসভার, তারাব নদীর পাড়, হাটিপাড়া, নোয়াপাড়া, মোগরাকুল, মইকুলী, বরপা ক্রামবোর্ড মোড়, বাগানবাড়ি, গোলাকান্দার ৫ নাম্বার ক্যানাল, মুড়াপাড়া , মাছিমপুর, যাত্রামুড়া বেরিবাদ থেকে ভুলতা এশিয়ান হাইওয়ে , ভুলতা ইউনিয়নের হাটাবো, মুড়াপাড়া, মাছিমপুরসহ বিভিন্ন এলাকায় দেখা যায়। এসব এলাকায় হাত বাড়ালেই মেলে বিভিন্ন মাদকদ্রব্য। এসব এলাকায় প্রতিদিন সন্ধ্যার পর নির্জন সড়ক, বাজারের পেছনের অংশ, নদীর তীর ও ফসলি জমিকে মাদক লেনদেনের নিরাপদ স্থান হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
মাদকের ট্রানজিট রুট ভুলতা গাউছিয়া এশিয়ান হাইওয়ে, ভুলতা গাউছিয়া এশিয়ান হাইওয়ে থেকে যাত্রামুড়া বেরিবাদ , কাঞ্চন তিনশো ফিট সড়ক, চনপাড়াঘাট উপজেলার সীমান্তবর্তী চনপাড়া ঘাট মাদক ও বিভিন্ন পণ্যের চোরাচালানের নিরাপদ ট্রানজিট রুটে
পরিণত হয়েছে। যানবাহনে করে সড়কপথে এবং ট্রলার কিংবা স্পিডবোটযোগে শীতলক্ষ্যা নদী পাড়ি দিয়ে রাজধানী ঢাকাসহ দেশের উত্তর-দক্ষিণাঞ্চলে মাদক পাচার হচ্ছে। ছয় মাসে ২১১ মামলা গ্রেফতার ৩১৮ জন:
পুলিশের তথ্যমতে , এই বছরের জানুয়ারি মাস থেকে জুন মাস পর্যন্ত ছয় মাসে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনে ২১১ টি মামলা হয়েছে । এইসব মামলায় ৩১৮ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এর মধ্যে জানুয়ারি মাসে ৩২ টি মামলায় আসামী ৫০ জন, ফেব্রুয়ারিতে ৩১ টি মামলায় ৪২ জন, মার্চে ৩১ টি মামলায় ৪৮ জন, এপ্রিলে ৩৬ টি মামলায় ৫০ জন, মে মাসে ৪৮ টি মামলায় ৮৭ জন ও জুন মাসে ৩৩ টি মামলায় ৪১ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। এ সময় ১ হাজার ৮'শ ৭১ বোতল ফেনসিডিল, ৩৪ হাজার ৭'শ ৭৭ পিস ইয়াবা, ১শ ১৫ কেজি ৩০৫ গ্রাম গাঁজা, ৩'শ ৮৭ বোতল স্কাফ, ৪'শ লিটার চোলাই মদ, ২৫ গ্রাম ৬৬ পুড়িয়া হিরোইন ও ৮৫ বোতল বিদেশি মদ উদ্ধার করেছে পুলিশ।
দরকার সমন্বিত উদ্যোগ: তারাব পৌরসভা ওলামা দলের আহ্বায়ক হাজী পনির ভূঁইয়া বলেন শুধু পুলিশের অভিযান দিয়ে নয় সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তুলতে পারলেই মাদক নির্মূল স্থায়ী সাফল্য অর্জন করবে। তাই আমাদের সকলের উচিত একত্রিত হয়ে মাদকের বিরুদ্ধে দাঁড়ানো।
মাদকের বিরুদ্ধে নারায়নগঞ্জ জেলার সহকারী পুলিশ সুপার (গ-সার্কেল) মেহেদী ইসলাম বলেন, মাদকের বিরুদ্ধে আমাদের অভিযান সবসময় চলমান রয়েছে। প্রতিদিনই আমাদের থানায় মাদকের বিরুদ্ধে মামলা হচ্ছে। আমরা মাদকের বিরুদ্ধে সোচ্চার। মাদকের খুচরা বিক্রেতা থেকে শুরু করে যারা বড় ডিলার তাদেরকেও আমরা গ্রেফতারের জন্যে অভিযান চালাচ্ছি। এটা একটা চলমান প্রক্রিয়া মাদকের বিরুদ্ধে আমাদের অভিযান অব্যাহত থাকবে।

আপনার মতামত লিখুন :