গাজীপুর মহানগরীর গাছা থানার ৩২ নম্বর ওয়ার্ড বিএনপির সভাপতি মো. আব্দুল হামিদ মণ্ডল। তার ছেলে সোহেল যুবলীগের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত বলে স্থানীয় সূত্রের দাবি। রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের আগে ও পরে এই বাবা-ছেলের ভূমিকা নিয়ে এখন এলাকায় নানা আলোচনা ও অভিযোগ সামনে আসছে। স্থানীয় সূত্রের অভিযোগ, আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে যুবলীগের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছেলে সোহেলের রাজনৈতিক প্রভাব ও যোগাযোগের কারণে বাবা হামিদ মণ্ডল এলাকায় একধরনের সুরক্ষা ও প্রভাবের সুবিধা পেতেন। রাজনৈতিক পরিস্থিতি পরিবর্তনের পর সেই সমীকরণ উল্টে গেছে বলে অভিযোগকারীদের দাবি। এখন ৩২ নম্বর ওয়ার্ড বিএনপির সভাপতি বাবার রাজনৈতিক পরিচয় ও প্রভাবের ছায়ায় ছেলে সোহেল অবস্থান করছেন বলে অভিযোগ উঠেছে।
অর্থাৎ স্থানীয়দের ভাষায়, আগে ছেলে বাবাকে শেল্টার দিত, এখন বাবা ছেলেকে শেল্টার দিচ্ছেন। এই বাবা-ছেলের নাম নতুন করে আলোচনায় এসেছে গাছার ফকির মার্কেটসংলগ্ন ইন্ডেসোর নামে একটি পোশাক কারখানার ঝুট ব্যবসার নিয়ন্ত্রণ সংবাদ সংগ্রহ করতে গিয়ে প্রতিদিনের কাগজ-এর গাজীপুর মহানগর প্রতিনিধি শরীফ ওমর টুটুলের মাথায় রামদার কোপ দেওয়ার ঘটনার পর। তবে বাবা-ছেলের পারস্পরিক রাজনৈতিক শেল্টার, ঝুট ব্যবসায় প্রভাব বিস্তার এবং সাংবাদিকের ওপর হামলার সঙ্গে সম্পৃক্ততার যেসব অভিযোগ উঠেছে, সেগুলোর সবকটি স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
ঘটনাটি নিয়ে হামিদ মণ্ডলের বক্তব্য নতুন করে প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। সাংবাদিক শরীফ ওমর টুটুলকে রামদা দিয়ে কোপানোর সময় তিনি ঘটনাস্থলের পাশেই ছিলেন বলে জানিয়েছেন হামিদ মণ্ডল। তবে কে টুটুলকে কোপ দিয়েছেন, তাকে তিনি চেনেন না বলে দাবি করেছেন। হামিদ মণ্ডল বলেন, “সাংবাদিক টুটুলকে কোপানোর সময় আমি পাশেই ছিলাম। তবে কে তাকে কোপ দিয়েছে, আমি তাকে চিনি না। ঘটনাস্থলে উপস্থিত থাকার কথা হামিদ মণ্ডল নিজেই বললেও হামলাকারীকে চিনতে না পারার দাবি করেছেন। ফলে প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্য, ঘটনাস্থলের সিসিটিভি ফুটেজ এবং সাংবাদিকদের ধারণ করা ছবি ও ভিডিও যাচাই করে প্রকৃত হামলাকারীকে শনাক্ত করা এখন তদন্তের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠেছে।
হামিদ মণ্ডলের দাবি, সংশ্লিষ্ট পোশাক কারখানা কর্তৃপক্ষের সঙ্গে লিখিত চুক্তির মাধ্যমে তিনি নিয়মিত ঝুট উত্তোলন করে আসছেন। অন্য একটি পক্ষ বিএনপির নাম ব্যবহার করে জোরপূর্বক ওই ব্যবসার নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার চেষ্টা করছে বলেও তার অভিযোগ। অন্যদিকে স্থানীয় সূত্রের অভিযোগ, ঝুট ব্যবসার নিয়ন্ত্রণ ঘিরে ঘটনার দিন সকাল থেকেই এলাকায় দেশীয় অস্ত্র নিয়ে হামিদ মন্ডলের লোকজনের অবস্থান ও মহড়া চলছিল। এই ব্যবসার নিয়ন্ত্রণ কার হাতে থাকবে, তা নিয়ে বেশ কিছুদিন ধরেই এলাকায় উত্তেজনা চলছিল।
অস্ত্রের মহড়া ও উত্তেজনার খবর পেয়ে কয়েকজন সাংবাদিক ঘটনাস্থলে সংবাদ সংগ্রহে যান।প্রতিদিনের কাগজ-এর গাজীপুর মহানগর প্রতিনিধি শরীফ ওমর টুটুল রাস্তার অপর পাশে অবস্থানরত লোকজনের কাছে পরিস্থিতি জানতে গেলে তার ওপর হামলা হয় বলে অভিযোগ করছেন টুটুল। টুটুলের দাবি, তিনি স্থানীয় সেলিমের সঙ্গে কথা বলার সময় পেছন থেকে তার মাথায় রামদা দিয়ে কোপ দেওয়া হয়। গুরুতর আহত হয়ে তিনি অচেতন হয়ে পড়েন। পরে সহকর্মীরা তাকে উদ্ধার করে শহীদ তাজউদ্দীন আহমদ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যান।
টুটুল বলেন, “আমি হামিদ মণ্ডলের লোকজনের কাছে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে পেছন থেকে আমার মাথায় রামদা দিয়ে কোপ দেওয়া হয়। এরপর আমি অজ্ঞান হয়ে যাই। স্থানীয় সূত্রের দাবি, আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে সোহেলের যুবলীগের রাজনৈতিক পরিচয় বাবার জন্যও প্রভাব ও সুরক্ষার ক্ষেত্র তৈরি করেছিল। রাজনৈতিক পরিস্থিতি পরিবর্তনের পর এখন বিএনপি নেতা বাবার অবস্থান ছেলে সোহেলের জন্য সুরক্ষা হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে। এই অভিযোগ সত্য কি না, সেটি নিরপেক্ষ তদন্তের বিষয়। একই সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কারখানার ঝুট ব্যবসার প্রকৃত নিয়ন্ত্রক কারা, কারা আর্থিক সুবিধা পাচ্ছেন এবং রাজনৈতিক পরিচয় ব্যবহার করে কোনো পক্ষ ব্যবসার নিয়ন্ত্রণ ধরে রেখেছে কি না, সেটিও অনুসন্ধানের দাবি রাখে।
সাংবাদিক মহলে ক্ষোভ, আন্দোলনের হুঁশিয়ারি ,সাংবাদিক টুটুলের ওপর হামলার খবর ছড়িয়ে পড়ার পর গাজীপুরের সাংবাদিক মহলে ক্ষোভ দেখা দেয়। সাংবাদিক নির্যাতন প্রতিরোধ সেল বাংলাদেশের চেয়ারম্যান খায়রুল আলম রফিক হামলাকারীদের দ্রুত গ্রেপ্তারের দাবি জানিয়েছেন। দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া না হলে আন্দোলনে যাওয়ার হুঁশিয়ারিও দিয়েছেন তিনি।গাছা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা গোলাম রাব্বানি জানিয়েছেন, পুলিশ ঘটনাটি সম্পর্কে অবগত। ঘটনার তদন্তে ভিডিও ফুটেজ, ছবি, সিসিটিভি ও প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্য গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।
এখন তদন্তে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে উঠেছে হামিদ মণ্ডলের নিজের বক্তব্য। তিনি যখন সাংবাদিককে কোপানোর সময় ঘটনাস্থলের পাশেই থাকার কথা বলেছেন, তখন হামলার ঠিক আগে ও পরে সেখানে কারা ছিলেন ও হামলাকারী কোন দিক থেকে এসেছিলেন, তা তদন্তে যাচাই করা প্রয়োজন। সাংবাদিক টুটুলের বক্তব্য, হামিদ মণ্ডলের বক্তব্য, প্রত্যক্ষদর্শীদের সাক্ষ্য এবং ভিডিও-সিসিটিভি ফুটেজ পাশাপাশি যাচাই করলেই প্রকৃত হামলাকারীর পরিচয় এবং ঘটনার নেপথ্যের কারণ আরও স্পষ্ট হয়ে উঠবে।

আপনার মতামত লিখুন :