মাত্র ২৩ বছর বয়সেই দুটি বিলাসবহুল বিএমডব্লিউ গাড়ির মালিক, পাঁচতারকা হোটেলে প্রতিদিন প্রায় ৫০ হাজার টাকা খরচে থাকা এবং চাকরি বা বৈধ ব্যবসা ছাড়াই বিলাসী জীবনযাপন। এমন জীবনযাপনের পেছনে ছিল অনলাইন জুয়ার বিশাল অর্থচক্র। এই অভিযোগে রাজধানীতে একটি সংঘবদ্ধ চক্রের ছয় সদস্যকে গ্রেপ্তার করেছে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ।
গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের মধ্যে রয়েছেন মো. আরিফুল ইসলাম রিফাত। অন্যরা হলেন মো. আরমান হোসেন জিহাদ, মাসুদ হোসেন, আব্দুল রাব্বী, কৌশিক আহমেদ শুভ ও মশিউর রহমান তারেক।
অভিযানের সময় তাদের কাছ থেকে ছয় হাজার ৬০০টি মোবাইল আর্থিক সেবার হিসাবসংবলিত সিম, ৬৭টি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সিম, ৭০টির বেশি মোবাইল ফোন, একটি বহনযোগ্য কম্পিউটার এবং একটি যাত্রীবাহী যান জব্দ করা হয়।
রাজধানীর মিন্টো রোডে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে ঢাকা মহানগর পুলিশের অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার (গোয়েন্দা) মো. শফিকুল ইসলাম জানান, গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের ব্যবহৃত যন্ত্রপাতির তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, তাদের মাধ্যমে প্রতিদিন প্রায় পাঁচ কোটি টাকার লেনদেন হতো।
তিনি বলেন, আরিফুল ইসলাম রিফাত এই চক্রের বাংলাদেশ অংশের মূল সমন্বয়কারী। তার বিরুদ্ধে আগেও চারটি মামলা রয়েছে। অবৈধ আয়ের অর্থে তিনি দীর্ঘদিন ধরে বিলাসী জীবনযাপন করে আসছিলেন। কিছুদিন আগে পূর্বাচলে তার একটি বিএমডব্লিউ দুর্ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পর তিনি আরেকটি একই ধরনের গাড়ি কিনেছেন।
গোয়েন্দা কর্মকর্তার ভাষ্য, গ্রেপ্তার এড়াতে রিফাত নিয়মিত অবস্থান পরিবর্তন করতেন। তিনি একসঙ্গে একাধিক কক্ষ ভাড়া নিতেন এবং কয়েক দিন পরপর রাজধানী কিংবা কক্সবাজারের অভিজাত হোটেলে স্থান বদল করতেন। যে কক্ষে তিনি অবস্থান করতেন, তার দৈনিক ভাড়া ছিল প্রায় ৫০ হাজার টাকা।
তদন্তে উঠে এসেছে, দেশে পরিচালিত অনলাইন জুয়ার বিভিন্ন জালভিত্তিক মাধ্যমে প্রতিদিন মোবাইল আর্থিক সেবার হিসাব ব্যবহার করে এক হাজার কোটি টাকারও বেশি লেনদেন হয়। এসব লেনদেন পরিচালনার জন্য প্রায় ২০০টি অর্থ পরিশোধকারী প্রতিষ্ঠান কাজ করছে, যাদের অধিকাংশ বিদেশি নাগরিকদের নিয়ন্ত্রণে পরিচালিত হয়।
প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে গ্রেপ্তার ব্যক্তিরা জানিয়েছেন, বিদেশি অর্থ পরিশোধকারী প্রতিষ্ঠানগুলো বাংলাদেশে লেনদেন পরিচালনার জন্য স্থানীয় মোবাইল আর্থিক সেবা ও ব্যাংক হিসাব সংগ্রহ করে। ব্যাংকের তুলনায় সহজে ব্যবহার করা যায় এবং তদারকি তুলনামূলক দুর্বল হওয়ায় অধিকাংশ ক্ষেত্রেই মোবাইল আর্থিক সেবার হিসাব ব্যবহার করা হয়।
গোয়েন্দা পুলিশ জানায়, জুয়ার মাধ্যমে অর্জিত অর্থ প্রথমে মোবাইল আর্থিক সেবার বিভিন্ন হিসাবে জমা করা হয়। পরে সেই অর্থ ব্যক্তিগত হিসাবে স্থানান্তর করে ভার্চ্যুয়াল মুদ্রা কেনা হয়। এরপর বিদেশে থাকা নিয়ন্ত্রকদের নির্ধারিত ভার্চ্যুয়াল মুদ্রার ঠিকানায় অর্থ পাঠিয়ে দেওয়া হয়।
তদন্তে আরও জানা গেছে, রিফাতের নেতৃত্বাধীন চক্র প্রতিদিনের মোট লেনদেনের নির্দিষ্ট অংশ কমিশন হিসেবে পেত। সেই অর্থের একটি বড় অংশ হিসাব সংগ্রহকারী ও মাঠপর্যায়ের সহযোগীদের মধ্যে ভাগ করে দেওয়া হতো। পাশাপাশি আবাসন, যাতায়াত ও অন্যান্য ব্যয়ও বিদেশি প্রতিষ্ঠান বহন করত।
পুলিশের দাবি, বিদেশে অবস্থানকারী এক বিদেশি নাগরিকের নির্দেশনায় বাংলাদেশে এই কার্যক্রম পরিচালিত হতো। একসময় ওই ব্যক্তি দেশে থাকলেও বর্তমানে বিদেশ থেকে পুরো নেটওয়ার্ক নিয়ন্ত্রণ করছেন।
গোয়েন্দা কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, অনলাইন জুয়ার মাধ্যমে অর্জিত বিপুল অর্থ নিয়মিতভাবে ভার্চ্যুয়াল মুদ্রায় রূপান্তর করে দেশের বাইরে পাচার করা হচ্ছে। এই চক্রের সঙ্গে জড়িত অন্য ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের বিষয়ে তদন্ত অব্যাহত রয়েছে।

আপনার মতামত লিখুন :