মঙ্গলবার, ০৩ মার্চ ২০২৬, ০১:৫৩ পূর্বাহ্ন
শাকের বিন ফয়েজ , কক্সবাজার : মহেশখালী উপজেলার উত্তরে মাতারবাড়ি ইউনিয়ন। যাতায়াতের মাধ্যম চালিয়াতলী-মাতারবাড়ি সড়ক নিয়ে লাখো মানুষের দুঃখ শেষ নেই। ২০২১ সালের ১০ আগস্ট এ সড়কের সংস্কার কাজ শুরু হলেও কয়েক দফা মেয়াদ বাড়িয়েও অগ্রগতি ৫০ শতাংশ। স্থানীয় বাসিন্দা ও পথচারীরা জানান, এ সড়কে প্রাণহানি ঘটনাও ঘটছে। ভাঙা সড়কে প্রতি সপ্তাহে ডাকাতির শিকার হন চালক-যাত্রী। এসবের জন্য ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠানগুলো দায়ী করেছে স্থানীরা। তবে ঠিকাদারদের অভিযোগ, সড়ক লাগোয়া জমির মালিকেরা ক্ষতিপূরণ না পাওয়ায় কাজে বাধা দিচ্ছেন। বাঁধা দেয়ার বিষয়টি স্বীকার করেছেন জমির মালিকেরা।
গত ২৭ মে সরজমিনে দেখা যায়, দায়িত্বপ্রাপ্ত দুই ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠানের ২০-৩০ শ্রমিক সড়কের ফাইলিংয়ের কাজে নিয়োজিত ছিলেন। আলাপকালে মেসার্স আসাদ এন্টারপ্রাইজের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা নাছির উদ্দিন জানান, ‘তিন কিলোমিটার সড়কের ফাইলিংয়ের কাজ শেষের পথে। বানানো হয়েছে সাড়ে ৭ হাজার ব্লক। তিনটি ব্রীজের একটির কাজ শেষ হলেও দুটির কাজ শুরু হয়নি।’ আরেক ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠান নুর সিন্ডিকেটের পরিচালক মোহাম্মদ কাশেম বলেন, ‘চিংডি ঘেরের লবনাক্ত পানির কারণে কাজে ব্যাঘাত ঘটছে। বছরে ৪-৫ মাসের বেশি কাজ করা যায় না।’ স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের (এলজিইডি) তথ্য অনুযায়ী, জাপানের উন্নয়ন সংস্থা’র (জাইকা) অর্থায়নে চালিয়াতলী থেকে মাতারবাড়ি সিএনজি স্টেশন পর্যন্ত পাঁচ কিলোমিটার দৈঘ্য ও ১৮ ফুট প্রস্থের সড়ক উন্নয়নে ব্যয় ধরা হয়েছে ৪২ কোটি ৬৬ লাখ ৭৮ হাজার ৬৫৪ টাকা। এ সড়কের কাজের মেয়াদ আগামী সেপ্টেম্বর পর্যন্ত বর্ধিত করা হয়েছে। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, চালিয়াতলী-মাতারবাড়ি সড়কে প্রতিদিন ১০০ ডাম্পার, ৭০টি মিনি ট্রাক, ৩০টি মালবাহী গাড়ি, ৫০০ এর মতো সিএনজিচালিত অটোরিকশা ও টমটম চলাচল করে। বিশেষ করে; মাতারবাড়ি বিদ্যুৎকেন্দ্রের নির্মাণ কাজে ব্যবহৃত বড় বড় মালামালবাহী গাড়িগুলো এই সড়ক দিয়ে যাতায়াত করে।
মুখোমুখি ঠিকাদার-জমি মালিক : এই সড়কের দুপাশে রয়েছে বেশ কয়েকটি চিংড়ি ঘের। সেখানে বছরে ছয় মাস লবণ চাষ, বাকী সময়ে মাছ চাষ করেন ঘের মালিকেরা। এসব ঘের থেকে সড়ক উন্নয়নে জন্য জমি অধিগ্রহণের জন্য ২০২০ সালে সার্ভে করা হয়। কিন্তু সার্ভেতে ভুল হওয়ায় আজ পর্যন্ত শতাধিক জমির মালিক ক্ষতিপূরণ কিংবা নোটিশ পাননি। জমির মালিক কালারমারছড়া উত্তর নরবিলা গ্রামের এমরান খান ও মো. রুবেল বলেন, ‘সড়কের জন্য জমি নিলেও আজ পর্যন্ত নোটিশ পাইনি। বিষয়টি জেলা প্রশাসন, উপজেলা প্রশাসন এবং স্থানীয় চেয়ারম্যানকে কয়েকদফা অবহিত করা হয়েছে। ক্ষতিপূরণ না দিলে আমরা জমি দেব না। এ নিয়ে উচ্চ আদালতের দ্বারস্থ হয়েছি।’ এ ব্যাপারে ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠান মেসার্স আসাদ এন্টারপ্রাইজের ঠিকাদার আসাদ উল্লাহ বলেন, ‘আমরা কাজ করতে গেলে জমি মালিকেরা বাঁধা দেয়। যার কারণে কাজ ফেলে চলে আসতে হয়।
তার ওপর রড় সিমেন্টের দাম প্রতিনিয়ত বাড়ছে। আমাদের করার কিছু নেই।’ স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি) মহেশখালী উপজেলা প্রকৌশলী সবুজ কুমার দে বলেন, ‘জমি অধিগ্রহণের সার্ভেতে ভুল হওয়ায় মালিকদের ক্ষতিপূরণ পেতে সমস্যা হচ্ছে। জমির মালিকদের কাছ থেকে নতুন করে খতিয়ানসহ কাগজপত্র নেয়া হয়েছে। ক্ষতিপূরণের প্রক্রিয়াটি চলমান। এতে বিভ্রান্ত হওয়ার কারণ নেই।’ এ ব্যাপারে মাতারবাড়ি ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আবু হায়দার বলেন, ‘জমি মালিকদের বাঁধা দেওয়ার বিষয়টি আমাদের কেউ জানায়নি। জমির ক্ষতিপূরণ তাদের ন্যায্য দাবি। বিষয়টি উর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের দ্রুত সমাধান করা জরুরি। এরই মধ্যে সামনে বর্ষা এগিয়ে আসছে। ঠিকাদারদের ধীরগতির কারণে নির্ধারিত সময়ে কাজ সম্পন্ন না হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
মালামাল চুরিসহ নানা ভোগান্তি : ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠান মেসার্স আসাদ এন্টারপ্রাইজের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা নাছির উদ্দিন বলেন, রাত হলে এখানে ডাকাত ও চোরের উৎপাত বাড়ে। কিছুদিন আগে সড়কের কাজে ব্যবহৃত ১৪ মন ওজনের মানকি, চাটার নিয়ে গেছে। এছাড়া নির্মাণাধীন ব্রীজের রড় কেটে নিয়ে যাচ্ছে চোর চক্র। আরেক ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠান নুর সিন্ডিকেটের পরিচালক মোহাম্মদ কাশেম বলেন, ৩৫-৪০ হাজার টাকা মূল্যের দুটি ফাইলের ক্যাপ চুরি হয়েছে। চোর চক্র রড়সহ মালামাল নিয়ে নিয়ে গেলেও ডাকাতির অভিযোগে আমাদের নাইটগার্ড মো. রুবেলকে ধরে নিয়ে যায় পুলিশ। এই সড়কে ২৬ বছর ধরে সিএনজিচালিত অটোরিকশা চালান আবদুল মজিদ (৩৮)। তিনি বলেন, ‘সপ্তাহ পর পর মাতারবাড়ি ব্রীজের আগে ডাকাতির ঘটনা ঘটে। এ কাজে মাতারবাড়ি, কালারমারছড়া, শাপলাপুর ও পেকুয়ার উজানটিয়া এলাকার ডাকাতরা জড়িত।
অটোরিকশা চালক মো. হাদিস, মো. রুবেল, মো. ইউনুছ, মো. মনির হোসেন ও মো. পারভেজের মতে, সড়কে ব্যারিকেড দিয়ে যাত্রী-চালকদের সব কেড়ে নেয় ডাকাতেরা। রাত ৯টার পর গাড়ি চালাতে তাঁর ভয় পান তারা। এছাড়া বর্ষা মৌসুমে সড়কটির অনেক স্থান পানিতে ডুবে যায়। পাশাপাশি দুটি গাড়ি ওভারটেক করা যায় না। যে গাড়ি ১০ বছর চলত সেটি পাঁচ বছরে নষ্ট হয়। মাসে ২০ হাজার টাকা আয় করলে ১০ হাজার টাকা খরচ হচ্ছে বেয়ারিং, একসেল, সাব সিলিন্ডার, চেচিজ বদলাতে। একাধিক সুত্র বলছে, এই সড়কে গত তিন মাসে অন্তত ১৩টি ডাকাতির ঘটনা ঘটে। এসব ঘটনায় পুলিশ দুজন ডাকাত গ্রেফতার করে। তবে মহেশখালী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) প্রণব চৌধুরী বলেন, `সড়কের জননিরাপত্তায় সার্বক্ষণিক পুলিশের টহল জোরদার করা হয়েছে। পাশাপাশি স্থানীয়রা সহযোগিতা করলে ডাকাত প্রতিরোধ সম্ভব।’