মঙ্গলবার, ০৩ মার্চ ২০২৬, ১০:০১ অপরাহ্ন
শাহাদুল ইসলাম সাজু, উত্তরাঞ্চল সংবাদদাতা : এগারো বছর ধরে ভারপ্রাপ্ত উপপরিচালকের পদে বসে আছেন তিনি। পেশায় সরকারি স্কুলের শিক্ষক হলেও কোন অদৃশ্য শক্তির বলে মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা (মাউশি) অধিদপ্তরের রাজশাহীর ভারপ্রাপ্ত উপপরিচালক (ডিডি) পদটি দখল করে আছেন ড. শরমিন ফেরদৌস চৌধুরী। আর দীর্ঘ সময় ধরে এই পদে থেকে শিক্ষা মন্ত্রনালয়ের কোন নিয়ম কানুনকে তোয়াক্কা না করে নিজের ইচ্ছেমতো রাজশাহী অঞ্চলের মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক-কর্মচারীদের এমপিওভূক্তি করাচ্ছেন বলেও অভিযোগ উঠেছে।
এর আগেও তাঁর অনিয়ম-দুর্নীতির তদন্ত হয়েছে। কিন্তু অর্থের বিনিময়ে সেটিকে ধামাচাপা দিয়েছেন মর্মে জনশ্রুতি রয়েছে । শিক্ষা মন্ত্রণালয় থেকে মাধ্যমিক শিক্ষা স্তরে মাঠ পর্যায়ে কর্মরত যেসব উপপরিচালকের চাকরির মেয়াদ একই কর্মস্থলে তিন বছর অতিবাহিত হয়েছে, তাঁদের তথ্য শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে পাঠানোর নির্দেশ দেওয়া হয়। অভিযোগ উঠেছে ডিডি শরমিন ফেরদৌস চৌধূরী সেই নির্দেশও অমান্য করে একই স্থানে থেকে গেছেন। এসব নিয়ে আবু সাইদ নামের বিক্ষুব্ধ এক শিক্ষক গত ৬ আগস্ট প্রধানমন্ত্রী ও শিক্ষা মন্ত্রণালয়সহ বিভিন্ন দপ্তরে অভিযোগ করেছেন।
ওই অভিযোগে দেখা যায়, রাজশাহী পিএন উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক থেকে মাউশির রাজশাহী অঞ্চলের ভারপ্রাপ্ত ডিডি হিসেবে শরমিন ফেরদৌস ২০১২ সালে যোগদান করেন। এরপর নানা অনিয়মে জড়িয়ে পড়ায় তাঁকেসহ মাউশির রাজশাহী কার্যালয়ের দুই কর্মচারীকে শাস্তিমূলকভাবে ঢাকায় শিক্ষা ভবনে ন্যাস্ত করা হয়েছিল। ২০১৮ সালের জুলাই থেকে ১৯ সালের ফেব্রুয়ারি মাস পর্যন্ত তিনি ঢাকায় থেকে আবারও মাউশির রাজশাহী অঞ্চলের ভারপ্রাপ্ত ডিডি হিসেবে যোগদান করেন শরমিন ফেরদৌস।
সেই সঙ্গে তার অনিয়মের সহযোগী কম্পিউটার প্রোগ্রামার মামুন রশিদ ও উচ্চমান সহকারী আব্দুল আওয়ালও একই সময়ে রাজশাহীতে যোগদান করেন। এরপর তারা আবারও নানা অনিয়ম ও দুনীতিতে জড়িয়ে পড়েন। তারই অংশ হিসেবে গত বছর রাজশাহী বিবি হিন্দু একাডেমির জিওলোজি বিভাগের শিক্ষক মনিকা রানি পালকে বিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষক হিসেবে এমপিও ভুক্তি করা হয়েছে মোটা অংকের বিনিময়ে এমন অভিযোগ পাওয়া গেছে। এক বিভাগের শিক্ষক অন্য বিভাগে এমপিওভুক্ত করার কোন নিয়ম নেই।
অভিযোগে আরও উল্লেখ করা হয়, দারুল ইহসান বিশ্ববিদ্যালয়ের সনদ নিষিদ্ধ হলেও ডিডি শরমিন ফেরদৌস নওগাঁর আত্রাই উপজেলার খনজোর জয়সাড়া উচ্চ বিদ্যালয়ের সহকারী গ্রন্থাগারিক নাজমা আকতার বানুকে এমপিওভুক্ত করে দেন। দারুল ইহসানের সনদে একই পদে সিরাজগঞ্জের বেলকুচি উপজেলার দৌলতপুর উচ্চ বিদ্যালয়ের মোঃ সেলিমকেও এমপিওভূক্তি করে দেওয়া হয়েছে ডিডি শরমিন ফেরদৌসের সুপারিশে।
শিক্ষাগত যোগ্যতা না থাকলেও ২০১৬ সালে এমপিও হয়েছে রাজশাহীর পুঠিয়া উপজেলার বিজ্ঞানের শিক্ষক মোজাফফর হোসেনের। রাজশাহীর দুর্গাপুর উপজেলার পানানগর দ্বিমুখী উচ্চ বিদ্যালয়ের বিজ্ঞানের শিক্ষক রোকনুজ্জামানের এমপিও করে দেওয়া হয়েছে অনিয়ম করে।
১২ বছরের শিক্ষকতার অভিজ্ঞতা না থাকলেও চারঘাট উপজেলার নিমপাড়া মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে জাল সনদে প্রধান শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ পান ইমদাদুল হক। পরবর্তীতে মন্ত্রণালয় এই দুর্নীতি ধরতে পেরে ইমদাদুল হকের বেতন বন্ধ করা হয়। জাল নিবন্ধন সনদে এমপিওভুক্ত হন রাজশাহীর বাঘা উপজেলার চকরাজাপুর উচ্চ বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক জেসমিন আরা।
অভিযোগে আরো জানা গেছে, বাঘা উপজেলার কেশবপুর স্কুল অ্যান্ড কলেজের সহকারী প্রধান শিক্ষক হাবিবুর রহমান একই উপজেলার দিঘা নিম্ম-মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে কর্মরত ছিলেন। অনুমোদনহীন আমেরিকা-বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয়ের বিএড সনদ দিয়ে তিনি প্রথমে বিএড স্কেল পান। এরপর একই সনদ দিয়ে তিনি সহকারী প্রধান শিক্ষক হিসেবে এমপিও করান। অথচ আমেরিকা-বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয়ে বিএড কোর্সের অনুমোদনই নেই।
বিষয়টি জানাজানি হলে ডিডি শরমিন ফেরদৌসের যোগসাজসে পরবর্তিতে রয়াল বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি ভুয়া সনদ দিয়ে হাবিবুরের এমপিও করা হয়। এভাবে রাজশাহী অঞ্চলের চার শতাধিক শিক্ষক – কর্মচারীকে দুর্নীতির মাধ্যমে এমপিও ভুক্ত করা হয়েছে। ডিডি শরমিন ফেরদৌস চৌধুরীর এমন অনিয়মের পাহাড় নিয়ে অভিযোগের প্রেক্ষিতে ২০১৯ সালে শিক্ষা মন্ত্রণালয় তদন্ত করে। অদৃশ্য কারণে সেই তদন্ত প্রতিবেদন আজও আলোর মুখ দেখেনি।
তবে এসব অভিযোগের ভিত্তি নাই দাবি করে মাউশি রাজশাহীর উপপরিচালক ড. শরমিন ফেরদৌস চৌধুরী বলেন, ‘আমার বিরুদ্ধে অভিযোগের বিষয়ে এর আগেও তদন্ত হয়েছে। কোনো প্রমাণ মেলেনি বলেই আমি এখানে আছি। আমি এমপিও করার জন্য কারো কাছ থেকে কোনো টাকা-পয়সাও নেই না।’