মঙ্গলবার, ০৩ মার্চ ২০২৬, ০৯:০৯ পূর্বাহ্ন
স্টাফ রিপোর্টার, রাজশাহী: রাজশাহী মেট্রোপলিটন পুলিশের (আরএমপি) গোয়েন্দা বিভাগের এসআই মাহবুব হাসান। তিনি গ্রেপ্তার বাণিজ্যে নায়ক। সবাই তাকে আয়নাঘরের কারিগর বলতেন। ক্রসফায়ায় ও মাদক মামলায় ফাঁসানো, টাকার বিনিময়ে ছেড়ে দেওয়াসহ রয়েছে অভিযোগের পাহাড়। তার আরেকটি পরিচয় আছে তিনি ছাত্রলীগের সাবেক ক্যাডার ছিলেন। ডিবিতে কর্মরত থেকে কোটি কোটি টাকা অর্জন করেছেন। এসআই মাহাবুব প্রকাশ্যে বলতেন আমাকে সহজে এখান বদলি করার কারও সাহস নেই। প্রয়োজনে নেত্রী (শেখ হাসিনা আপা’র) কাছে চলে যাবো। তার ভয়ে কেউ মুখ খুলতেন না। আরএমপির ডিবিতে সাধারন মানুষকে ধরে এনে আয়নাঘরে আটক রাখতেন। চাহিদামত টাকা পেলে ছেড়ে দিতেন। করতেন শারিরিক নির্যাতন। রাত হলেই আটককৃত ব্যাক্তিদের কান্নার আওয়াজ শোনা যেত। গত ৫ আগস্ট শেখ হাসিনার পতনের পরও তার দৌরাত্ম থামেনি। ভুক্তভোগীদের একজন মো. রাজিব আলী রাতুল।
তিনি নগরীর রেলগেট গোরহাঙ্গা এলাকার বিশিষ্ট ব্যবসায়ী মো.মাসুদ রানা সরকারের পুত্র। তিনি জানান, ২০১৯ সালের ২৩ অক্টোবর দুপুর দেড়টার সময় ডিবি পুলিশের একটি টিম নিজ বাসা থেকে রাজিব আলীকে গ্রেপ্তার করে। টিমের নেতৃত্বে ছিলেন এসআই মাহবুব হাসান। রাজিব একটি প্রতিষ্ঠানে ম্যানেজার পদে কর্মরত ছিলেন। ওইদিন দুপুর ২ টা ১০ মিনিটে কপোতাক্ষ এক্সপ্রেস ট্রেনযোগে শ্বশুরবাড়ি যাওয়ার জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন রাজিব। কিন্তু বাসা থেকে বের হওয়ার আগেই এসআই হাসান সেখানে যান এবং রাজিবকে আটক করেন। পরে রাজিবের হাতে ও পকেটে মাদক ও অস্ত্র দিয়ে একটি ভিডিও করা হয়। তাকে ফাসাঁনোর একটি ভিডিও প্রতিদিনের কাগজের হাতে আসে। ভিডিওতে দেখা যায়, রাজিবের পকেট থেকে ফেন্সিডিলের বোতল বের করা হচ্ছে। কিন্তু মামলার এজাহারে উল্লেখ করা হয়, ‘রাজিবের ডান হাতে হেরোইন ও বাম পকেটে ইয়াবা পাওয়া গেছে। বিক্রির উদ্দেশে তিনি নিজ বাসায় অবস্থান করছিলেন।
রাজিব জানান, আমাকে পিস্তল হাতে দিয়ে ছবি তোলা হয় এবং অস্ত্র মামলা দেয়া হয় সাজানো। সূত্র জানিয়েছে, ওইদিন রাজিবকে নগরীর লক্ষিপুর ঝাউতলা এলাকায় ডিবি কার্যালয়ে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে গভীর রাতে তার ওপর চালানো হয় অমানবিক নির্যাতন। মাহবুব ইলেকট্রিক শক দেন এবং চোখ বেদে রাখেন। পুলিশের কনস্টেবল শুভংকর ও সুব্রত রাজিবের পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করে ৫ লাখ টাকা চাঁদা দাবি করেন। টাকা না দিলে ক্রসফায়ারের ভয় দেখানো হয়। পরে সিমলা পার্কে নিয়ে যাওয়া হয় রাজিবকে। সেখানে গিয়ে রাজিবের বাবার কাছে ৫ লাখ টাকা নেন এসআই হাসান। ২০২৩ সালে ঘুষের টাকা রাজশাহী সিটি মেয়রের এপিএস শাওনের মাধ্যমে ফেরত দেন পুলিশ সদস্যরা। পরে বিভিন্ন হুমকি-ধামকিও দেয়া হয় রাজিবের পরিবারকে। ২০ দিন পরে উচ্চ আদালত থেকে জামিনে বেরিয়ে আসেন রাজিব। অভিযোগ আছে, ডিবিতে চাকুরী করে কোটি কোটি টাকা কামিয়েছেন।
ঘুষের টাকায় করেছেন বাড়ি-গাড়ী। ৫ আগস্ট শেখ হাসিনার পতনের পর তার বিরুদ্ধে ভুক্তভোগীরা মুখ খুলতে শুরু করেন। বিভাগীয় মামলা রুজু হয় তার নামে। রাজশাহী মহানগর ছাত্রশিবিরের সাংগঠনিক সম্পাদক আলী রায়হান হত্যা মামলার আসামি এসআই মাহাবুব বলে জানান পুলিশ। এছাড়া ভুক্তভোগী রাজিব আলী বাদী হয়ে মাহাবুব হাসানের বিরুদ্ধে বোয়ালিয়া মডেল থানায় একটি মামলা করেন। এছাড়াও তার বিরুদ্ধে নগরীর রেলগেটে মানববন্ধন ও বিভিন্ন কর্মসূচী দেন স্থানীয়রা। এসআই মাহাবুব নিজেকে রক্ষা করতে এদিকে বিশিষ্ট ব্যবসায়ী মো. মাসুদ রানা সরকার ও তার ছেলে রাজিব আলীসহ কয়েকজন স্থানীয় সাংবাদিকের নামে বোয়ালিয়া মডেল থানায় উল্টো মামলা করিয়েছেন তার মা। রাজিব আলী জানান, আমাকে ও আমার পরিবারকে প্রাননাশের হুমকি দেন মাহাবুব হাসান। আমি এবিষয়ে পুলিশের আইজিপি বরাবর একটি লিখিত আবেদন করেছি। রাজিবের বাবা বিশিষ্ট ব্যবসায়ী মো. মাসুদ রানা সরকার বলেন, আমাদের বিরুদ্ধে দায়ের হওয়া মিথ্যা মামলা প্রত্যাহারপূর্বক আমরা তার শাস্তি চাই। এ বিষয়ে অভিযুক্ত এসআই মাহবুব হাসান বলেন, এসব অভিযোগ মিথ্যা ও ভিত্তিহীন।