মঙ্গলবার, ০৩ মার্চ ২০২৬, ০৮:২৮ অপরাহ্ন

সার্ভেয়ারের এত সম্পদের উৎস কি ?

সার্ভেয়ারের এত সম্পদের উৎস কি ?

সার্ভেয়ারের এত সম্পদের উৎস কি ?

রেজাউল করিম রেজা : ঢাকার নবাবগঞ্জ উপজেলা ভূমি অফিসে সার্ভেয়ার হিসেবে কর্মরত ১৪তম গ্রেডের একজন কর্মচারী মনির হোসেন। অথচ তার সম্পদের হিসাব দেখলে যে কোনো ব্যক্তির মাথা ঘুরে যাবে। রাজধানীতে বহুতল ভবনে সাতটি ফ্ল্যাট, রয়েছে ২০ কাঠার অধিক জমি। শ্বশুরবাড়ির আত্মীয়দের নামেও সম্পদ গড়ার অভিযোগ রয়েছে।

জাতীয় বেতন স্কেল অনুযায়ী ১৪তম গ্রেডের কর্মচারীর বেতন সবমিলিয়ে সর্বোচ্চ ৩০ হাজার টাকা। এই বেতনের একজন ব্যক্তি যদি ২০ বছর চাকরি করেন, তারপরও বেতন-বোনাস মিলিয়ে আয় ৭০ লাখ টাকাও হবে না। সর্বসাকুল্যে মাসিক বেতন ৩০ হাজার টাকা হলে কীভাবে এ সময়ে কোটি কোটি টাকার সম্পদ গড়ে তোলা সম্ভব? তাহলে কি সার্ভেয়ারের চাকরি কি সম্পদ গড়ার পরশ পাথর?

মাসিক বেতন সবমিলিয়ে সর্বোচ্চ ৩০ হাজার টাকা
রাজধানীতে ৭টি ফ্ল্যাট ও ২০ কাঠার বেশি জমির মালিক

মনির হোসেনের সম্পদের খোঁজে অনেক সম্পদের সন্ধান পাওয়া গেছে। তার মধ্যে রয়েছে, গ্রামের বাড়ি কুমিল্লার চান্দিনা উপজেলার কৃষ্ণপুরে একতলাবিশিষ্ট আলিশান বাড়ি, রাজধানীর শান্তিবাগ এলাকায় ১০তলা রোজ গার্ডেন ভবনে একাধিক ফ্ল্যাট, ডেমরার হাজি বাদশা মিয়া রোডে গ্রিন কটেজ- ১ ও গ্রিন কটেজ- ২-এ তিনটি ফ্ল্যাট, একই এলাকায় দেড় কোটি টাকা মূল্যের পাঁচ কাঠার প্লট, সাত কাঠা জমিতে নির্মিত ২০টি দোকান এবং একই এলাকায় গ্রিন কটেজ- ৩ ও গ্রিন কটেজ- ৪ ভবনে একাধিক ফ্ল্যাটের বুকিং রয়েছে বলে জানা গেছে।

আরও রয়েছে, রায়েরবাগে চান্দিনা ভিলেজে জমি, একই এলাকার মিন্টু চত্বরের পাশে সহকর্মী ও নারায়ণগঞ্জ জেলা প্রশাসক কার্যালয়ের সার্ভেয়ার বশির ও তার (মনির) নামে ২০ কাঠা জমি। তবে, মনিরের নিজের নামের এসব সম্পদ ছাড়াও স্ত্রী, শ্যালক ও ভায়রা, এমনকি শ্বশুরবাড়ির লোকজনের নামেও সম্পদ গড়েছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। দুর্নীতির মামলা থেকে বাঁচতে অধিকাংশ সম্পদ আত্মীয়দের নামে গড়েছেন বলে জানা গেছে।

এরই মধ্যে মনিরের সম্পদের খোঁজে অনুসন্ধানে নেমেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। গত ১৫ মে সার্ভেয়ার মনিরকে তলব করে জিজ্ঞাসাবাদও করেছে দুদকের অনুসন্ধান কর্মকর্তা। তবে জিজ্ঞাসাবাদে অভিযোগের অধিকাংশ বিষয় অস্বীকার করেছেন এবং অর্জিত সম্পদ নিজের নয় বলে দাবি করেন মনির।

এ বিষয়ে দুদকের অনুসন্ধান কর্মকর্তার সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি জনসংযোগ দপ্তরে যোগাযোগের পরামর্শ দেন। পরে জনসংযোগ দপ্তরে যোগাযোগ করা হলে তারা এ বিষয়ে ‘অবগত নন’ বলে জানান। অন্যদিকে, সার্ভেয়ার মনিরকে কল করে ও খুদে বার্তা পাঠিয়ে কোনো জবাব পাওয়া যায়নি।

এ বিষয়ে নাম প্রকাশ না করে দুদকের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন, মনির হোসেনের সম্পদের খোঁজে কর অফিস, রাজউক, ভূমি অফিস, রেজিস্ট্রার অফিস, সরকারি-বেসরকারি ব্যাংকসহ অভিযোগ সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন দপ্তরে চিঠি দেওয়া হয়েছে। সব নথিপত্র এখনও হাতে পাওয়া যায়নি। তবে, আমাদের গোয়েন্দা অনুসন্ধানে অনেক সম্পদের সন্ধান পাওয়া গেছে।

‘আসলে দুদকের মূল অনুসন্ধান হচ্ছে অভিযোগে থাকা সম্পদের সঙ্গে মনির হোসেনের সম্পৃক্ততা খুঁজে বের করা। কারণ, অধিকাংশ সম্পদই তার শ্বশুরবাড়ির আত্মীয়দের নামে করা। সেগুলো আসলেই মনিরের কি না, সেটা প্রমাণ করা এবং এরপর মনির হোসেনের অর্থের উৎস জানতে চাওয়া। জবাব যথাযথ না হলে মামলার আসামি হবেন তিনি। মনির ছাড়াও ভূমি অফিসের আরও বেশ কয়েকজনের বিরুদ্ধে অনুসন্ধান কার্যক্রম চলমান রয়েছে’ বলে জানান ওই কর্মকর্তা।

সার্ভেয়ার মনির হোসেন মূলত ঢাকা জেলা প্রশাসকের এল এ শাখায় থেকে নানা অনিয়ম ও দুর্নীতির মাধ্যমে সম্পদের পাহাড় গড়েছেন। অবৈধ অর্থের মাধ্যমে তার নিজ নামে ও স্ত্রীর নামে সম্পদ ক্রয় করলেও পরবর্তীতে শ্যালক, ভায়রা ও শ্বশুরবাড়ির লোকজনের নামে একাধিক ফ্ল্যাট, প্লট, মার্কেট ও দোকান এবং ব্যাংকে টাকা রেখেছেন বলে অভিযোগ উঠেছে।

সার্ভেয়ার মনিরের বিরুদ্ধে অসদুপায়ে কোটি কোটি টাকা আত্মসাতেরও অভিযোগ রয়েছে। জানা যায়, তিনি ঢাকা জেলা ডিসি অফিসের এল এ শাখার একটি সংঘবদ্ধ অসাধু চক্রের সঙ্গে জড়িত। এ চক্রের সহায়তায় বিভিন্ন প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক ব্যক্তির ছত্রছায়ায় ক্ষমতার অপব্যবহার করে তিনি কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন। ওই চক্রের মূলহোতাদের মধ্যে ঢাকা ডিসি অফিসের বেশ কয়েকজন সার্ভেয়ার ও কানুনগোর নাম রয়েছে।

প্রসঙ্গত, আঙ্গুল ফুলে কলা গাছ হওয়া এ কর্মচারী আগে ঢাকা জেলা প্রশাসক কার্যালয়ের এল এ শাখায় কর্মরত ছিলেন। সেখানে চাকরির তিন বছরের মাথায় দুর্নীতির অভিযোগে তাকে স্ট্যান্ড রিলিজ করে ময়মনসিংহ জেলা প্রশাসক কার্যালয়ে বদলি করা হয়। কিন্তু অবৈধ অর্থ ও ক্ষমতার জোরে আবারও ঢাকায় বদলি হয়ে আসেন ।

শেয়ার করুন

Comments are closed.




দৈনিক প্রতিদিনের কাগজ © All rights reserved © 2025 Protidiner Kagoj |